নয়া জামানা ডেস্ক : যে মাটি থেকে একদিন টাটারা বিদায় নিয়েছিল, কুড়ি বছর পর সেই সিঙ্গুরকেই শিল্পায়নের নতুন গন্তব্য হিসেবে সাজিয়ে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বুধবার সিঙ্গুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে তিনি সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়লেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দিকে। মোদীর সফরের দশ দিনের মাথায় পাল্টা সভায় মমতার ঘোষণা, একটি শিল্প গড়ে উঠেছে, অন্যটি শীঘ্রই হবে। ‘কৃষিও চলবে, শিল্পও চলবে’ । এই চিরকালীন মন্ত্রকে ঢাল করে তিনি এদিন বুঝিয়ে দিলেন, জোর করে জমি কেড়ে নয়, মানুষের সম্মতি নিয়েই বিকল্প পথে বাংলা হাঁটছে। এদিন শুধু শিল্প নয়, ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান থেকে শুরু করে ধ্রুপদী ভাষার মর্যাদা । প্রতিটি ইস্যুতেই কেন্দ্রকে কাঠগড়ায় তোলেন মুখ্যমন্ত্রী।
বুধবার সিঙ্গুরের মঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল লক্ষ্যই ছিল প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যের জবাব দেওয়া। রতনপুরের যে ময়দানে দাঁড়িয়ে মোদী টাটাদের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন, ঠিক সেখান থেকেই মমতা পাল্টা উন্নয়ন-মডেল পেশ করেন। তাঁর কথায়, ‘৮ একর জমির উপর ৯ কোটি ২০ লক্ষ টাকা খরচ করে সিঙ্গুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক গড়়ে তোলা হয়েছে। ২৮টি প্লটের মধ্যে বরাদ্দ হয়ে গিয়েছে ২৫টি।’ এর মাধ্যমেই তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে সিঙ্গুর আর বন্ধ কারখানার স্মৃতি নয়, বরং নতুন কর্মসংস্থানের দিশারি। এখানেই থামেননি মুখ্যমন্ত্রী। এরপর ৭৭ একর জমিতে গড়ে ওঠা বেসরকারি শিল্প উদ্যানের কথা ঘোষণা করে তিনি জানান, সেখানে অ্যামাজন এবং ফ্লিপকার্টের মতো বহুজাতিক সংস্থা বড় ওয়্যারহাউস তৈরি করছে। মমতার হুঙ্কার, ‘আমরা মুখে বলি না। আমরা কাজে করি।’
সিঙ্গুরের এই সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী এদিন কেন্দ্রের বিরুদ্ধে বঞ্চনার অভিযোগে ফের সরব হন। তাঁর দাবি, একশো দিনের কাজ থেকে শুরু করে আবাসন যোজনার টাকা দিল্লি আটকে রেখেছে। সেই আবহেই তিনি ঘোষণা করেন যে, ২০ লক্ষ মানুষের অ্যাকাউন্টে আবাস যোজনার প্রথম কিস্তির টাকা সরাসরি পাঠিয়ে দিয়েছে রাজ্য সরকার। ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান নিয়ে দীর্ঘ টালবাহানার অবসান ঘটিয়ে এদিন তিনি সেই প্রকল্পেরও আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। ১৫০০ কোটি টাকার এই প্রকল্পের সিংহভাগ খরচ রাজ্যই বহন করছে জানিয়ে তাঁর কটাক্ষ, ‘ওরা বানিয়ে বোকা আমরা দিলাম টাকা।’ মমতার দাবি, কেন্দ্র সরকার কেবল মিথ্যে প্রতিশ্রুতি বা ‘জুমলা’ দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।
বাংলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সিঙ্গুর বরাবরই স্পর্শকাতর। আন্দোলনের সেই ২৬ দিনের অনশন এবং জমি ফেরানোর লড়াইয়ের কথা এদিন আবার স্মরণ করিয়ে দেন মমতা। আবেগের সুরে তিনি বলেন, ‘সিঙ্গুরের জমি ফিরিয়ে না-দিলে আমি নিজেকে বাজি রেখেছিলাম। মরার জন্য তৈরি ছিলাম।’ তবে বিরোধীরা মুখ্যমন্ত্রীর এই শিল্প-দাবি নিয়ে কটাক্ষ করতে ছাড়েননি। বিজেপি এবং সিপিএম নেতৃত্বের মতে, ওয়্যারহাউস বা অ্যাগ্রো পার্ক প্রকৃত অর্থে বড় শিল্প নয়। বিজেপি মুখপাত্র তরুণজ্যোতি তিওয়ারি প্রশ্ন তোলেন, এই পার্কে আসলে কী উৎপাদন হচ্ছে তার খতিয়ান দেওয়া হোক। বাম নেতাদের একাংশ আবার মমতার চপ-শিল্প বা কাশফুলের বালিশ তৈরির তত্ত্ব তুলে বিদ্রুপ করেন।
শিল্পের পাশাপাশি ধ্রুপদী ভাষার মর্যাদা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দাবিকেও সরাসরি ‘মিথ্যে’ বলে দেগে দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মোদী দাবি করেছিলেন যে তাঁর সরকারের আমলেই বাংলা ধ্রুপদী ভাষার স্বীকৃতি পেয়েছে। এর জবাবে মমতা বলেন, ‘‘একজন মানুষ এখানে এসে বলে গেলেন। আমি তাঁর চেয়ারকে গালাগালি দিচ্ছি না। তিনি বললেন, ধ্রুপদী ভাষাকে তাঁরাই স্বীকৃতি দিয়েছেন। সব ঝুট হ্যায় ঝুট।’’ মমতার দাবি, রাজ্য সরকার পাঁচ বস্তা গবেষণালব্ধ বই দিল্লিতে পাঠিয়েছিল এবং নিরন্তর চাপ তৈরির ফলেই কেন্দ্র এই মর্যাদা দিতে বাধ্য হয়েছে। উত্তরপ্রদেশ, বিহার বা মধ্যপ্রদেশে বাংলায় কথা বললে বাঙালির ওপর হামলা হয় অভিযোগ তুলে তিনি বিজেপিকে ‘বাঙালি বিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
বক্তৃতার এক পর্যায়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এসআইআর বা কেন্দ্রের শুনানির নামে সাধারণ মহিলাদের হেনস্থার অভিযোগ তোলেন। বিবাহিত মহিলাদের পদবি বদল নিয়ে প্রশ্নের প্রসঙ্গ টেনে সরাসরি মোদী ও শাহকে আক্রমণ করে তিনি বলেন, তাঁদের স্ত্রীদের কি বিয়ের পর ঠিকানা বা পদবি বদল হয়নি? এই পুরো বিষয়টিকে তিনি ‘মহিলা-বিরোধী ষড়যন্ত্র’ বলে তোপ দাগেন। নিজেকে ‘ঠান্ডা শীতল বাতাস’-এর সঙ্গে তুলনা করে মুখ্যমন্ত্রী হুঁশিয়ারি দেন যে, তাঁকে আঘাত করলে তিনি ‘টর্নেডো, তুফান বা কালবৈশাখী’ হয়ে পাল্টা প্রত্যাঘাত করবেন। আগামী ২ ফেব্রুয়ারি দিল্লিতে জাতীয় নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের কথা রয়েছে, যেখানে তিনি এই হেনস্থার তথ্যপ্রমাণ পেশ করবেন বলে জানান।
এদিন সিঙ্গুরের সভায় উপচে পড়া ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। তৃণমূলের দাবি, মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর আস্থা দেখাতে এসেছেন। অন্যদিকে বিরোধীদের দাবি, প্রশাসনিক চাপ দিয়ে এই ভিড় জমানো হয়েছে। সভা শেষে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের কাজের অগ্রগতি এবং মানুষের অ্যাকাউন্টে সরাসরি টাকা পৌঁছে দেওয়ার মধ্য দিয়ে মমতা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনের আগে তিনি কেবল প্রতিশ্রুতির লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নন। জমি আন্দোলনের সিঙ্গুর যে আজ আধুনিক শিল্প ও কৃষির মেলবন্ধনের উদাহরণ হতে চলেছে, সেই আত্মবিশ্বাসই বুধবারের ৪০ মিনিটের বক্তৃতায় ফুটে উঠেছে। ছবি— সংগৃহিত ।