কার্তিক ভান্ডারী,নয়া জামানা, বীরভূম: ঔষধি উদ্ভিদ চাষ, গবেষণা এবং গ্রামীণ উন্নয়নের লক্ষ্যে বিশ্বভারতী ও ভারত সরকারের আয়ুষ মন্ত্রকের অধীন কেন্দ্রীয় হোমিওপ্যাথি গবেষণা পরিষদ (সিসিআরএইচ)এর মধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ মউ স্বাক্ষরিত হল। এর ফলে ভেষজ উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণা যেমন বাড়বে, তেমনি কৃষকদের জন্যও নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বুধবার বিশ্বভারতীর কম্পিউটার সেন্টারে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এই চুক্তি স্বাক্ষর হয়। বিশ্বভারতীর রেজিস্ট্রার ড. বিকাশ মুখোপাধ্যায় এবং সিসিআরএইচ এর ডাইরেক্টর জেনারেল ড. সুভাষ কৌশিক চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন। এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পল্লীশিক্ষা ভবনের অধ্যক্ষ অধ্যাপক পরেশ চন্দ্র কোলে, অধ্যাপক বুদ্ধদেব দুয়ারী, ড. বিবস্বান বিশ্বাস, ড. হারলিন কৌর, ড. নারায়ণ চন্দ্র সরকার, ড. আরতি সোরেন-সহ দুই প্রতিষ্ঠানের গবেষক ও আধিকারিকরা।বিশ্বভারতী সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রথম মউ এর মাধ্যমে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ও শিক্ষার ক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করার পথ খুলবে। যৌথ গবেষণা, প্রশিক্ষণ, কর্মশালা, জ্ঞান বিনিময় এবং দক্ষতা বৃদ্ধির বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হবে।বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে ঔষধি উদ্ভিদের চাষ, সংরক্ষণ, রাসায়নিক বিশ্লেষণ এবং গবেষণাভিত্তিক মানবসম্পদ গঠনে।
দ্বিতীয় মউ একটি বিশেষ গবেষণা প্রকল্পকে কেন্দ্র করে। ‘অ্যাভেনা স্যাটিভা’, ‘ক্যামোমিলা’ এবং ‘আর্নিকা মন্টানা’ প্রজাতির হোমিওপ্যাথিক ঔষধি উদ্ভিদের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য বিভিন্ন কৃষি-জলবায়ু অঞ্চলে কীভাবে পরিবর্তিত হয়, তা নিয়ে গবেষণা হবে। এই প্রকল্পে বিশ্বভারতীর পাশাপাশি সিসিআরএইচ-এর কলকাতা ও হায়দ্রাবাদে গবেষণা কেন্দ্রগুলিও অংশ নেবে।
প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ‘আর্নিকা মন্টানা’। বর্তমানে এই উদ্ভিদ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। গবেষণার মাধ্যমে ভারতীয় পরিবেশে এর চাষ কতটা সম্ভব, তা খতিয়ে দেখা হবে। সফল হলে ভবিষ্যতে দেশেই এই উদ্ভিদের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
বিশ্বভারতীর কর্মসচিব ড. বিকাশ মুখোপাধ্যায় বলেন, এই প্রথমবার বিশ্বভারতী ও সিসিআরএইচ যৌথভাবে এমন উদ্যোগ নিল। হোমিওপ্যাথি সাধারণ মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা পদ্ধতি। তাই এই ক্ষেত্রে গবেষণা আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চেয়েছিলেন প্রান্তিক মানুষ কম খরচে চিকিৎসার সুযোগ পাক। এই উদ্যোগ সেই ভাবনাকে নতুন করে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে।
এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রধান গবেষক ড. বিবস্বান বিশ্বাস জানান, ভেষজ ওষুধের গুণাগুণ অনেকটাই নির্ভর করে উদ্ভিদের উপর। আবার উদ্ভিদের গুণমান নির্ভর করে আবহাওয়া, মাটি এবং চাষপদ্ধতির উপর। তাই গবেষণার মাধ্যমে সবচেয়ে উপযোগী পরিবেশ ও চাষপদ্ধতি খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হবে। এর ফলে উন্নত মানের ভেষজ ওষুধ উৎপাদনের পাশাপাশি কৃষকরাও লাভবান হবেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ শুধু গবেষণার ক্ষেত্রেই নয়, কৃষকদের আয় বৃদ্ধি, গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ভেষজভিত্তিক অর্থনীতির বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। পাশাপাশি দেশীয় ঔষধি উদ্ভিদ সম্পদের বৈজ্ঞানিক ব্যবহার ও সংরক্ষণেও নতুন দিশা দেখাবে। তাঁদের আশা, এই যৌথ উদ্যোগ কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও গবেষণার মধ্যে একটি মজবুত সেতুবন্ধন গড়ে তুলবে।