নয়া জামানা ডেস্ক : সোমবার ৪ মে প্রকাশিত হল রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের ২৯৩টি আসনের চূড়ান্ত ফল। সেই ফলাফলে স্পষ্ট হয়ে গেল একুশের সেই অপ্রতিরোধ্য জয়ের স্মৃতি ফিকে করে রাজ্যে বইছে প্রবল ‘গেরুয়া ঝড়’। শাসকদল তৃণমূলের অজেয় দুর্গ বলে পরিচিত একাধিক আসনে ধরাশায়ী হয়েছেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে তাঁর মন্ত্রিসভার দাপুটে মন্ত্রী এবং দুঁদে রাজনীতিকরা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরাজয় এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় ঘটনা হলেও, ঘাসফুল শিবিরের লম্বা তালিকায় নাম জুড়েছে একাধিক প্রাক্তন মন্ত্রী ও বিদায়ী বিধায়কের। বিজেপির ‘অনামী’ মুখ কিংবা ‘জেন জ়ি’ প্রার্থীদের কাছে হেরে বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিয়েছেন বাংলার সাধারণ ভোটাররা। নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চমক নন্দীগ্রাম নয়, বরং গোটা রাজ্যের প্রেক্ষিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত পরাজয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দীর্ঘদিনের জল্পনা সত্যি করে নিজের একসময়ের অন্যতম সহযোগী তথা অধুনা বিজেপির দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। ‘ঘরের মেয়ে’র এই পরাজয়ের মধ্য দিয়ে তৃণমূলের পতনের সুরটি যেন এই কেন্দ্রেই চিরস্থায়ী ভাবে বাঁধা হয়ে গিয়েছে। তবে দল হারলেও নিজের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সম্মান রক্ষা করেছেন ফিরহাদ হাকিম। কলকাতা বন্দর আসন থেকে ৫৬ হাজারেরও বেশি ভোটের বিপুল ব্যবধানে জিতেছেন কলকাতার বিদায়ী মেয়র তথা রাজ্যের প্রভাবশালী মন্ত্রী। বিগত পাঁচ বছরে বিজেপির কাছ থেকে ধেয়ে আসা শ্লেষ ও কটাক্ষ সামলে তিনি প্রমাণ করেছেন নিজের প্রেস্টিজ ফাইটে তিনি আজও অজেয়। বিজেপির রাকেশ সিংহ তাঁর জনপ্রিয়তায় ফাটল ধরাতে পারেননি।
রাজধানীর অন্য প্রান্তের চিত্র অবশ্য তৃণমূলের জন্য বিন্দুমাত্র সুখকর নয়। রাসবিহারী কেন্দ্রে শেষ পর্যন্ত ভোটের অঙ্ক মেলাতে পারলেন না দেবাশিস কুমার। এলাকায় ‘দেবা’ নামে অত্যন্ত জনপ্রিয় এই নেতা হেরে গেলেন বিজেপির হেভিওয়েট প্রার্থী স্বপন দাশগুপ্তের কাছে। হারের ব্যবধান প্রায় ২১ হাজার। ২০২১ সালে জয়ী হলেও ২০২৬-এ অভিজাত ও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালির এই কেন্দ্রটি বিজেপির ঝুলিতে গিয়েছে। অন্যদিকে, বালিগঞ্জ কেন্দ্রে ঘাসফুলের মান রেখেছেন আশি-ঊর্ধ্ব প্রবীণ রাজনীতিক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই দীর্ঘদিনের আস্থাভাজন ৬১,৪৭৬ ভোটে হারিয়েছেন বিজেপির শতরূপা এবং বামেদের ‘জেন জ়ি’ মুখ আফরিন বেগমকে। প্রথমবার বিধানসভা ভোটের ময়দানে পা রেখেই বাজিমাত করেছেন সাংবাদিক-অভিনেতা কুণাল ঘোষ। বেলেঘাটা থেকে তিনি জিতেছেন ২৮ হাজারেরও বেশি ভোটে। ভোটের আগে থেকেই তিনি জয়ের বিষয়ে যে আত্মবিশ্বাস দেখিয়েছিলেন, গণনাকেন্দ্রে তার প্রতিফলন দেখা গিয়েছে।
