ব্রেকিং
[pj-news-ticker]
  • Home /
  • ভ্রমন /
  • মেঘ পাহাড়ের বাইরে অন্য এক হিমালয়

মেঘ পাহাড়ের বাইরে অন্য এক হিমালয়

লিখছেন সুস্মিতা মজুমদার   পাহাড় মানেই শুধু সবুজ উপত্যকা,মেঘে ঢাকা চূড়া কিংবা ঝরনার শব্দ এমন ধারণা লাদাখে পৌঁছনোর পর বদলে যেতে বাধ্য।এখানে পাহাড়ের রং অন্যরকম, আকাশ অন্যরকম, বাতাসের গন্ধও যেন আলাদা। কোথাও ধূসর পাথুরে পাহাড়ের সারি, কোথাও মাটি ছুঁয়ে বয়ে....

মেঘ পাহাড়ের বাইরে অন্য এক হিমালয়

লিখছেন সুস্মিতা মজুমদার   পাহাড় মানেই শুধু সবুজ উপত্যকা,মেঘে ঢাকা চূড়া কিংবা ঝরনার শব্দ এমন ধারণা....

Facebook
Twitter
LinkedIn
Email
WhatsApp
X
Threads
Telegram

আরও পড়ুন


লিখছেন সুস্মিতা মজুমদার

 

পাহাড় মানেই শুধু সবুজ উপত্যকা,মেঘে ঢাকা চূড়া কিংবা ঝরনার শব্দ এমন ধারণা লাদাখে পৌঁছনোর পর বদলে যেতে বাধ্য।এখানে পাহাড়ের রং অন্যরকম, আকাশ অন্যরকম, বাতাসের গন্ধও যেন আলাদা। কোথাও ধূসর পাথুরে পাহাড়ের সারি, কোথাও মাটি ছুঁয়ে বয়ে চলা নীল নদী, আবার কোথাও চোখের সামনে বিস্তৃত নীল হ্রদ। তারই সঙ্গে বৌদ্ধ মঠ, প্রার্থনার পতাকা, প্রাচীন সংস্কৃতি এবং রোমাঞ্চকর পাহাড়ি পথ সব মিলিয়ে লাদাখ যেন ভারতের মানচিত্রের মধ্যেই এক সম্পূর্ণ ভিন্ন পৃথিবী।
সিকিম বা দার্জিলিংয়ের পাহাড়ের সঙ্গে লাদাখের তুলনা করলে সবচেয়ে আগে যে পার্থক্য চোখে পড়ে,তা হল প্রকৃতির রূপ।পূর্ব হিমালয়ের সবুজ পাহাড়ের বদলে লাদাখে দেখা যায় শুষ্ক, রুক্ষ অথচ অপূর্ব সুন্দর পর্বতভূমি। সেপ্টেম্বরের শেষভাগে বর্ষার প্রভাব তুলনামূলক কম থাকায় লাদাখ ভ্রমণের জন্য সময়টি অনেকের কাছেই আকর্ষণীয়। দিনের আলোয় নীল আকাশ আর দূরের তুষারাবৃত শৃঙ্গ, সন্ধ্যার পর হিমেল ঠান্ডা এই বৈপরীত্যই লাদাখ ভ্রমণের অন্যতম বিশেষত্ব।

 

লে-লাদাখের দরজা

লাদাখ ভ্রমণের শুরু সাধারণত লে শহর থেকে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১১,৫০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই শহরকে প্রথম দেখায় শান্ত মনে হলেও এর চারপাশে রয়েছে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান। তবে লে পৌঁছেই ঘোরাঘুরি শুরু করা উচিত নয়। এত উচ্চতায় শরীরকে মানিয়ে নেওয়ার জন্য অন্তত প্রথম দিনটি বিশ্রামে কাটানো জরুরি।

লে শহরের অন্যতম আকর্ষণ শানতি স্তূপ। পাহাড়ের মাথায় সাদা রঙের এই স্তূপ থেকে লে শহর এবং আশপাশের পর্বতশ্রেণির অসাধারণ দৃশ্য দেখা যায়। সূর্যাস্তের সময় এখানকার পরিবেশ আরও সুন্দর হয়ে ওঠে। কাছেই রয়েছে লে প্যালেস—পুরনো লাদাখি স্থাপত্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। শহরের বাজারে হাঁটতে হাঁটতে স্থানীয় খাবার, পোশাক, হস্তশিল্প এবং নানা ধরনের স্মারক সামগ্রীও সংগ্রহ করা যায়।

