নয়া জামানা ডেস্ক : ভোটের ভরা বাজারে বঙ্গে কাজ থামাল আই-প্যাক। আইনি জটিলতার দোহাই দিয়ে কর্মীদের ২০ দিনের ছুটিতে পাঠাল এই বিখ্যাত ভোটকুশলী সংস্থা। তবে মাঠ ছাড়তে নারাজ তৃণমূল। ভোট ময়দানে নেমেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, আই-প্যাক কর্মীদের পাশে রয়েছে দল। রবিবার তারকেশ্বরের সভা থেকে নেত্রীর হুঙ্কার, ‘ওরা চাকরি ছাড়ালে আমরা দেব, অভিষেকের সঙ্গে কথা বলে নিয়েছি’। তৃণমূল নেত্রীর এই অভয়বাণী ঘিরেই এখন রাজ্য রাজনীতিতে প্রবল শোরগোল। একদিকে আই-প্যাকের সাময়িক প্রস্থান, অন্যদিকে বিকল্প পেশাদার বাহিনী নামিয়ে ভোট বৈতরণী পার হওয়ার ছক— জোড়া কৌশলে এগোচ্ছে ঘাসফুল শিবির।
শনিবার মধ্যরাতে আই-প্যাকের মানবসম্পদ বিভাগ থেকে কর্মীদের কাছে একটি ইমেল যায়। সেখানে জানানো হয়, কিছু আইনি ‘বাধ্যবাধকতা’র কারণে পশ্চিমবঙ্গে আপাতত কাজ বন্ধ রাখা হচ্ছে। কর্মীদের ২০ দিনের ছুটিতে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। আগামী ১১ মে-র পর পুনরায় তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে ওই বার্তায়। আনন্দবাজার ডট কম-এর হাতে থাকা সেই ইমেলের প্রতিলিপি অনুযায়ী, সংস্থাটি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার বার্তা দিয়ে আপাতত অপারেশন স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই খবর চাউর হতেই রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়ায়। যদিও তৃণমূলের পক্ষ থেকে প্রথমে একে ‘ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করা হয়েছিল। দলের বিবৃতিতে বলা হয়, আই-প্যাক তৃণমূলের সঙ্গেই কাজ করছে। বিভ্রান্তি ছড়াতেই এই খবর রটানো হয়েছে।
তবে বেলা গড়াতেই চিত্রনাট্য পুরোপুরি বদলে যায়। তারকেশ্বরের সভা থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই আই-প্যাক কর্মীদের নিয়ে সরব হন। তিনি বলেন, ‘আমাদের তো রোজই ইডি রেড করছে। ইলেকশনের সময় মনে পড়ল? যারা আমাদের পার্টির কাজ করে তাদের বলছে বাংলা ছেড়ে চলে যাও। তোমাদের তো পঞ্চাশটা আছে। আমাদের একটা আছে। শুনুন ওদের ভয় দেখালে, ওরা আমাদের দলের সঙ্গে যুক্ত হবে। আমরা ওদের চাকরি দেব। আমি একটি ছেলেকেও চাকরিছাড়া করব না। সকালে আমি অভিষেকের সঙ্গে কথা বলেই এসেছি।’ মমতার এই সরাসরি মন্তব্যের পর আই-প্যাকের কাজ বন্ধের খবর কার্যত সরকারি সিলমোহর পায়। বিশ্লেষকদের মতে, কর্মীদের অনিশ্চয়তা কাটাতে এবং মনোবল বাড়াতেই মুখ্যমন্ত্রী এই বড় ঘোষণা করেছেন।
ভোটের প্রচার তুঙ্গে থাকাকালীন আই-প্যাকের এই ছুটিতে তৃণমূলের অন্দরে সাময়িক আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছিল। সামনেই ১৫২টি আসনে গুরুত্বপূর্ণ ভোট। প্রথম দফার এই লড়াইয়ের মুখে ভোটকুশলীদের অভাব কীভাবে মেটানো হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তবে সূত্র মারফত জানা যাচ্ছে, তৃণমূল হাত গুটিয়ে বসে নেই। অভিষেকের ক্যামাক স্ট্রিটের অফিসের সাত তলায় থাকা নিজস্ব পেশাদার টিমকে ইতিমধ্যেই ময়দানে নামানো হয়েছে। কর্পোরেট ধাঁচে গড়া এই ‘বিকল্প বাহিনী’ জঙ্গলমহল থেকে উত্তরবঙ্গ— সর্বত্র মাটি কামড়ে কাজ শুরু করেছে। বুথ স্তরে তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে ইভিএম সিল হওয়া পর্যন্ত যাবতীয় নজরদারির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এই প্রশিক্ষিত যুবকদের। জেলা স্তরে ইতিমধ্যে হোয়াটস্অ্যাপ গ্রুপ তৈরি করে সমন্বয় শুরু করে দিয়েছে এই পৃথক বাহিনী।
