
এম ওয়াহেদুর রহমান
‘আলোর মশাল হাতে তুমি,দাঁড়িয়ে আছো দ্বারে,তোমার আলোয় ঘুঁচবে অন্ধকার —
বর্তমান সময়ে শিক্ষক দিবস শুধু একটি আনুষ্ঠানিক উদযাপন নয়,বরং ডিজিটাল তথা পরিবর্তনশীল যুগে শিক্ষকতার চ্যালেঞ্জ ও গুরুত্বকে নতুন করে মূল্যায়ন করার দিন। আজকের ডিজিটাল যুগে শিক্ষার্থীর হাতে বইয়ের পাশাপাশি রয়েছে স্মার্টফোন।কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অনলাইন শিক্ষা এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি শিক্ষার জগতে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে। তবে মনের গহীনে প্রশ্ন জাগে – শিক্ষকের প্রয়োজন কি আর দরকার নেই ! যুগপ্রবাহে তথ্য সহজলভ্য হলেও তথ্য নির্বাচন করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। জ্ঞানার্জনের পদ্ধতি ক্রমশঃ বৃদ্ধি হলেও সেই জ্ঞানকে মানবিক ও সৃজনশীলভাবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা অনস্বীকার্য।কেননা বর্তমানে শিক্ষক শুধু তথ্যের উৎস নন, তিনি একজন পরামর্শদাতা, পথপ্রদর্শক এবং মূল্যবোধের কারিগর। কিন্তু বর্তমান সময়ে সামাজিক বাস্তবতায় শিক্ষকদের প্রতি অবমাননা, হেনস্থা বা নিগ্ৰহের ঘটনা উদ্বেগজনক।
শিক্ষকতা নিছক একটি পেশা নয় বরং এটি একটি মহান দায়িত্ব। শিক্ষকেরাই হলেন সমাজের এক নীরব নির্মাতা বা কারিগর। ‘ শিক্ষক ‘ শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জ্ঞান, আর্দশ, শৃঙ্খলা, মানবিকতা ও আলোর এক অনন্য সম্পর্ক। একজন শিক্ষকের কাজ কেবলমাত্র শ্রেনিকক্ষে পাঠদান করা নয়, তিনি শিক্ষার্থীর মধ্যে সত্য, ন্যায়, শৃঙ্খলা, সহমর্মিতা, দেশপ্রেম ও মানবিকতার বীজ বপন করেন। শিক্ষক হলেন সেই মানুষ যিনি নিজে জ্ঞানের ধারণ করে অন্যের জীবনকে আলোকিত করেন। চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, প্রশাসক, শিল্পী কিংবা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল মানুষের পেছনে কোন না কোন শিক্ষকের অবদান অনস্বীকার্য।শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্ক কেবল শ্রেনিকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো শ্রদ্ধা, বিশ্বাস ও ভালোবাসা। একজন আদর্শ শিক্ষক যেমন শিক্ষার্থীর প্রতি স্নেহশীল, তেমনি প্রয়োজনে কঠোর ও হন। কেননা শিক্ষকের কঠোরতার পেছনেও থাকে শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতকে সুন্দর করার উদ্দেশ্য। পুনরায় শিক্ষার্থীরও উচিত শিক্ষকের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা, তাঁর পরামর্শ গ্ৰহন করা। শিক্ষকে সম্মান করা মানে কেবল একজন ব্যক্তিকে সম্মান করা নয়,বরং জ্ঞান, শিক্ষা ও মানবিকতাকে সম্মান করা।
ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি, বিশিষ্ট দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ ড.সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন-এর জন্মদিন অর্থাৎ ৫ সেপ্টেম্বর ভারতের সর্বত্রই মহাসমারহে শিক্ষক দিবস হিসাবে পালিত হয়। ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন ১৮৮৮ সালের ৫ সেপ্টেম্বর জন্মগ্ৰহন করেন। কিন্তু ১৯৯৪ সাল থেকে ইউনেস্কোর উদ্যোগে ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসাবে পালিত হয়।রাধাকৃষ্ণন বিশ্বাস করতেন, ‘একটি উন্নত জাতি গড়ে তুলতে শিক্ষার কোন বিকল্প নেই এবং শিক্ষকের ভূমিকা সেখানে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।’ ৫ সেপ্টেম্বর আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় – একজন শিক্ষক কেবলমাত্র ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিক্ষা দেন না বরং তিনি ভবিষ্যৎ সমাজ ও দেশকে গড়ে তোলেন। শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা প্রকাশ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
শিক্ষকের হাতে কেবলমাত্র চক নয়, থাকে একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। শিক্ষকে সম্মান করার সর্বোত্তম পন্থা হলো তাঁর দেওয়া শিক্ষাকে জীবনে কাজে লাগিয়ে একজন সৎ, মানবিক ও দায়িত্বশীল হয়ে উঠা। একজন শিশুর জীবনকে সর্বাপেক্ষা বেশি প্রভাবিত করেন একজন শিক্ষক। তিনি শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দানের সাথে সাথে শিক্ষার্থী কে তার জীবনের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে সহায়তা করেন। একজন শিশুর হাতে যখন প্রথম খড়ি উঠে, তখন সে জানে না অক্ষর গুলো একদিন তার পৃথিবী বদলে দেবে। সে জানে না ‘ অ, আ ‘ কিংবা ‘ এ, বি, সি ‘এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে তার ভবিষ্যতের অসংখ্য দরজা। সেই দরজা গুলো খুলে দেওয়ার মানুষটি হলেন শিক্ষক।একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষাব্যবস্থার উপর, আর শিক্ষাব্যবস্থার প্রাণ হলেন শিক্ষক। তাই শিক্ষকদের সামাজিক মর্যদা, সম্মান ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষক কোন নির্দিষ্ট দিনের নন , বরং তিনি আমাদের প্রতিটা সাফল্যের নেপথ্যে থাকা নীরব শক্তি। সময় বদলাবে, প্রযুক্তি বদলাবে , শিক্ষার পদ্ধতি বদলাবে কিন্তু একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রয়োজন কখনোই শেষ হবেনা।