নয়া জামানা ডেস্ক : তসর সিল্কের ঘিয়ে রঙের ধুতি-পাঞ্জাবি, কাঁধে উত্তরীয়। মালকোঁচা মারা ধুতির খুঁট গোঁজা পাঞ্জাবির পকেটে। সোমবার সন্ধ্যায় দিল্লির দীনদয়াল উপাধ্যায় মার্গে বিজেপির সদর দপ্তরে যখন নরেন্দ্র মোদী গাড়ি থেকে নামলেন, তখন তাঁকে দেখে চেনার উপায় নেই। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে বাংলায় গেরুয়া ঝড়ে পরিবর্তনের প্রত্যাশিত জয় আসতেই খোদ প্রধানমন্ত্রী ধরা দিলেন খাঁটি ‘বাঙালি বাবু’র বেশে। আগামী ২৫ বৈশাখ অর্থাৎ ৯ মে, কবিপক্ষের পুণ্যলগ্নেই কলকাতায় শপথ নেবে বাংলার নতুন বিজেপি সরকার, এমনটাই সূত্রের খবর । ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়ে গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গাসাগর পর্যন্ত পদ্ম ফোটানোর যে অঙ্গীকার তিনি করেছিলেন, এদিন তাকেই ‘ঐতিহাসিক’ বলে তকমা দিলেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলার বিধানসভা নির্বাচনে আশাতীত সাফল্যের পর এদিন দিল্লিতে বিজয় উৎসবের মেজাজ ছিল তুঙ্গে। শমীক ভট্টাচার্য-সহ বঙ্গ বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতিতে মোদী স্পষ্ট করে দেন, বাংলায় এই জয় কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিনের সাধনা যখন সিদ্ধ হয়, তখন যে খুশি আসে, তা আজ দেশের সকল বিজেপি সমর্থকের মুখে দেখছি। আমিও তাঁদের খুশিতে সামিল।’ তাঁর কথায়, ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র, শ্রীঅরবিন্দ এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের স্বপ্নের সশক্ত বাংলা গড়ার পথে আজ জনতা জনার্দন শিলমোহর দিল। এদিন ভাষণে মোদী বিশেষভাবে স্মরণ করেন জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে। আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আত্মা আজ শান্তি পেলেন। তিনি যে সমৃদ্ধ বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা কয়েক দশক ধরে পূরণ হওয়ার অপেক্ষায় ছিল। আজ বাংলার জনতা আমাদের কার্যকর্তাদের সেই সুযোগ দিয়েছেন।’ রাজ্যে পালাবদল নিশ্চিত হতেই পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে তৎপরতা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। মঙ্গলবারই বিধানসভার চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করবে নির্বাচন কমিশন। এরপর বুধবার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ কুমার আগরওয়াল এবং কমিশনের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি এস জোশী রাজভবনে গিয়ে রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করবেন। গজেট নোটিফিকেশন জারির পরেই সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হবে। সূত্রের খবর, সোমবার রাতেই বঙ্গ বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যকে ফোন করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। দীর্ঘক্ষণ দু’জনের মধ্যে শলা-পরামর্শ চলে। নবনির্বাচিত বিধায়কদের নিয়ে দ্রুত বৈঠকে বসবে দল, সেখানেই চূড়ান্ত হবে পরিষদীয় দলের নেতার নাম অর্থাৎ কে বসবেন রাইটার্সের মসনদে। নির্বাচনী প্রচারে বিজেপিকে বারবার ‘অবাঙালি’ বা ‘বহিরাগত’ বলে আক্রমণ শানিয়েছিল বিদায়ী শাসকদল। এমনকি বিজেপি ক্ষমতায় এলে মাছ খাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে— এমন প্রচারও শোনা গিয়েছিল। রাজনৈতিক মহলের মতে, সেই তকমা ঝেড়ে ফেলতেই এদিন ধুতি-পাঞ্জাবি পরে নিজেকে ‘ষোলোআনা বাঙালি’ হিসেবে মেলে ধরলেন মোদী। শপথ গ্রহণের দিন হিসেবে রবীন্দ্রজয়ন্তীকে বেছে নেওয়াও সেই সাংস্কৃতিক কৌশলেরই অঙ্গ। মোদী এদিন বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ যেমন ভয়মুক্ত মন এবং পরিবেশ চেয়েছিলেন, বিজেপির শাসনে বাংলায় সেই পরিবেশ তৈরি হবে।’ তবে জয়ের আনন্দে আত্মহারা না হয়ে সংযমের বার্তাও দিয়েছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘বদলা নয়, বদলের কথা বলতে হবে। কে ভোট দিয়েছে, কে ভোট দেয়নি, তা ভুলে বাংলার জন্য কাজ করতে হবে।’ বাংলায় দীর্ঘদিন ধরে চলা রাজনৈতিক হিংসার প্রসঙ্গ টেনেই মোদী জানান, এবার আর বন্দুকের আওয়াজ নয়, মানুষ নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে গণতন্ত্রকে জয়ী করেছেন। বাংলার ৯৩ শতাংশ ভোটদানকে তিনি ‘ঐতিহাসিক’ বলে উল্লেখ করেন। প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই রাজ্যে ‘আয়ুষ্মান ভারত’ প্রকল্প চালু করার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পাশাপাশি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলার পবিত্র ভূমিতে আজ এক নতুন সূর্যোদয় হলো। বাংলার মানুষ তোষণ এবং ভয়ের রাজনীতিকে ছুঁড়ে ফেলেছে।’ এদিন মঞ্চে মোদী ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিহার ও ওড়িশার পর বাংলা জয়ের মাধ্যমে পূর্ব ভারতে গেরুয়া আধিপত্য এখন নিশ্ছিদ্র।