নয়া জামানা, কলকাতা : সক্রিয় রাজনীতিতে পা রেখেই মেজাজ বদলালেন প্রাক্তন পুলিশকর্তা রাজীব কুমার। তৃণমূলের নবনির্বাচিত রাজ্যসভার সাংসদ হিসেবে বুধবার তাঁর প্রথম রাজনৈতিক বিবৃতিতেই কার্যত রণংদেহি মেজাজে ধরা দিলেন তিনি। প্রথম দফার ভোটের ঠিক আগে ৫০০ জন কর্মীকে ‘বেআইনি ভাবে আটক এবং গ্রেফতার’ করার অভিযোগ তুলে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের আদালত পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিলেন রাজ্যের এই প্রাক্তন পুলিশপ্রধান। রাজীবের স্পষ্ট দাবি, নির্বাচন কমিশনের পুলিশ পর্যবেক্ষকদের শুধুমাত্র মৌখিক নির্দেশে এই কাজ করা হয়েছে, যা আইনত অপরাধ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বুধবার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজ অগ্রবালের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন রাজীব কুমার। সঙ্গে ছিলেন শশী পাঁজা ও শুভাশিস চক্রবর্তী। সেখান থেকে বেরিয়েই রাজীব বুঝিয়ে দেন, এখন থেকে তিনি আর প্রশাসনের অংশ নন, বরং দলের কট্টর সৈনিক। তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতেই এই গ্রেফতারিগুলি করা হয়েছে। রাজীব বলেন, ‘পুলিশ পর্যবেক্ষকদের শুধুমাত্র মৌখিক নির্দেশের ভিত্তিতেই ৫০০ জনকে বেআইনি ভাবে আটক এবং গ্রেফতার করা হয়েছে।’ তিনি মনে করিয়ে দেন, ফৌজদারি কার্যবিধি এবং বর্তমান নির্বাচনী আইন অনুসারে পর্যবেক্ষকদের এমন কোনও আইনি এক্তিয়ার নেই। রাজীবের দাবি, সিইও নিজেও স্বীকার করেছেন যে পর্যবেক্ষকেরা এমন নির্দেশ দিতে পারেন না। পুলিশের প্রাক্তন এই ‘শীর্ষ আধিকারিক’ এখন রাজনীতির ময়দানে দাঁড়িয়ে নিজের পুরনো সতীর্থ ও জুনিয়রদের বিরুদ্ধেই কড়া অবস্থান নিয়েছেন। রাজীবের কথায় উঠে এসেছে প্রচ্ছন্ন হুমকির সুর। তিনি বলেন, ‘ওই আধিকারিকেরা যে পদমর্যাদার, যে রাজ্যেরই হোন না কেন, যে (রাজনৈতিক) আনুকূল্যই থাকুক না কেন— প্রত্যেককে নাম ধরে ধরে চিহ্নিত করা হবে। তাঁদের বিরুদ্ধে চার্জশিট গঠন করা হবে এবং আদালত পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়া হবে।’ তিনি সাফ জানিয়েছেন, অন্য রাজ্যের আধিকারিক হলেও তাঁরা কোনও রক্ষাকবচ বা রাজনৈতিক দায়মুক্তি পাবেন না। আইনের পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করে তাঁদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হবে। রাজীবের এই আক্রমণাত্মক মেজাজ মনে করিয়ে দিচ্ছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক সুরকেই। মুখ্যমন্ত্রীও বারবার দলীয় কর্মীদের ‘বেআইনি গ্রেফতারি’ নিয়ে প্রশাসনকে সতর্ক করেছেন। রাজীবও সেই একই পথে হেঁটে আধিকারিকদের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি সরাসরি বলেন, ‘আজ আমরা গ্রেফতার করলাম। দু’দিন পরে জামিন হয়ে গেল। ভোট হয়ে যাওয়ার আমরা ভুলে গেলাম, এমনটা হবে না। কেউ কোনও এজেন্সি বা কমিশনের পিছনে দাঁড়াতে পারবেন না। প্রত্যেককে ব্যক্তিগত ভাবে এর জবাব দিতে হবে।’ পর্যবেক্ষকদের ভূমিকা নিয়েও বড়সড় প্রশ্ন তুলেছেন এই প্রাক্তন আইপিএস। তাঁর মতে, পর্যবেক্ষকের কাজ শুধুমাত্র পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে কর্তৃপক্ষকে জানানো, সরাসরি পদক্ষেপ করা নয়। রাজীবের প্রশ্ন, ‘হোটেলের ঘরে কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কি তাঁরা একান্তে দেখা করতে পারেন?’ যদিও এই বিষয়ে বিস্তারিত আর কিছু বলেননি তিনি। তৃণমূলের আশঙ্কা, রাজ্যে প্রায় ৮০০ কর্মীকে গ্রেফতার করা হতে পারে। এই নিয়ে ইতিমধ্যেই কলকাতা হাই কোর্টে মামলা হয়েছে। বুধবার প্রধান বিচারপতির বেঞ্চে সব পক্ষের বক্তব্য শোনার পর রায়দান স্থগিত রাখা হয়েছে। গত ৩১ জানুয়ারি অবসর নেওয়ার পর এই প্রথম রাজনৈতিক ময়দানে রাজীব কুমারের এমন ‘হুঙ্কার’ রাজ্য রাজনীতিতে শোরগোল ফেলে দিয়েছে। প্রথম দফার নির্বাচনের ঠিক আগে তাঁর এই রণকৌশল আদতে নিচুতলার কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করারই প্রচেষ্টা বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। সব মিলিয়ে প্রাক্তন পুলিশকর্তার এই ‘নেতা’ অবতার এখন তুঙ্গে।