তবে লে-র আসল সৌন্দর্য শহরের বাইরে। পরবর্তী কয়েক দিনে শুরু হবে সেই বহু প্রতীক্ষিত পাহাড়ি যাত্রা।

নুব্রা উপত্যকা-পাহাড়ের বুকের মরুভূমি

লে থেকে নুব্রার পথ লাদাখ ভ্রমণের অন্যতম রোমাঞ্চকর অংশ। এই পথে রয়েছে খারদুংলা। একসময় বিশ্বের অন্যতম উচ্চ মোটরযোগ্য গিরিপথ হিসেবে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হলেও এর উচ্চতা নিয়ে বিভিন্ন সরকারি ও পর্যটন-তথ্যে ভিন্নতা রয়েছে। তাই সংখ্যার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল এটি লাদাখের অন্যতম পরিচিত উচ্চ গিরিপথ এবং এখানকার আবহাওয়া দ্রুত বদলে যেতে পারে।

খারদুংলা পেরিয়ে দৃশ্যপট ধীরে ধীরে বদলে যায়। সামনে খুলে যায় নুব্রা উপত্যকা। শুষ্ক পাহাড়ের মাঝখানে সবুজের রেখা, নদী এবং বিস্তৃত বালুময় এলাকা নুব্রার বৈশিষ্ট্য এখানেই।

হুন্দর নুব্রার অন্যতম জনপ্রিয় এলাকা। এখানকার বালিয়াড়িতে দেখা যায় দ্বিকুঁজওয়ালা ব্যাকট্রিয়ান উট। মরুভূমির মতো পরিবেশের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল পাহাড় এবং নীল আকাশ দৃশ্যটি যে কোনও পর্যটকের ক্যামেরায় ধরা পড়বেই।

নুব্রায় শুধু প্রকৃতি নয়, সংস্কৃতিও গুরুত্বপূর্ণ। ডিসকিট মঠ থেকে উপত্যকার বিস্তীর্ণ অংশ দেখা যায়। মঠের বিশাল বুদ্ধমূর্তিও পর্যটকদের আকর্ষণ করে। সকাল বা বিকেলের নরম আলোয় এখানকার পাহাড়ের রং আরও বদলে যায়।

প্যাংগং-নীলের অন্য নাম

লাদাখ ভ্রমণের সঙ্গে প্যাংগং লেকের নাম প্রায় অবিচ্ছেদ্য। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৪ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই বিশাল হ্রদের সৌন্দর্য কোনও ছবিতে পুরোপুরি বোঝানো সম্ভব নয়। নীল আকাশের নিচে নীল জলের বিস্তার, চারদিকে বাদামি-ধূসর পাহাড় প্রকৃতির রঙের এমন বৈপরীত্যই প্যাংগংকে আলাদা করে তোলে।

সূর্যের অবস্থান বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে হ্রদের জলের রংও বদলে যেতে দেখা যায়। কখনও গাঢ় নীল, কখনও হালকা নীল, আবার কখনও সবুজাভ আভা। হ্রদের পাড়ে দাঁড়িয়ে দূরের পাহাড়ের দিকে তাকালে মনে হয়, সভ্যতার কোলাহল যেন বহু দূরে চলে গেছে।

তবে প্যাংগংয়ের সৌন্দর্যের পাশাপাশি এখানকার উচ্চতা এবং আবহাওয়াকেও গুরুত্ব দিতে হবে। সেপ্টেম্বরের শেষভাগে রাতের তাপমাত্রা বেশ কমে যেতে পারে।তাই পর্যাপ্ত উষ্ণ পোশাক,পানীয় জল এবং প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত ওষুধ সঙ্গে রাখা উচিত।

মঠের দেশে অন্যরকম সকাল

লাদাখ শুধু পাহাড় আর হ্রদের স্থান নয়, এটি বৌদ্ধ সংস্কৃতিরও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। থিকসে, হেমিস, শে, স্পিতুক একাধিক মঠ লাদাখের ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।