আই-প্যাকের অন্দরেও পরিস্থিতি খানিকটা ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। ইমেলে ছুটির কথা বলা হলেও অনেক কর্মীকে মৌখিকভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে খবর। কিছু জেলায় সংস্থার গাড়ি পরিষেবা বন্ধ হয়ে গেলেও উত্তরবঙ্গের অনেক জায়গায় কর্মীরা এখনও সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। তবে আই-প্যাকের শীর্ষ কর্তাদের ওপর কেন্দ্রীয় এজেন্সির চাপ যে বাড়ছে, তা স্পষ্ট। গত সোমবার সংস্থার অন্যতম পরিচালক বিনেশ চান্দেলকে গ্রেফতার করে ইডি। এরপর প্রতীক জৈনের স্ত্রী ও ভাইকেও তলব করা হয়েছে। রবিবার রাতে ঋষি রাজ নামে সংস্থার এক কর্তাকে ফের নোটিস পাঠিয়েছে ইডি। সোমবার তাঁকে দিল্লিতে তলব করা হয়েছে। মূলত এই সাঁড়াশি চাপের মুখেই সংস্থাটি আপাতত কাজ থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী এই পুরো পরিস্থিতিকে বিজেপির ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ হিসেবেই দেখছেন। গত জানুয়ারি মাসে আই-প্যাকের অফিসে ইডি হানার সময় মমতা নিজে সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, তৃণমূলের নির্বাচনী পরিকল্পনা ও গোপন নথি ‘চুরি’ করতেই এই হানা। মামলাটি এখন সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন। মমতার স্পষ্ট অভিযোগ, ‘যারা আমাদের পার্টির কাজ করে তাদের বলছে বাংলা ছেড়ে চলে যাও’। কেন্দ্রীয় এজেন্সির এই অতি-সক্রিয়তাকে যে তিনি রাজনৈতিক ভাবেই মোকাবিলা করবেন, তার ইঙ্গিত দিয়েছেন এ দিনের সভা থেকে। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, কোনও কর্মীকে কর্মহীন হতে দেবেন না।
আনন্দবাজার ডট কম-এর খবর অনুযায়ী, আই-প্যাকের এই ছুটিতে কিছুটা হলেও হতোদ্যম হয়েছিলেন দলের স্থানীয় স্তরের নেতারা। তবে তৃণমূল সূত্রের দাবি, আই-প্যাক আনুষ্ঠানিক ছুটিতে থাকলেও তাদের কাজ চালিয়ে নেবে দলের প্রশিক্ষিত বাহিনী। বাঁকুড়া বা জঙ্গলমহলের মতো জায়গায় এই টিম ইতিপূর্বেই কাজ করছিল। এখন তাদের দায়িত্ব আরও বাড়ানো হয়েছে। আই-প্যাকের রূপরেখাকেই হাতিয়ার করে তারা বুথ স্তরে নজরদারি চালাবে। ফলে ভোট পরিচালনায় বড় কোনও ঘাটতি হবে না বলেই মনে করছে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব।
আপাতত আই-প্যাকের ২০ দিনের অনুপস্থিতি তৃণমূলের ভোটে কতটা প্রভাব ফেলে, সেটাই দেখার। তবে দলনেত্রীর ‘চাকরি’র আশ্বাস এবং অভিষেকের নিজস্ব টিমের সক্রিয়তা কর্মীদের নতুন অক্সিজেন দিয়েছে। আই-প্যাক সংস্থা হিসেবে নীরব থাকলেও, ঘাসফুল শিবির বুঝিয়ে দিল, কারিগর বদলালেও লড়াই থমকে থাকবে না। ১১ মে-র পর আই-প্যাকের কর্মীরা ফের স্বমহিমায় ফেরে কি না, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল।