নয়া জামানা ডেস্ক : ভোটের ফল বলছে পরাজয়, কিন্তু কুর্সি ছাড়তে নারাজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার রাত থেকেই রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন ছিল, হার নিশ্চিত হওয়ার পর কখন রাজভবনে গিয়ে রাজ্যপালের কাছে ইস্তফাপত্র জমা দেবেন বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী? সাধারণত এটাই দীর্ঘদিনের সংসদীয় রেওয়াজ। কিন্তু মঙ্গলবার বিকেলে কালীঘাটে সাংবাদিক বৈঠক করে মমতা স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, তিনি ইস্তফা দেবেন না। তাঁর যুক্তি, ‘কেন পদত্যাগ করব? আমরা তো হারিনি। জোর করে ভোট লুট করা হয়েছে। ইস্তফার প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে?’ এই জেদ ঘিরেই এখন রাজ্য রাজনীতিতে প্রবল বিতর্ক। প্রশ্ন উঠছে, মুখ্যমন্ত্রী ইস্তফা না দিলে পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ কী হবে?
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আধিকারিকদের মতে, ভারতের ইতিহাসে এমন নজির কার্যত নেই। কোনও মুখ্যমন্ত্রী ভোটে হারার পর ইস্তফা দিচ্ছেন না, এমন পরিস্থিতি সংবিধান প্রণেতারাও কল্পনা করেননি। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বর্তমান মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ৭ মে, বৃহস্পতিবার। সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী, মমতা যদি নিজে থেকে ইস্তফা না-ও দেন, তবে ৭ তারিখ অতিক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর মুখ্যমন্ত্রিত্বের আইনি বৈধতা হারাবে। সেক্ষেত্রে ইস্তফা না দিলেও তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘প্রাক্তন’ হয়ে যাবেন। তবে ইস্তফা না দেওয়াটা শিষ্টাচারের পরিপন্থী। ২০১১ সালে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ফল প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাজভবনে গিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন, এমনকি সরকারি গাড়ি ছেড়ে দলীয় গাড়িতে চড়ে ফিরেছিলেন। এবার সেই সৌজন্যের পথে হাঁটলেন না মমতা।
মমতার অভিযোগের তির সরাসরি নির্বাচন কমিশনের দিকে। সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের গণনাকেন্দ্রে তাঁকে শারীরিক নিগ্রহ করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি। তৃণমূল নেত্রীর কথায়, ‘সাখাওয়াতে আমার এজেন্টদেরও ঢুকতে দেয়নি। ভিতরে ওরা আমার পেটে লাথি মেরেছে, পিছনে লাথি মেরেছে। সিসিটিভি বন্ধ ছিল। যা হয়েছে, তাতে মহিলা হিসাবে আমি অপমানিত। আমার সঙ্গেই এটা হল, তা হলে অন্যদের কী ভাবে অত্যাচারিত হতে হচ্ছে, বোঝা যাচ্ছে।’ যদিও এই অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন ও মনগড়া’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন দক্ষিণ কলকাতার জেলা নির্বাচনী আধিকারিক (ডিইও) রণধীর কুমার। কমিশনের পাল্টা দাবি, সিসিটিভি কখনও বন্ধ ছিল না এবং গণনাকেন্দ্রে কাউকে নিগ্রহের ঘটনাও ঘটেনি। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক আরিজ আফতাবও জানিয়েছেন, এমন কোনও লিখিত অভিযোগ বা এফআইআর তাঁদের কাছে আসেনি।
গণনায় কারচুপির অভিযোগ তুলে মমতা জানিয়েছেন, অন্তত ১০০টি আসন লুট করে বিজেপি জিতেছে। তাঁর দাবি, ‘বিজেপির বিরুদ্ধে আমাদের এই লড়াই ছিল না। নির্বাচন কমিশন এখানে একটা কালো ইতিহাস তৈরি করল। কমিশনই ভিলেন। তারা মানুষের অধিকার লুট করেছে।’ তিনি স্পষ্ট করেছেন, হার স্বীকার না করার কারণেই তিনি রাজভবনে যাবেন না। তবে লড়াই ছাড়ছেন না তিনি। আগামী দিনে জাতীয় স্তরে ‘ইন্ডিয়া’ জোটকে আরও শক্তিশালী করতে সনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী ও অখিলেশ যাদবদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন তিনি। মমতা নিজেকে এখন ‘মুক্ত বিহঙ্গ’ বলে দাবি করছেন। তাঁর কথায়, ‘এত দিন আমি চেয়ারে ছিলাম। অনেক কিছু সহ্য করেছি। কিন্তু এখন আমি মুক্ত বিহঙ্গ। সাধারণ মানুষ। আর সহ্য করব না। সব অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করব। আমি রাস্তার লোক। রাস্তায় ছিলাম, রাস্তায় থাকব।’
রাজ্যজুড়ে ভোট-পরবর্তী হিংসার অভিযোগ নিয়েও সরব হয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। বিজেপি কর্মীদের হাতে তৃণমূল সমর্থক ও মহিলারা আক্রান্ত হচ্ছেন বলে দাবি করে একটি ১০ সদস্যের তথ্য অনুসন্ধান কমিটি গড়ার কথা ঘোষণা করেছেন তিনি। মমতার অভিযোগ, ১৯৭২ সালের সন্ত্রাসকেও ছাপিয়ে গিয়েছে বর্তমান পরিস্থিতি। তাঁর বক্তব্য, ‘আমরা যখন জিতেছিলাম, বলেছিলাম, বদলা নয়, বদল চাই। সিপিএমের কোনও পার্টি অফিসে আমরা হাত দিইনি। কিন্তু এরা মহিলাদেরও ধর্ষণের হুমকি দিচ্ছে! ভাবা যায়?’ রাজভবন সূত্রের খবর, মমতা ইস্তফা না দিলেও খুব বড় কোনও সাংবিধানিক সঙ্কট তৈরি হবে না। ৭ মে বিধানসভার মেয়াদ ফুরিয়ে গেলে রাজ্যপাল বিকল্প ব্যবস্থা নেবেন। তবে প্রচলিত রীতি না মানায় তাঁর ভাবমূর্তির ওপর কী প্রভাব পড়ে, এখন সেটাই দেখার। বাংলার রাজনীতিতে এক বেনজির জেদ আর টানাপড়েনের সাক্ষী থাকল মঙ্গলবার। ছবিতে মঙ্গলবার বিকেলে কালীঘাটে সাংবাদিক বৈঠকে মমতা ।