থিকসে মঠকে দূর থেকে দেখলে মনে হবে পাহাড়ের গায়ে সাদা রঙের ছোট ছোট ঘর সাজানো হয়েছে। সকালে প্রার্থনার সময় মঠের পরিবেশে এক ধরনের নীরবতা ও আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি হয়। পর্যটক হিসেবে সেই পরিবেশকে সম্মান করা এবং স্থানীয় নিয়ম মেনে চলা জরুরি।

হেমিস মঠও লাদাখের অন্যতম পরিচিত ধর্মীয় কেন্দ্র। মঠের স্থাপত্য, প্রাচীন শিল্পকর্ম এবং বৌদ্ধ ঐতিহ্য পর্যটকদের আকর্ষণ করে। পাহাড়ের সৌন্দর্যের সঙ্গে এই সংস্কৃতির যোগ লাদাখ ভ্রমণকে নিছক পর্যটন থেকে অনেক বেশি সমৃদ্ধ করে।

সেপ্টেম্বর কেন আকর্ষণীয়?

লাদাখের পর্যটন মরশুমের একট গুরুত্বপূর্ণ সময় হল গ্রীষ্ম থেকে শরতের শুরু পর্যন্ত। সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে বর্ষার প্রভাব ভারতের অন্যান্য অনেক পাহাড়ি অঞ্চলের তুলনায় কম থাকায় রাস্তা ও আকাশের পরিস্থিতি অনেক সময় ভ্রমণের পক্ষে সুবিধাজনক হয়।

এই সময় দিনের বেলা রোদ থাকলেও বাতাসে শীতের আমেজ শুরু হয়। আকাশ পরিষ্কার থাকলে দূরের পাহাড়ের দৃশ্য অসাধারণ লাগে। ফটোগ্রাফির জন্যও এই সময়টি আকর্ষণীয়।

তবে ‘সেপ্টেম্বর মানেই সবসময় পরিষ্কার আকাশ’এমন নিশ্চয়তা নেই।পাহাড়ি আবহাওয়া দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।বিশেষ করে উচ্চ গিরিপথে তুষারপাত, বৃষ্টি বা রাস্তার সাময়িক সমস্যার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই রওনা হওয়ার আগে আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং স্থানীয় প্রশাসনের রাস্তার পরিস্থিতি অবশ্যই দেখে নেওয়া উচিত।

পাঁচ দিনের লাদাখ-কীভাবে সাজাবেন?

সময় যদি মাত্র পাঁচ দিন হয়, তাহলে খুব বেশি জায়গা একসঙ্গে ঢোকানোর চেষ্টা না করাই ভালো। কলকাতা থেকে লাদাখে যাওয়া-আসার সময় এবং উচ্চতার সঙ্গে শরীরকে মানিয়ে নেওয়ার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।

প্রথম দিন কলকাতা থেকে বিমানপথে লে পৌঁছে বিশ্রাম নেওয়া যেতে পারে। দ্বিতীয় দিন লে শহর ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা যায়। তৃতীয় দিন লে থেকে খারদুংলা হয়ে নুব্রা উপত্যকা। চতুর্থ দিন নুব্রা থেকে প্যাংগং। পঞ্চম দিন প্যাংগং থেকে লে ফিরে বিমান ধরে কলকাতার পথে রওনা হওয়া যায়।

তবে এই সূচি যথেষ্ট ব্যস্ত। প্রথমবার লাদাখ গেলে আরও নিরাপদ পরিকল্পনা হল অন্তত এক দিন অতিরিক্ত রাখা। কারণ উচ্চতার কারণে কারও কারও মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, দুর্বলতা বা শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা হতে পারে।

খরচ কত?

কলকাতা থেকে লাদাখের পাঁচ দিনের সফরের খরচ নির্ভর করবে বিমানের ভাড়া, হোটেলের মান, গাড়ির ধরন এবং কতজন একসঙ্গে যাচ্ছেন তার ওপর।
দুজনের জন্য মাঝারি মানের হোটেল ধরলে প্রতি রাতে আনুমানিক ২,৫০০ থেকে ৫,০০০ টাকা বা তার বেশি লাগতে পারে। লে-নুব্রা-প্যাংগং রুটে গাড়ির খরচও গুরুত্বপূর্ণ। ভাগ করে গাড়ি নিলে খরচ কমতে পারে। খাবার, পারমিট, স্থানীয় দর্শনীয় স্থান এবং অন্যান্য খরচ যোগ হবে।

কলকাতা থেকে বিমানভাড়া সবচেয়ে বড় পরিবর্তনশীল খরচ। তাই যাত্রার তারিখ কয়েক সপ্তাহ আগে নির্দিষ্ট করে টিকিট কাটলে বাজেট নিয়ন্ত্রণে রাখার সম্ভাবনা থাকে। পাঁচ দিনের জন্য দুজনের মোট বাজেট আনুমানিক ৫৫ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা ধরে প্রাথমিক পরিকল্পনা করা যেতে পারে, বিমানভাড়া ও গাড়ির ভাড়ার পরিবর্তনের কারণে প্রকৃত খরচ কম-বেশি হতে পারে।

কী কী সঙ্গে নেবেন?

লাদাখে সেপ্টেম্বরের শেষভাগে দিনের রোদ এবং রাতের ঠান্ডার মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য থাকতে পারে।তাই স্তর করে পরার মতো পোশাক সবচেয়ে সুবিধাজনক। উষ্ণ জ্যাকেট, থার্মাল পোশাক, গ্লাভস, টুপি, ভালো জুতো এবং সানগ্লাস রাখা উচিত।

উচ্চতার কারণে শরীরে পানিশূন্যতা হতে পারে। তাই নিয়মিত জল পান করা জরুরি। প্রথম এক-দুই দিন অতিরিক্ত দৌড়ঝাঁপ, অ্যালকোহল বা শরীরকে চাপ দেয় এমন কাজ এড়িয়ে চলাই ভালো।
যাঁদের আগে থেকেই কোনও শারীরিক সমস্যা রয়েছে তাঁরা যাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে ভালো।

লাদাখ কেন আলাদা?

লাদাখের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ কোনও একটি জায়গা নয়। আসল আকর্ষণ হল যাত্রাপথ। একদিকে খাড়া পাহাড়, অন্যদিকে গভীর উপত্যকা, কোথাও নদী পাহাড় কেটে এগিয়ে চলেছে কোথাও আবার কয়েক কিলোমিটার জুড়ে শুধু পাথুরে প্রান্তর। তারপর হঠাৎ একটি ছোট্ট গ্রাম, মঠের ছাদে উড়ছে প্রার্থনার পতাকা আর দূরে তুষারঢাকা শৃঙ্গ।

এই বৈপরীত্যই লাদাখকে অন্যরকম করে তোলে।

সিকিমের সবুজ, দার্জিলিংয়ের মেঘ কিংবা ডুয়ার্সের জঙ্গলের সঙ্গে লাদাখের কোনও মিল নেই। কিন্তু পাহাড়প্রেমী মানুষের কাছে সেই অমিলটাই এর সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। এখানে প্রকৃতি কোমল নয়, বরং কঠিন,কিন্তু সেই কঠিন প্রকৃতির মধ্যেই রয়েছে এক গভীর সৌন্দর্য।

সেপ্টেম্বরের শেষভাগ তাই লাদাখ দেখার জন্য আকর্ষণীয় একটি সময় হতে পারে। তবে পাঁচ দিনের সফরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল অতিরিক্ত জায়গা দেখার লোভ না করে শরীর, আবহাওয়া এবং রাস্তার পরিস্থিতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া।লে থেকে নুব্রা, খারদুংলা পেরিয়ে প্যাংগংয়ের নীল জলের সামনে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা একবার হলে সেই ভ্রমণ অনেকদিন মনে থেকে যায়।
লাদাখে গিয়ে শেষ পর্যন্ত হয়তো মনে হবে, পাহাড় শুধু সবুজ হয় না। কখনও পাহাড় ধূসর, কখনও সোনালি, কখনও তুষারের মতো সাদা আর কখনও সেই পাহাড়ের বুকেই লুকিয়ে থাকে এমন এক নীল আকাশ যার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘক্ষণ নীরব হয়ে থাকতে ইচ্ছে করে।


পাহাড় সমস্যার সমাধানে, শাহের ‘বিশেষ কমিটি’

 

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

আজকের খবর