বিপর্যয়ের ছায়া আরও দীর্ঘ হয়েছে টলিউড সংলগ্ন টালিগঞ্জ কেন্দ্রে। তৃণমূলের অন্যতম হেভিওয়েট নেতা অরূপ বিশ্বাস ৬ হাজারের বেশি ভোটে হেরে গিয়েছেন বিজেপির পাপিয়া দে অধিকারীর কাছে। বেহালা পশ্চিমেও ঘটেছে নক্ষত্রপতন। রত্না চট্টোপাধ্যায়কে এ বার দল বেহালা পশ্চিমের টিকিট দিলেও সেখানকার মানুষ তাঁর ওপর ভরসা রাখেননি। ২৪,৬৯৯ ভোটে জয়ী হয়েছেন বিজেপির ইন্দ্রনীল খাঁ। উত্তর কলকাতায় ধাক্কা খেয়েছে তৃণমূলের পুরনো ঘাঁটিগুলোও। শ্যামপুকুর কেন্দ্রে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অজিত পাঁজার পুত্রবধূ তথা বিদায়ী মন্ত্রী শশী পাঁজা পরাস্ত হয়েছেন বিজেপির পূর্ণিমা চক্রবর্তীর কাছে। জয়ের ব্যবধান ১৪,৬৩৩ ভোট। কাশীপুর-বেলগাছিয়ায় অতীন ঘোষের হার আরও সামান্য— মাত্র ১৬৫১ ভোটে তাঁকে হারিয়েছেন বিজেপির রিতেশ তিওয়ারি। মানিকতলায় বাবার জয়ের ধারা বজায় রাখতে পারলেন না প্রয়াত সাধন-কন্যা শ্রেয়া পাণ্ডে। বিজেপির পোড়খাওয়া নেতা তাপস রায়ের কাছে ১৫,৬৪৪ ভোটে হেরেছেন তিনি।
জেলায় জেলাতেও ধরাশায়ী হয়েছে রাজ্যের শাসকদল। দমদমে ব্রাত্য বসুর পরাজয় বড় ধাক্কা তৃণমূলের কাছে। বিজেপির অরিজিৎ বক্সী ২৫,২৭৩ ভোটে হারিয়েছেন ব্রাত্যকে। মনে করা হয়েছিল ব্রাত্যের লড়াই সহজ হবে, কিন্তু ব্যালট বক্স অন্য কথা বলেছে। উত্তরবঙ্গের ছবিটা তৃণমূলের জন্য আরও করুণ। মেখলিগঞ্জে পরেশচন্দ্র অধিকারী ২৯,৫৮৪ ভোটে হেরে গিয়েছেন বিজেপির দধিরাম রায়ের কাছে। মনে করা হচ্ছে, পরেশ-কন্যা অঙ্কিতার নিয়োগ দুর্নীতি মামলার প্রভাব পড়েছে ইভিএমে। দিনহাটায় তিনবারের বিধায়ক উদয়ন গুহকেও ফিরতে হয়েছে খালি হাতে। তাঁকে ১৭,৪৪৭ ভোটে হারিয়েছেন বিজেপি প্রার্থী অজয় রায়। রাজগঞ্জে সোনাজয়ী অ্যাথলিট স্বপ্না বর্মণকে প্রার্থী করে তৃণমূল চমক দিতে চাইলেও জয় আসেনি। তিনি ২১,৪৭৭ ভোটে হেরেছেন দীনেশ সরকারের কাছে। শিলিগুড়িতেও ‘গেরুয়া হাওয়া’ প্রবল। মেয়র গৌতম দেবকে ৭৩,১৯২ ভোটের বিশাল ব্যবধানে হারিয়েছেন বিজেপির শঙ্কর ঘোষ।
মুর্শিদাবাদের ডোমকলে একদা দাপুটে পুলিশকর্তা হুমায়ুন কবীর এবার আর তৃণমূলের মুখরক্ষা করতে পারলেন না। তিনি ১৬ হাজারেরও বেশি ভোটে হেরেছেন সিপিএমের মহম্মদ মোস্তাফিজুর রহমানের কাছে। মতুয়া গড়েও ধাক্কা খেয়েছে ঘাসফুল। বাগদায় ৩৪,৬১৬ ভোটে হেরে গিয়েছেন সর্বকনিষ্ঠ বিধায়ক মধুপর্ণা ঠাকুর। দমদম উত্তরে মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য পরাজিত হয়েছেন বিজেপির সৌরভ সিকদারের কাছে। হারের ব্যবধান ২৬ হাজারের বেশি। ভাঙড়েও নওশাদ সিদ্দিকির জয়রথ থামাতে পারেননি শওকত মোল্লা। ক্যানিং পূর্বের এই বিদায়ী বিধায়ককে ৩২,০৮৮ ভোটে হারিয়ে নিজের জমি শক্ত করেছেন আইএসএফ নেতা নওশাদ।
