নয়া জামানা ডেস্ক : ইদ মিটতেই পুরোদস্তুর ভোটের ময়দানে নেমে পড়ছে তৃণমূল। রাজ্যের শাসকদলের ২০২৬-এর নির্বাচনী প্রচারের নীল নকশা এখন স্পষ্ট। একদিকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নজর যখন উত্তরবঙ্গে, অন্যদিকে দক্ষিণবঙ্গের মাটি কামড়ে পড়ে থাকার দায়িত্বে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। লক্ষ্য একটাই— এই বিধানসভা নির্বাচনে গড় রক্ষা এবং হারানো জমি পুনরুদ্ধার করা। রবিবার চেতলার কর্মিসভা দিয়েই যার আনুষ্ঠানিক সূচনা করতে চলেছেন খোদ তৃণমূল নেত্রী। রাজনৈতিক মহলের মতে, বিরোধী শিবিরকে ঘিরে কীভাবে প্রচারের দিশা নির্ধারণ হবে, তার ইঙ্গিত মিলতে পারে এই বৈঠক থেকেই।
রবিবার সন্ধ্যায় চেতলার অহীন্দ্র মঞ্চে ভবানীপুর বিধানসভা এলাকার কর্মীদের নিয়ে এক বিশেষ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে প্রার্থী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে উপস্থিত থাকবেন তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সী, দক্ষিণ কলকাতা জেলা তৃণমূলের সভাপতি দেবাশিস কুমার, মেয়র ফিরহাদ হাকিম-সহ ভবানীপুরের সাত জন কাউন্সিলর। মূল লক্ষ্য ‘ঘর’ গোছানো। গত লোকসভা নির্বাচনে ভবানীপুর থেকে তৃণমূল প্রার্থী সাড়ে ৬ হাজার ভোটে এগিয়ে থাকলেও পাঁচটি ওয়ার্ডে এগিয়েছিল বিজেপি। তাই এবার কোনও ঝুঁকি নিতে নারাজ কালীঘাট। বিশেষ করে ভোটার তালিকা থেকে ৪৭ হাজারের বেশি ভোটারের নাম বাদ যাওয়া এবং ১৪ হাজারের বেশি নাম বিবেচনাধীন থাকায় বিএলএ-দের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন মমতা। তৃণমূলের স্লোগান এবার স্পষ্ট— ‘বাংলার উন্নয়ন ঘরে ঘরে, ঘরের মেয়ে ভবানীপুরে’।
আগামী সপ্তাহ থেকেই উত্তরের পথে পা বাড়াবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দলীয় সূত্রে খবর, ২৫ মার্চ কোচবিহার ও আলিপুরদয়ারে জনসভা করার সম্ভাবনা রয়েছে তাঁর। পরের দিন চালসাতেও সভা করার কথা রয়েছে। অর্থাৎ, উত্তরবঙ্গ দিয়েই রাজ্যজুড়ে প্রচারের গতি বাড়াতে চাইছে শাসকদল। বিরোধী শিবিরের মোকাবিলায় কী রণকৌশল হবে, তার প্রাথমিক বার্তা রবিবার চেতলা থেকেই মিলতে পারে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। চেতলার সভায় সব বুথের কর্মীদেরও হাজির থাকতে বলা হয়েছে। তৃণমূল নেতৃত্বের লক্ষ্য, ভোটের আগে মমতার ভবানীপুরে করা কাজের ফিরিস্তি বুথে বুথে পৌঁছে দেওয়া। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, ‘গত ১৫ বছরে বাংলায় উন্নয়নের এক নতুন মডেল তৈরি হয়েছে।’ সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই নতুন প্রতিশ্রুতির প্যাকেজ আনা হয়েছে।
অন্যদিকে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রচার শুরু হচ্ছে মঙ্গলবার থেকে। গত ১২ বছরের রেওয়াজ মেনে নিজের জেলা দক্ষিণ ২৪ পরগনার পাথরপ্রতিমা থেকেই যাত্রা শুরু করছেন তিনি। তবে রাজনৈতিক ভাবে সবথেকে তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে বুধবারের কর্মসূচি। ওই দিন পশ্চিম মেদিনীপুরের দাসপুর, কেশিয়াড়ি ও নারায়ণগড়ে একাধিক সভা সেরে সরাসরি বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর বিধানসভা কেন্দ্র নন্দীগ্রামে পৌঁছবেন অভিষেক। গত ১৫ জানুয়ারি স্বাস্থ্য পরিষেবা শিবির ‘সেবাশ্রয়’-এর সূচনার পর এবার সরাসরি ভোট চাইতে নন্দীগ্রামে পা রাখছেন তৃণমূলের ‘সেনাপতি’।
একুশের ভোটে নন্দীগ্রামে হারের ক্ষত এখনও টাটকা ঘাসফুল শিবিরে। এবার সেই হারের বদলা নিতে ‘শুভেন্দু-মডেল’কেই হাতিয়ার করেছে তৃণমূল। বিজেপির প্রাক্তন ব্লক সভাপতি তথা শুভেন্দু-ঘনিষ্ঠ পবিত্র করকে প্রার্থী করে চমক দিয়েছে তারা। প্রার্থী ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে অভিষেকের হাত ধরেই পবিত্রর ঘরওয়াপসি হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নন্দীগ্রাম ২ নম্বর ব্লকের হিন্দু ভোটে থাবা বসাতেই এই ‘হিন্দু মুখ’কে সামনে আনা হয়েছে। তৃণমূলের বক্তব্য, নন্দীগ্রামে যে তিন নেতার উপর শুভেন্দু ভরসা করতেন, তাঁদের মধ্যে পবিত্র অন্যতম। এর মাধ্যমে তারা দেখাতে চাইছে যে শুভেন্দুর ঘর ভেঙেছে।
সূত্রের খবর, নন্দীগ্রাম-১ ব্লকের সংখ্যালঘুদের ভোট জোড়াফুল চিহ্নেই আসবে বলে নিশ্চিত দল। কিন্তু ২ নম্বর ব্লকের হিন্দু ভোটে চিড় ধরিয়ে বৈতরণী পার হওয়াই অভিষেকের আসল লক্ষ্য। গত বিধানসভায় বয়াল-১ এবং ২ অঞ্চল থেকেই সবচেয়ে বেশি ভোটে এগিয়েছিলেন শুভেন্দু। এবার সেই বয়াল থেকেই এক জন ‘হিন্দু মুখ’কে প্রার্থী করে বিজেপির ভিত নাড়িয়ে দিতে চাইছে শাসকদল। শুক্রবারই ২০২৬-এর নির্বাচনী ইস্তেহার প্রকাশ করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। সেই ইস্তাহারের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘দিদির ১০ প্রতিজ্ঞা’। মহিলা, যুব, কৃষক, সাধারণ পরিবার— প্রায় সব স্তরের মানুষের জন্য একাধিক আর্থিক ও সামাজিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, একদিকে মমতার উত্তরবঙ্গ সফর, অন্যদিকে অভিষেকের দক্ষিণবঙ্গ জুড়ে সভা— দুই দিক থেকেই প্রচারে ঝাঁপাচ্ছে তৃণমূল। নির্বাচনের আগে সংগঠনকে চাঙ্গা করা এবং প্রতিটি বুথে বার্তা পৌঁছে দেওয়াই এখন শাসকদলের মূল লক্ষ্য। সোমবার থেকে রাজ্যে পুরোদমে ‘গড় রক্ষার যুদ্ধ’ শুরু হচ্ছে। একদিকে মমতার উত্তর সফর, অন্যদিকে অভিষেকের দক্ষিণে অভিযান— দুই ফলায় বিঁধেই প্রতিপক্ষকে মাত দিতে মরিয়া জোড়াফুল শিবির। ভবানীপুরে শেষ দফায় ২৯ এপ্রিল ভোট থাকলেও, রবিবারের কর্মিসভা থেকে কীভাবে মাসব্যাপী প্রচার চলবে, তার স্পষ্ট নির্দেশিকা দেবেন মমতা। কলকাতা পুরসভার ৭১ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল সভাপতি বাবুল সিংহ বলেন, ‘দিদির নাম প্রার্থী হিসাবে ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই আমরা ভবানীপুরে ভোটের কাজে নেমে পড়েছি। রবিবার কর্মিসভায় মুখ্যমন্ত্রী আমাদের কী বার্তা দেন, সে দিকেই আমরা তাকিয়ে।’ ফাইল ফটো।
ভাঙড়ে বোমা আতঙ্ক, শওকত মোল্লার গাড়ি লক্ষ্য করে বিস্ফোরণের অভিযোগে তুমুল বিতর্ক