নয়া জামানা : পুঁথিগত বিদ্যা নেই, নেই কোনও প্রশিক্ষণ কিংবা আধুনিক মোটরবোট। তা সত্ত্বেও ২৫ বছর বয়সি শ্রবণ কুমার এমন এক নজির গড়লেন, যা ছাপিয়ে গেল বহু প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারীর কীর্তিকেও। বন্যা কবলিত অসমে অন্তত দুই হাজার মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছেন তিনি, শুধুমাত্র একটি ছোট্ট কাঠের নৌকা আর দুর্গতদের পাশে দাঁড়ানোর জেদকে সম্বল করে।
দশম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা এগোয়নি শ্রবণের। সংসারের হাল ধরতে অল্প বয়সেই কাজে নেমে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। বিহুবরের বাসিন্দা শ্রবণ নদীতে ভেসে আসা কাঠ কুড়িয়ে বিক্রি করেই জীবিকা নির্বাহ করেন, এমনকী নিজের বাড়ির উনুনও জ্বলে সেই কাঠেই। এক দিন কাঠ কুড়াতে গিয়েই তিনি লক্ষ করেন, নদী স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি ফুঁসছে, ভেসে আসছে বড় বড় গাছের কাণ্ড। তখনই তিনি বুঝে যান, বিপদ ঘনিয়ে আসছে।
ততক্ষণে বন্যার জল ঢুকে পড়েছিল শ্রবণের নিজের বাড়িতেও। মা ও ভাইয়ের সাহায্যে জরুরি জিনিসপত্র উঁচু জায়গায় সরিয়ে ফেলেন তিনি। চাইলে নিজেও নিরাপদ আশ্রয়ে বসে থাকতে পারতেন, কিন্তু সেই পথে না হেঁটে অন্যদের সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নেন শ্রবণ।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরই আর দেরি করেননি তিনি। কাঠের ছোট্ট নৌকা ‘টুলুঙ্গা নাও’-তে চেপে বন্ধুদের নিয়ে বেরিয়ে পড়েন উদ্ধারকাজে। এমন সব বিপজ্জনক এলাকায় তিনি পৌঁছে যান, যেখানে যেতে ইতস্তত করছিলেন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মাঝিরাও। সকাল ১০টা থেকে শুরু করে সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করেন শ্রবণ। বয়স্ক মানুষ, অসুস্থ ও অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের নৌকায় তুলে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেন তিনি। জলের প্রবল স্রোতের মধ্যে নৌকা চালানো মোটেই সহজ কাজ ছিল না, তবুও থেমে থাকেননি তিনি ও তাঁর বন্ধুরা। পাঁচটি গ্রাম থেকে প্রায় দুই হাজার মানুষকে উদ্ধার করেন তাঁরা।
এই প্রসঙ্গে শ্রবণ জানিয়েছেন, নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে বাড়িতে বসে থাকলে বহু মানুষকে বাঁচানোর মতো কেউ থাকত না।
সাম্প্রতিক এই বন্যায় বিপর্যস্ত হয়েছে অসমের সাতটি জেলা। প্রায় দুই লক্ষ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। এখনও পর্যন্ত ৮২ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে, আর ভেসে গিয়েছে অন্তত সাড়ে তিনশো গ্রাম। প্রশাসনের পক্ষ থেকে চুয়াল্লিশটি ত্রাণ শিবির পরিচালনা করা হচ্ছে, যেখানে আশ্রয় নিয়েছেন প্রায় ১২ হাজার ৯৯৪ জন। এছাড়া ছাব্বিশটি বিতরণ কেন্দ্রের মাধ্যমে আরও পাঁচ হাজার ৩৮৪ জনকে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।