কলকাতার উপকণ্ঠে বিধাননগরেও সুজিত বসুর মতো হেভিওয়েট প্রার্থীর হার হয়েছে। বিজেপির শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের কাছে তিনি হেরেছেন ৩৭ হাজারের বেশি ভোটে। রাজারহাট-গোপালপুরে গায়িকা অদিতি মুন্সিকে হারিয়ে জয়ী হয়েছেন আইনজীবী তরুণজ্যোতি তিওয়ারি। মধ্যমগ্রামে হারের মুখ দেখেছেন মন্ত্রী রথীন ঘোষ। তবে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বারুইপুর পশ্চিমে জয়ী হয়েছেন বিদায়ী স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়। উলুবেড়িয়া পূর্বেও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ১১,৮৩৮ ভোটে জিতে দলের সম্মান রক্ষা করেছেন। চন্দননগরে পরাজয় হয়েছে গায়ক-মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের। বিজেপির দীপাঞ্জনকুমার গুহ তাঁকে ১০ হাজারের বেশি ভোটে হারিয়েছেন। পশ্চিম মেদিনীপুরের সবং কেন্দ্রেও আর ভরসা হয়ে উঠতে পারলেন না বর্ষীয়ান মানস ভুঁইয়া। তিনি হেরেছেন বিজেপির অমলকুমার পন্ডার কাছে। আসানসোল উত্তরে দাপুটে আইনমন্ত্রী মলয় ঘটকও রক্ষা পাননি। তাঁকে ১১,৬১৫ ভোটে হারিয়েছেন বিজেপির কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়।
রাজ্যের এই নির্বাচনি ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, তৃণমূলের বহু পুরোনো ও অভিজ্ঞ নেতারাই মূলত বিজেপির নতুন মুখদের কাছে পরাস্ত হয়েছেন। মেখলিগঞ্জ থেকে আসানসোল, কিংবা শিলিগুড়ি থেকে বিধাননগর— সর্বত্রই হারের গ্লানি নিয়ে ফিরতে হয়েছে রাজ্যের প্রভাবশালী মন্ত্রীদের। মমতার মন্ত্রিসভায় থাকা একাধিক সদস্যের এই পরাজয় রাজনৈতিক মহলে বিস্ময় তৈরি করেছে। বিশেষ করে শশী পাঁজা, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য বা সুজিত বসুর মতো নেতাদের হার শাসক শিবিরের সংগঠনে বড়সড় ফাটলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এমনকি যে সব কেন্দ্রে তৃণমূলের জয় নিশ্চিত বলে মনে করা হয়েছিল, সেখানেও গেরুয়া ঝড়ের ধাক্কায় খড়কুটোর মতো উড়ে গিয়েছেন প্রার্থীরা।
এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও কামারহাটির চিত্রটা তৃণমূলের জন্য কিছুটা স্বস্তির। ‘কালারফুল বয়’ মদন মিত্র ৫৬৪৬ ভোটে জিতে নিজের দুর্গ রক্ষা করতে পেরেছেন। কিন্তু সামগ্রিক ফলের বিচারে তৃণমূলের এই হেভিওয়েটদের পরাজয় রাজ্যের রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। ‘নকআউট’ পর্বে মন্ত্রী-সান্ত্রীদের এই ধরাশায়ী হওয়ার ছবি বঙ্গ রাজনীতির ইতিহাসে বিরল বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সোমবারের এই ফল কেবল জয়-পরাজয়ের পরিসংখ্যান নয়, বরং এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার দলিল হয়ে রইল বাংলার ইতিহাসে। জয়ীরা যখন বিজয় উৎসবে মাতোয়ারা, তখন পরাজিতের শিবিরে শুরু হয়েছে ময়নাতদন্তের প্রস্তুতি। সব মিলিয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণ, গেরুয়া ঝড়ে রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্র যেন এক লহমায় বদলে গেল এই মে মাসের তপ্ত দুপুরে। একসময়ের দুর্ভেদ্য দুর্গগুলো আজ বিজেপির দখলে, আর ঘাসফুলের বড় বড় সেনাপতিরা আজ রণক্ষেত্র ছেড়ে বিদায় নিতে বাধ্য হলেন। এ এক নতুন বাংলার চিত্র, যা আগামী কয়েক বছর বঙ্গ রাজনীতির অভিমুখ নির্ধারণ করে দেবে।
এডিসি-তে ধরাশায়ী গেরুয়া শিবির, সরকার ছাড়ার হুঁশিয়ারি প্রদ্যোতের