নয়া জামানা,বহরমপুর : আর কিছুক্ষণের রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা। তার আগেই রাজ্য রাজনীতিতে নয়া সমীকরণের ইঙ্গিত দিলেন ভরতপুরের বিদায়ী বিধায়ক তথা আম জনতা উন্নয়ন পার্টি (এজেউপি)-র চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবীর। গণনা শুরুর ঠিক মুখে ডিগবাজি খেয়ে তিনি জানিয়ে দিলেন, সরকার গঠনে শর্তসাপেক্ষে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসকেই সমর্থন করতে চান। তবে সেই সমর্থনের বিনিময়ে তাঁর চাই ‘সম্মানজনক শর্ত’। ভোটের ফল বেরোনোর আগেই একসময়ের ‘তাড়িয়ে দেওয়া’ দলের প্রতি তাঁর এই আকস্মিক নরম মনোভাব নিয়ে শোরগোল পড়ে গিয়েছে বঙ্গ রাজনীতিতে। বিজেপিকে কোনোভাবেই তিনি সমর্থন করবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন এই বিতর্কিত রাজনীতিক। হুমায়ুনের এই ভোলবদলকে কেন্দ্র করে মুর্শিদাবাদের রাজনৈতিক অলিন্দে এখন একটাই প্রশ্ন— তবে কি ‘কিংমেকার’ হওয়ার স্বপ্নে বিভোর একদা তৃণমূলের এই দাপুটে নেতা? এদিন সাংবাদিক বৈঠকে হুমায়ুন দাবি করেন, এবার দুই প্রধান শিবিরের কাউকেই মানুষ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিচ্ছে না। তাঁর মতে, সরকার গঠনে নির্ণায়ক ভূমিকা নিতে চলেছে তাঁর নবগঠিত দলই। তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত এই বিধায়কের দাবি, রাজ্যে ২৫ থেকে ৩০টি আসনে তাঁর দলের প্রার্থীরা অনায়াসে জয়লাভ করছেন। এই বিপুল সংখ্যক বিধায়ক হাতে থাকলেই তৃণমূলের সঙ্গে দর কষাকষিতে বসতে পারবেন বলে মনে করছেন তিনি। মুর্শিদাবাদ জেলায় আর একটি বাবরি মসজিদ তৈরির বিতর্কিত দাবি তুলে জাতীয় রাজনীতির শিরোনামে এসেছিলেন হুমায়ুন কবীর। মসজিদ নির্মাণের ইস্যুকে হাতিয়ার করে সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক নিজের দিকে টানতে একসময় সফল হয়েছিলেন তিনি। প্রস্তাবিত মসজিদের জায়গায় ইট, বালি, পাথর জমা হওয়া থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দান করা লক্ষ লক্ষ টাকা— সব মিলিয়ে হুমায়ুন হয়ে উঠেছিলেন চর্চার কেন্দ্রবিন্দু। যদিও সেই নির্মাণ কাজ কার্যত বিশ বাঁও জলেই পড়ে রয়েছে। এর মাঝেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নির্বাচনী প্রচারে এসে গর্জে উঠেছিলেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, বাংলায় আর কোনো বাবরি মসজিদ হতে দেবে না বিজেপি সরকার। ভোটের লড়াই যখন তুঙ্গে, তখনই হুমায়ুন কবীরের একটি ভাইরাল ভিডিয়ো ঘিরে বিতর্ক তুঙ্গে ওঠে। অভিযোগ ওঠে, বিজেপির সঙ্গে এক হাজার কোটি টাকার গোপন নির্বাচনী চুক্তি করেছেন তিনি। যদিও সেই অভিযোগ শুরু থেকেই অস্বীকার করেছেন হুমায়ুন। তাঁর দাবি, ওই ভিডিয়োটি সম্পূর্ণ ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি। এই বিতর্ক তাঁকে অনেকটা ব্যাকফুটে ঠেলে দিলেও তিনি লড়াই ছাড়েননি। তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর জনতা উন্নয়ন পার্টি বা জেইউপি গঠন করেছিলেন। পরে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে তা বদলে হয় ‘আম জনতা উন্নয়ন পার্টি’ (এজেউপি)। আসাদউদ্দিন ওয়েসির মিমি-র সঙ্গে জোট করে তিনি এই নির্বাচনে লড়েছেন। ভোটের ফল ঘোষণার ঠিক আগে নিজের অবস্থান ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে দিয়ে হুমায়ুন বলেন, ‘বিজেপিকে আমি কোনওভাবেই সমর্থন করব না। কারণ আমার দলকে বারবার বিজেপির বি টিম বলা হয়েছে।’ একই সঙ্গে তিনি সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, ‘আমার কাছে খবর আছে, তৃণমূলের বহু জয়ী প্রার্থী বিজেপির দিকে পা বাড়িয়ে আছে। তৃণমূল আগে নিজেদের ঘর সামলাক। তবে আমি শর্তসাপেক্ষে তৃণমূলকে সমর্থন করব।’ তাঁর কথায় স্পষ্ট, পুরনো দলে ফেরার বা সমর্থনের পথ তিনি খোলা রাখছেন ঠিকই, কিন্তু তা হবে তাঁর নিজের শর্তেই। কেন এই হঠাৎ ভোলবদল? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ব্যাকফুটে থাকা হুমায়ুন ফের লাইমলাইটে আসতে চাইছেন। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের আগে রেজিনগরে দাঁড়িয়ে তাঁর ‘৭০ বনাম ৩০’ মন্তব্যের নেপথ্যেও যে তৃণমূল নেত্রীর নির্দেশ ছিল, তা তিনি আগেই স্বীকার করেছিলেন। এবারের ডিগবাজির পিছনেও তেমন কোনো গভীর পরিকল্পনা রয়েছে কি না, তা নিয়ে জল্পনা চলছে। মানুষের কথায়, আগুন যেমন ছাই চাপা দিয়ে রাখা যায় না, সত্যও তেমনই চাপা থাকে না। গণনার সকালে কোন দিকে জল গড়ায়, এখন সেটাই দেখার। সত্যের উন্মোচন শুধু সময়ের অপেক্ষা। ফাইল ফটো।
সেলিম-অধীরকে সমর্থন, বামেদের বিদায়, মুর্শিদাবাদে কি কিংমেকার ‘বিদ্রোহী’ হুমায়ূন ?