অর্ঘ্য বর্মন, নয়া জামানা, মাটিগাড়া : মনের জোর থাকলে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কোনও বাধাই নয়। তারই জ্বলন্ত উদাহরণ হয়ে উঠেছেন ঝাড়খণ্ডের ২৮ বছর বয়সী যুবক সাজুল টুডু। জন্ম থেকেই একটি হাত নেই। তবুও সেই অদম্য ইচ্ছেশক্তিকে পুঁজি করে শুধুমাত্র এক হাতের ভরসায় সাইকেল নিয়ে গোটা ভারত ভ্রমণে বেরিয়েছেন তিনি। ইতিমধ্যেই দেশের সিংহভাগ রাজ্য ঘুরে ফেলেছেন সাজুল। এখন তাঁর লক্ষ্য উত্তর-পূর্ব ভারত। দু’দিন আগেই তিনি পশ্চিমবঙ্গে পা রেখেছেন। শিলিগুড়ির মিরিক রোড ধরে পাহাড়ের রানি দার্জিলিং, তারপর সেখান থেকে সিকিম হয়ে অসম সহ গোটা নর্থ-ইস্ট চষে বেড়ানোর পরিকল্পনা তাঁর।
শনিবার দুপুরে মাটিগাড়ার পাথরঘাটা অঞ্চলের ত্রিপালিজোত এলাকা দিয়ে মিরিকের দিকে যাচ্ছিলেন সাজুল। এক হাতে হ্যান্ডেল, অন্য দিকের ফাঁকা হাতা পিঠে ঝোলানো। রাস্তার বাঁক আর পাহাড়ি চড়াই-উতরাই তাঁকে দমাতে পারেনি। স্থানীয়রাই প্রথমে থমকে দাঁড়ান এই লড়াকু যুবককে দেখে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য মিতালী মহন্ত। সাজুলের এই অদম্য জেদকে কুর্নিশ জানিয়ে তাঁর হাতে পানীয় জল ও শুকনো খাবারের প্যাকেট তুলে দেন তিনি। সাজুল সশ্রদ্ধায় খাবারের প্যাকেট নিতে অস্বীকার করেন। বলেন, দিদি, আমার কাছে সব আছে। তবে স্থানীয় মানুষের ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে পানীয় জলের বোতলটি সানন্দে গ্রহণ করেন। কয়েক মিনিট কথা বলে, ছবি তুলে আবার প্যাডেলে চাপ দেন তিনি। লক্ষ্য তখন সামনের পাহাড়।
সাজুল জানান, ছোটবেলা থেকেই ঘুরে বেড়ানোর শখ। কিন্তু একটি হাত নেই বলে বহু মানুষ বলতেন, তুমি পারবে না। সেই পারবে না কথাটাকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন তিনি। প্রায় তিন বছর ধরে চলছে তাঁর এই ভারত ভ্রমণ। এখনও পর্যন্ত রাজস্থান, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ-সহ ২০টিরও বেশি রাজ্য সাইকেলে ঘুরেছেন। পথে থাকা-খাওয়ার জন্য কোনও বড় স্পনসর নেই। গ্রামের মানুষ, চায়ের দোকান, ধর্মশালা আর পথচলতি মানুষের সাহায্যই তাঁর ভরসা। রাতে কোনও মন্দিরের চাতাল, স্কুলের বারান্দা বা পুলিশ ক্যাম্পে আশ্রয় নেন। সাইকেলটিও তিনি নিজেই বিশেষভাবে তৈরি করিয়েছেন। ব্রেক ও গিয়ার সবই ডান হাতে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
সাজুল বলেন, আমি দেখাতে চাই শরীর নয়, মনটাই আসল। যারা বলে অক্ষম, তারা আসলে চেষ্টাই করে না। আমি ভারতকে চিনতে চাই, মানুষকে চিনতে চাই। তাঁর এই যাত্রার নাম দিয়েছেন ‘এক হাতে ভারত দর্শন’। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আজকের দিনে যেখানে ছোটখাটো কারণে মানুষ ঘর থেকে বেরোতে চায় না, সেখানে একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী যুবক এক হাতে সাইকেল চালিয়ে গোটা দেশ ঘুরছে, এটা সত্যিই অনুপ্রেরণার। মিতালী মহন্ত বলেন, ওর জেদ দেখে চোখে জল এসে গিয়েছিল। আমাদের তরুণ প্রজন্মের উচিত ওর কাছ থেকে শেখা।
এখন সাজুলের সামনে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা। দার্জিলিং পেরিয়ে সিকিম, তারপর অরুণাচল, নাগাল্যান্ড, মণিপুর হয়ে আবার সমতলে ফেরার ইচ্ছে। পথে যত বাধাই আসুক, তিনি থামবেন না। সাজুল টুডুর এই হার না মানা লড়াই শুধু একটি ভ্রমণ নয়। এটি সমাজের কাছে বার্তা, ইচ্ছেশক্তি থাকলে কোনও সীমারেখাই আটকাতে পারে না। তাঁর সাইকেলের চাকা এখন শুধু রাস্তা মাপছে না, মাপছে মানুষের সাহসের পরিধিও।
জয় নিশ্চিত! সিউড়ির কাউন্টিং সেন্টারের সামনে বিজেপির গেরুয়া আবিরে হোলি