ব্রেকিং
[pj-news-ticker]

একশো দিনের খতিয়ান

সুনীল মাইতি বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক   ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো যেকোনো নতুন প্রশাসনের প্রথম একশো দিন কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নয়; বরং এটি সরকারের কাজের ধারা; অগ্রাধিকার এবং দূরদর্শিতার এক প্রাথমিক মানদন্ড। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার....

একশো দিনের খতিয়ান

সুনীল মাইতি বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক   ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো যেকোনো নতুন প্রশাসনের প্রথম একশো দিন....

Facebook
Twitter
LinkedIn
Email
WhatsApp
X
Threads
Telegram

আরও পড়ুন


সুনীল মাইতি
বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক

 

ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো যেকোনো নতুন প্রশাসনের প্রথম একশো দিন কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নয়; বরং এটি সরকারের কাজের ধারা; অগ্রাধিকার এবং দূরদর্শিতার এক প্রাথমিক মানদন্ড। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর মাননীয় শুভেন্দু অধিকারীর প্রথম ১০০ দিনের মেয়াদ সম্প্রতি অতিক্রান্ত হয়েছে। একটি রাজ্যের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা রক্ষা; আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং নাগরিক নিরাপত্তার মতো অতি সংবেদনশীল বিষয়গুলোর দায়ভার যার কাঁধে ন্যস্ত; তার সূচনাপর্বের কাজ পর্যালোচনা করা প্রশাসনিক এবং জনস্বার্থের নিরীখে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই সময়সীমার মধ্যে তাঁর গৃহীত পদক্ষেপে যেমন কিছু স্পষ্ট অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলেছে; তেমনই রাজ্য প্রশাসনের সামগ্রিক কার্যকারিতা নিয়ে কিছু মৌলিক খামতি ও চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

অগ্রগতির ইতিবাচক দিক ও প্রশাসনিক সক্রিয়তা

প্রথমত: দায়িত্বভার গ্রহণের পর শুভেন্দু অধিকারী সরকারের সবচেয়ে লক্ষণীয় অগ্রগতি দেখা গেছে প্রশাসনিক সমন্বয় বজায় রাখা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টায়। একটি রাজ্য প্রশাসনের মসৃণ পরিচালনার জন্য পুলিশ প্রশাসন এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করার জরুরী। প্রথম একশো দিনে তিনি মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে একাধিক পর্যালোচনা সভা করেছেন; নিচু তলার আমলাতন্ত্রের মধ্যে এক ধরনের তৎপরতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।

দ্বিতীয়তঃ সাইবার অপরাধ ও ডিজিটাল সুরক্ষার ক্ষেত্রে প্রশাসনের কিছু সময়োপযোগী উদ্যোগ নজর কেড়েছে। বর্তমান যুগে অপরাধের ধরন বদলাচ্ছে এবং প্রযুক্তিগত অপরাধ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সাইবার ক্রাইম থানাগুলোর আধুনিকীকরণ এবং দক্ষ আধিকারিক নিয়োগের ব্যাপারে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে হিসেবে তাঁর নেওয়া পদক্ষেপগুলি প্রশংসনীয়। অপরাধমূলক ঘটনার দ্রুত তদন্ত ও চার্জশিট পেশের ওপর জোর দেওয়া প্রশাসনিক কার্যকারিতা বৃদ্ধির একটি ইতিবাচক দিক।

তৃতীয়তঃ বিভিন্ন স্পর্শকাতর অঞ্চলে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। জরুরী মুহূর্তে দ্রুত পুলিশ মোতায়েন এবং প্রশাসনিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। জেলাভিত্তিক প্রশাসনিক ব্যবস্থার কাজ পর্যবেক্ষণ করা এবং শীর্ষ আধিকারিকদের দায়িত্বশীল করার ব্যাপারে তাঁর মনোযোগ স্পষ্ট ছিল।

খামতি ও পদ্ধতিগত দুর্বলতা

অগ্রগতির পাশাপাশি প্রথম একশো দিনের এই মেয়াদে বেশ কিছু খামতি ও চ্যালেঞ্জও সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে…..

প্রথমত: প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে প্রশ্ন পুরোপুরি মেলেনি। স্বরাষ্ট্র দপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কোনো আধিকারিক কাজ করার সময় তাঁর সিদ্ধান্তগুলো কতটা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকছে; তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষের মধ্যে পুলিশি ব্যবস্থার প্রতি আস্থা আরও বাড়ানো এবং সবক্ষেত্রে নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগের যে প্রত্যাশা ছিল; তা পুরোপুরি পূরণ হয়নি।

দ্বিতীয়ত: পুলিশ সংস্কার ও আধুনিকীকরণের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব লক্ষ্য করা গেছে। কেবল কিছু তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই পরিকাঠামোগত পরিবর্তন আসে না। রাজ্য পুলিশের কর্মীদের কর্মঘন্টা; কাজের পরিবেশ এবং মনস্তাত্ত্বিক চাপের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে এখনো কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন দৃশ্যমান নয়। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র ও প্রযুক্তির ব্যবহারে নিচের তলার পুলিশ কর্মীদের প্রশিক্ষণের প্রক্রিয়াটি এখনোও ধীর গতিতে চলছে।

তৃতীয়ত: সাধারণ নাগরিকদের অভিযোগ নিস্পত্তি ব্যবস্থার(Grievance Redressal Mechanism)অভাব অন্যতম বড় খামতি। থানা পর্যায়ে গিয়ে সাধারণ মানুষ যাতে কোনো হয়রানি ছাড়া অভিযোগ দায়ের করতে পারেন এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তার উত্তর পান; সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট এবং কার্যকর ডিজিটাল ব্যবস্থা এখনোও পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। ফলের সাধারণ মানুষের কাছে প্রশাসনিক পদক্ষেপের সুবিধা পৌঁছানোর হার ধীর রয়ে গেছে।

ভবিষ্যতের পথ ও প্রশাসনিক মূল্যায়ন

প্রশাসনের শীর্ষপদে প্রথম ১০০ দিন হলো কোনো আধিকারিকের জন্য একটি মানিয়ে নেওয়ার বা ‘লার্নিং -কার্ভ(Learning -Curve)’ -এর সময়। এই সময়ে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার যে প্রশাসনিক সক্রিয়তা দেখিয়েছেন তা প্রশংসনীয় হলেও রাজ্য স্বরাষ্ট্র দপ্তরের মতো বৃহৎ ও জটিল কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের জন্য আরোও গভীর এবং দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে স্বরাষ্ট্র দপ্তরের মূল কাজ কেবল অপরাধ দমন নয়; বরং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে নাগরিকের স্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করা। আগামী দিনগুলোতে তিনি কিভাবে রাজনৈতিক চাপ সামলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার হ্রাস করবেন এবং পুলিশ প্রশাসনকে আরোও বেশি নাগরিক বান্ধব করে তুলবেন; তার ওপরই নির্ভর করবে এই প্রাথমিক অগ্রগতির সাফল্য। খামতিগুলোকে চিহ্নিত করে সেগুলোর দ্রুত সমাধান করা এবং অর্জিত সাফল্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়াই হবে আগামী মেয়াদে তাঁর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।


 

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

আজকের খবর