নয়া জামানা ডেস্ক : রাজ্য রাজনীতিতে কার্যত বিনামেঘে বজ্রপাত। বিধানসভা নির্বাচনের দামামা বাজার আগেই বাংলার রাজ্যপাল পদ থেকে ইস্তফা দিলেন সিভি আনন্দ বোস। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দিল্লিতে গিয়ে তিনি পদত্যাগপত্র পেশ করেন। তাঁর পরিবর্তে পশ্চিমবঙ্গের অস্থায়ী রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব নিচ্ছেন তামিলনাড়ুর প্রাক্তন রাজ্যপাল তথা প্রাক্তন আইপিএস অফিসার আরএন রবি। বৃহস্পতিবার রাতে এই খবর চাউর হতেই রাজ্য রাজনীতিতে শোরগোল পড়ে গিয়েছে। আনন্দ বোসের এই আকস্মিক প্রস্থান এবং নতুন নিয়োগ নিয়ে ইতিমধ্যেই নবান্ন ও দিল্লির মধ্যে সংঘাতের আবহ তৈরি হয়েছে। খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ঘটনাকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দেগে দিয়েছেন।
বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনী বা এসআইআর নিয়ে যখন যুযুধান পক্ষগুলি ব্যস্ত, ঠিক তখনই বোসের এই ইস্তফা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গত শুক্রবারই বাংলার ভোটার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন সিভি আনন্দ বোস। তার এক সপ্তাহ কাটতে না কাটতেই শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তাঁর এই পদত্যাগ ঘিরে দানা বেঁধেছে রহস্য। উল্লেখ্য, শুক্রবার ও শনিবার রাজ্যে আসার কথা রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর। দার্জিলিং লোক ভবনে তাঁকে স্বাগত জানানোর কথা ছিল বোসের। কিন্তু পাহাড় না গিয়ে তিনি হঠাৎ দিল্লি উড়ে যান এবং পদত্যাগ করেন। ২০২২ সালের ১৭ নভেম্বর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ ও রাজনৈতিক হিংসা ইস্যুতে রাজ্য সরকারের সঙ্গে বারবার সংঘাতে জড়িয়েছেন তিনি। সেই সংঘাতের জল সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে।
এই ঘটনার পরেই সামাজিক মাধ্যমে সরব হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্তে তিনি যে যারপরনাই ক্ষুব্ধ, তা তাঁর কথাতেই স্পষ্ট। মুখ্যমন্ত্রী লিখেছেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে আসন্ন রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে কিছু রাজনৈতিক স্বার্থপূরণের জন্য রাজ্যপাল যদি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চাপের মুখে পড়েন, তবে আমি অবাক হব না।’ তাঁর অভিযোগ, নতুন রাজ্যপাল নিয়োগের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ন্যুনতম সৌজন্যটুকু দেখায়নি কেন্দ্র। প্রথা অনুযায়ী মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন থাকলেও তা করা হয়নি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, অমিত শাহ তাঁকে জানিয়েছেন যে আরএন রবিকে নিযুক্ত করা হচ্ছে, কিন্তু এই নিয়োগ প্রক্রিয়া অসাংবিধানিক। তাঁর কথায়, ‘এই ধরনের পদক্ষেপ ভারতের সংবিধানের মূল চেতনাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করে।’ কেন্দ্রের এই ‘একতরফা’ সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি কড়া হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন।
রাজ্যপালের এই প্রস্থান নিয়ে আক্রমণের সুর চড়িয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। শাসক দলের অন্দরে প্রশ্ন উঠেছে, তবে কি বাংলায় রাষ্ট্রপতি শাসন জারির নীল নকশা তৈরি করছে বিজেপি? রাজ্যের অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন, ‘সিভি আনন্দ বোসকে রাজ্যপালের পদ থেকে ইস্তফা দিতে চাপ দেওয়া হল? কেন্দ্রীয় সরকার কি চায় না বাংলার নির্বাচন হোক? বাংলায় কি রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করতে চাইছে কেন্দ্রীয় সরকার?’ একই সুরে রাজ্যের মন্ত্রী শশী পাঁজাও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘এপ্রিলের মধ্যে যখন ভোট শেষ হওয়ার কথা, সেই সময় কেন রাজ্যপাল পদত্যাগ করলেন?’ তৃণমূলের রাজ্য সহ-সভাপতি জয়প্রকাশ মজুমদারের দাবি, বিজেপি কোনও ‘হার্ডকোর পলিটিশিয়ান’ বা আরএসএস ঘনিষ্ঠ কাউকে রাজভবনে বসিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে চাইছে।
বামেদের গলার স্বরেও বিদ্রুপের সুর স্পষ্ট। সিপিআইএম নেতা সুজন চক্রবর্তী প্রশ্ন তুলেছেন, ‘নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজ্যপাল পদত্যাগ করলেন! নাকি করানো হল? জগদীপ ধনকর উপ-রাষ্ট্রপতির জন্য! নীতিশ কুমার রাজ্যসভার জন্য! সিভি আনন্দ বোস কেন? অস্বচ্ছ কিন্তু স্পষ্ট।’ তিনি রাজ্যপাল পদটিকে ‘হাতিপোষা’ এবং ‘অপ্রয়োজনীয়’ বলে কটাক্ষ করেন। তাঁর মতে, দিল্লির ইশারায় এই রদবদল বাংলার মানুষের কাছে স্পষ্ট।
পিছিয়ে নেই কংগ্রেসও। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার রাজ্যপালের অসুস্থতার তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সত্যি কি তাঁর শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি পদত্যাগ করলেন? তিনি তো কয়েকমাস আগেই অসুস্থ হয়েছিলেন? সত্যি যদি অসুস্থতার কারণে ছিল, তাহলে তখনই কেন পদত্যাগ করলেন না?’ তাঁর অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার যে প্রক্রিয়া চলছে, তার মধ্যেই এই সংকট তৈরি করে মানুষকে বিপদে ফেলতে চাইছে কেন্দ্র।
সবমিলিয়ে,ভোটের মুখে রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোসের এই আকস্মিক পদত্যাগ বাংলার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করল। একদিকে অসুস্থতার তত্ত্ব, অন্যদিকে শাসকদলের তোলা ‘রাষ্ট্রপতি শাসনের ষড়যন্ত্র’ এই দুইয়ের টানাপোড়েনে রাজভবন এখন চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে। আরএন রবির নিয়োগ নিয়ে নবান্ন-দিল্লি সংঘাত বুঝিয়ে দিচ্ছে, আগামী বিধানসভা নির্বাচন কেবল ব্যালট বক্সের লড়াই নয়, বরং সাংবিধানিক ক্ষমতার এক চরম সংঘাতের সাক্ষী হতে চলেছে। রাজভবনের এই রদবদল রাজ্য রাজনীতির ভবিষ্যৎকে কোন পথে ঠেলে দেয়, এখন সেটাই দেখার।
কলকাতা-হাওড়া ভোট কি একসঙ্গেই? এখন শুধু রাজ্যপালের সইয়ের অপেক্ষা