কুশল রায়||নয়া জামানা||কোচবিহার: কোচবিহার জেলার ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থানগুলির মধ্যে গোসানিমারি রাজপাট এক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। জেলার দিনহাটা মহকুমার অন্তর্গত গোসানিমারি এলাকায় অবস্থিত এই রাজপাট একসময় ছিল কামতাপুর–কোচ রাজবংশের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র। ইতিহাসের পাতা উল্টোলেই স্পষ্ট হয়, এই রাজপাট কোচবিহারের রাজকীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল নিদর্শন।
ইতিহাসবিদদের মতে, মহারাজা বিশ্ব সিংহ ও মহারাজা নর নারায়ণের আমলে গোসানিমারি রাজপাট বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে। কোচ রাজারা এখানে প্রশাসনিক বৈঠক, সামরিক পরিকল্পনা ও রাজ্য পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। একসময় এই রাজপাটকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল সমৃদ্ধ জনপদ। আজ যদিও সেই রাজকীয় জৌলুস আর নেই, তবু ধ্বংসাবশেষের মধ্যেও লুকিয়ে আছে গৌরবময় অতীতের স্মৃতি।
গোসানিমারি রাজপাটের আশেপাশে এখনও দেখা যায় প্রাচীন ইটের দেয়াল, ভিত্তি ও নানা স্থাপত্যের চিহ্ন। প্রত্নতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানে আরও বিস্তৃত খনন হলে কোচ রাজবংশের বহু অজানা তথ্য উঠে আসতে পারে। ইতিমধ্যেই প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এই এলাকাকে সংরক্ষিত ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, রাজপাট চত্বরে আজও ইতিহাস যেন নীরবে কথা বলে।
শুধু ইতিহাস নয়, লোককথা ও কিংবদন্তিতেও গোসানিমারি রাজপাটের বিশেষ স্থান রয়েছে। এলাকার প্রবীণদের মুখে শোনা যায়, রাজপাট সংলগ্ন অঞ্চলে একসময় রাজপরিবারের বাসস্থান, অস্ত্রাগার ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের জন্য আলাদা স্থাপনা ছিল। রাজাদের সঙ্গে যুক্ত নানা কাহিনি আজও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে রয়েছে।
বর্তমানে গোসানিমারি রাজপাট পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠছে। ইতিহাসপ্রেমী ও গবেষকদের পাশাপাশি সাধারণ দর্শনার্থীরাও এখানে এসে কোচবিহারের অতীত সম্পর্কে ধারণা লাভ করছেন। তবে পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ ও পর্যটন পরিকাঠামোর অভাব এখনো বড় সমস্যা। স্থানীয়দের দাবি, এই ঐতিহাসিক স্থানকে ঘিরে পর্যটন উন্নয়ন হলে কর্মসংস্থান বাড়বে এবং কোচবিহারের ইতিহাস আরও বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
গোসানিমারি রাজপাট শুধু একটি ধ্বংসাবশেষ নয়, এটি কোচবিহারের আত্মপরিচয়ের প্রতীক। যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রচারের মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক স্থানের গুরুত্ব আগামী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এখন সময়ের দাবি।