নয়া জামানা:দিনের আলোয় সে নিছকই একটি শুকনো ডাল।কিন্তু রাত নামতেই জেগে ওঠে জঙ্গলের এক রহস্যময় প্রহরী! যার চোখে অন্ধকারও ধরা পড়ে স্পষ্ট আর যার কান্নার মতো ডাক শুনে আজও কেঁপে ওঠে গভীর অরণ্য। এ যেন প্রকৃতির বুকেই লুকিয়ে থাকা এক জীবন্ত রহস্য-পোতু,পৃথিবীর অন্যতম বিস্ময়কর ছদ্মবেশী পাখি।
ভাবুন তো… আপনি জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হাঁটছেন। সামনে একটি শুকনো গাছের ডাল। হঠাৎ সেই ডালই খুলে ফেলল দুটি বিশাল চোখ! মুহূর্তেই যেন বাস্তব আর কল্পনার সীমারেখা মিলিয়ে যায়।এটাই পোতু। এমন এক নিশাচর পাখি যার ছদ্মবেশের কাছে হার মানে প্রকৃতির সবচেয়ে দক্ষ শিল্পীরাও।গাছের ছালের মতো রং, ভাঙা ডালের মতো অবয়ব, আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা সম্পূর্ণ স্থির হয়ে থাকার অসাধারণ ক্ষমতা সব মিলিয়ে তাকে আলাদা করে চেনা প্রায় অসম্ভব।
এই রহস্যময় নিশাচর পাখিটির প্রধান নিবাস মধ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকার ঘন জঙ্গলে।
এই অভিনব ছদ্মবেশই তার বর্ম। বাজ, ঈগল কিংবা অন্য শিকারির চোখ ফাঁকি দিয়ে বছরের পর বছর টিকে আছে সে। বিপদ যতই কাছে আসুক শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নড়ে না পোতু। যেন নিঃশ্বাসহীন এক কাঠের মূর্তি।কিন্তু সূর্য ডুবতেই পাল্টে যায় দৃশ্যপট। বিশাল চোখ মেলে নীরব আকাশের শিকারিতে পরিণত হয় সে। মুহূর্তের ঝাঁপে ধরে ফেলে উড়ন্ত পোকামাকড়, বাদুড়, এমনকি ছোট পাখিও। অন্ধকারই তার রাজ্য আর নীরবতাই তার শক্তি।
তবে পোতুকে ঘিরে সবচেয়ে বড় রহস্য তার ডাক। গভীর রাতে জঙ্গলের বুক চিরে ভেসে আসে বুকভাঙা কান্নার মতো এক আর্তনাদ। সেই আওয়াজ শুনে বহু মানুষ আজও বিশ্বাস করেন এ কোনো সাধারণ পাখি নয়,এ যেন অরণ্যের অদৃশ্য আত্মার কণ্ঠস্বর। তাই বিশ্বের নানা প্রান্তে তার আরেক নাম-ভূতপাখি।
আরও অবাক করার বিষয়, পোতু আলাদা করে বাসা বানায় না।গাছের ডালের ছোট্ট খাঁজেই একটি মাত্র ডিম পাড়ে। মা-বাবা দু’জন মিলে আগলে রাখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। প্রকৃতির নিঃশব্দ পাঠশালায় সেখানেই শুরু হয় বেঁচে থাকার শিক্ষা।লোককথায় কেউ তাকে বলে রহস্যের দূত, কেউ বলে জঙ্গলের প্রহরী। যদিও বিজ্ঞান এসব বিশ্বাস করে না, তবুও একথা মানতেই হয়-পোতু শুধু একটি পাখি নয়,প্রকৃতির বিস্ময়কর সৃষ্টির এক জীবন্ত প্রতীক।