নয়া জামানা : বাঙালির উৎসব মানেই শুধু আনন্দ-আয়োজন নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ইতিহাস, লোকবিশ্বাস এবং সমাজজীবনের নানা অজানা অধ্যায়। তেমনই একটি উৎসব হল জামাইষষ্ঠী। আজকের দিনে এটি মূলত জামাইকে ঘিরে শাশুড়ির আদর-আপ্যায়নের উৎসব হিসেবে পরিচিত হলেও, এর শিকড় কিন্তু অনেক গভীরে প্রোথিত। আশ্চর্যের বিষয়, যে তিথিকে ঘিরে আজ জামাইদের রাজত্ব, তার সঙ্গে একসময় জামাইয়ের কোনও সম্পর্কই ছিল না।ইতিহাস বলছে, বর্তমান জামাইষষ্ঠীর উৎস ছিল অরণ্যষষ্ঠী। জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্ল ষষ্ঠী তিথিতে গ্রামবাংলার নারীরা দেবী ষষ্ঠীর আরাধনা করতেন। দেবী ষষ্ঠীকে সন্তান রক্ষা ও সন্তানপ্রাপ্তির দেবী হিসেবে মানা হয়। সেই কারণে বছরের বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের ষষ্ঠী ব্রত পালনের প্রচলন ছিল।

অরণ্যষষ্ঠীর বিশেষত্ব ছিল প্রকৃতির সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক। ব্রত পালনের জন্য নারীরা অরণ্যে যেতেন। অরণ্য না থাকলে বাড়ির উঠোনেই গাছপালা ও ডালপালা দিয়ে ছোট্ট বনভূমির প্রতিরূপ তৈরি করা হত।লোককথায় রয়েছে, দেবী ষষ্ঠী এক গৃহবধূকে এই ব্রতের নিয়ম শেখান। সেই গৃহবধূ ব্রতের দিনে নিজের মেয়ে ও জামাইকে বাড়িতে আমন্ত্রণ জানান। জামাইয়ের কপালে দই-চন্দনের ফোঁটা, হাতে আম-কাঁঠালের বাটা এবং বিশেষ ভোজের আয়োজন—সেখান থেকেই নাকি অরণ্যষষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় জামাই আদরের রীতি। ধীরে ধীরে উৎসবের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন জামাই, আর অরণ্যষষ্ঠী পরিচিতি পায় জামাইষষ্ঠী নামে।তবে এর পেছনে ছিল সামাজিক বাস্তবতাও। একসময় বাংলার বহু অঞ্চলে এমন রীতি ছিল যে, মেয়ের বিয়ের পর সহজে শ্বশুরবাড়িতে যেতে পারতেন না তাঁর বাবা-মা। অনেক ক্ষেত্রে মেয়ের সন্তান না হওয়া পর্যন্ত সেই সুযোগ মিলত না। ফলে দীর্ঘদিন মেয়েকে দেখতে না পেয়ে ব্যাকুল হয়ে উঠতেন বাবা-মা, বিশেষ করে মায়েরা। সেই অভাব মেটাতেই নির্দিষ্ট দিনে মেয়ে-জামাইকে বাড়িতে ডেকে এনে আপ্যায়নের প্রথা চালু হয়। সময়ের সঙ্গে সেটাই উৎসবে পরিণত হয়েছে।জ্যৈষ্ঠ মাসকে এই উৎসবের জন্য বেছে নেওয়ার পিছনেও রয়েছে বাস্তব কারণ। এ সময় বাংলার গাছে গাছে পাকা আম, কাঁঠাল, লিচুর সমারোহ। পুকুর-নদীতেও মেলে প্রচুর মাছ। ফলে অতিথি আপ্যায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সব উপকরণ সহজেই পাওয়া যেত। বর্ষা শুরু হওয়ার আগে এই সময়টাই ছিল বড়সড় ভোজের আদর্শ মৌসুম।আজকের দিনে জামাইষষ্ঠী অনেকটাই পারিবারিক মিলনমেলার উৎসব। তবে জামাই আদরের ঝলমলে আয়োজনের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে প্রকৃতিপূজার ঐতিহ্য, দেবী ষষ্ঠীর আশীর্বাদের বিশ্বাস এবং বাংলার সমাজজীবনের এক অনন্য ইতিহাস। তাই জামাইষষ্ঠী শুধু পেটপূজার দিন নয়, এটি বাঙালির সংস্কৃতি, সম্পর্ক ও স্মৃতির এক জীবন্ত দলিল।
আরও পড়ুন: