স্বরূপ সাহা,নয়া জামানা,মালদা: মালদা মানেই এতদিন আমের জেলা। এবার সেই পরিচয়ে নতুন পালক যোগ করল জেলার আর এক ঐতিহ্যবাহী কৃষিজ পণ্য—আশাপুর বেগুন। বহু বছরের ঐতিহ্য, স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য এবং নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের স্বীকৃতি হিসেবে মালদার আশাপুর বেগুন পেয়েছে জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন ট্যাগ। এর ফলে শুধু এই বিশেষ জাতের বেগুনের পরিচিতিই বাড়বে না, ভবিষ্যতে কৃষকদের ন্যায্য দাম, ব্র্যান্ডিং এবং আইনি সুরক্ষার নতুন দিগন্তও খুলে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।মালদা জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, জিআই নম্বর ৯৯২-এ ক্লাস-৩১ -এর অধীনে আশাপুর বেগুনের নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে। গত ২৭ মার্চ, ২০২৬ চেন্নাই থেকে জিআই রেজিস্ট্রি থেকে শংসাপত্র জারি করা হয়েছে। এই জিআই-এর নিবন্ধিত স্বত্বাধিকারী আশাপুর ফ্রুটস অ্যান্ড ভেজিটেবল গ্রোয়ার্স ওয়েলফেয়ার সোসাইটি। জেলা উদ্যানপালন দপ্তর ও কলকাতার ওয়েস্ট বেঙ্গল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ জুরিডিক্যাল সায়েন্সেস-এর আইপিআর চেয়ারের সহযোগিতায় দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর এই স্বীকৃতি মিলেছে।চাঁচল মহকুমার আশাপুর এলাকার নামে পরিচিত এই বিশেষ জাতের বেগুন বহু বছর ধরে চাষ হয়ে আসছে। হালকা সবুজ রঙের গায়ে গাঢ় সবুজ ডোরা, তুলনামূলক বড় আকার, কম বিচি, নরম শাঁস এবং অনন্য স্বাদের জন্য এই বেগুন সাধারণ জাতের বেগুন থেকে আলাদা। প্রতিটি বেগুনের ওজন সাধারণত ২০০ থেকে ৪০০ গ্রাম। বিশেষ করে বেগুন পোড়া (ভর্তা) তৈরিতে এই জাতের বেগুনের কদর সবচেয়ে বেশি। মালদার পাশাপাশি রাজ্যের বিভিন্ন জেলা এবং পার্শ্ববর্তী রাজ্যেও এর চাহিদা রয়েছে।
ডেপুটি ডিরেক্টর (উদ্যানপালন), মালদা সামন্ত লায়েক জানান, জুন-জুলাই মাসে এই বেগুনের চারা রোপণ করা হয় এবং শীতকাল থেকেই ফলন শুরু হয়। বর্তমানে মালদা জেলায় প্রায় ২০০ হেক্টর জমিতে আশাপুর বেগুনের চাষ হয়। প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার কৃষক এই চাষের সঙ্গে যুক্ত এবং বছরে প্রায় ২৬ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদন হয়। মূলত চাঁচল-১ ও চাঁচল-২ ব্লকের কয়েকটি গ্রাম পঞ্চায়েতে এই বেগুনের চাষ সীমাবদ্ধ।তিনি আরও বলেন, জিআই অনেকটা পেটেন্টের মতো স্বীকৃতি। এটি কোনও একটি অঞ্চলের বিশেষ পণ্যের স্বাতন্ত্র্যকে আইনি স্বীকৃতি দেয়। এই স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য বেগুনটির ঐতিহাসিক পটভূমি, ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, স্বতন্ত্র গুণাবলি এবং বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ জমা দিতে হয়েছে। ভবিষ্যতে এই জাতের বেগুন নিয়ে গবেষণা বা নতুন জাত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট নিয়ম ও অনুমতির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।জেলা প্রশাসনের দাবি, জিআই ট্যাগ পাওয়ায় আশাপুর বেগুনের ব্র্যান্ড ভ্যালু আরও বাড়বে। একই সঙ্গে নকল নামে বিক্রি রোধ, কৃষকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং দেশ-বিদেশে বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে। আগামী দিনে আশাপুর বেগুনের ব্র্যান্ডিং, উন্নত প্যাকেজিং, কৃষকদের প্রশিক্ষণ, ফার্মার প্রডিউসার অর্গানাইজেশন শক্তিশালী করা এবং বিভিন্ন কৃষি মেলা ও ক্রেতা-বিক্রেতা বৈঠকে এই পণ্যকে তুলে ধরার পরিকল্পনাও নিয়েছে জেলা প্রশাসন।মালদার কৃষি-ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা আশাপুর বেগুনের এই জিআই স্বীকৃতি শুধু একটি সবজির স্বীকৃতি নয়, বরং জেলার হাজার হাজার কৃষকের পরিশ্রম, ঐতিহ্য ও সম্ভাবনারও সরকারি স্বীকৃতি বলে মনে করছেন কৃষি মহলের একাংশ।