
সুনীল মাইতি
সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক
বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে ক্ষমতা ও প্রভাবের যে বহুমুখী মেরুকরণ ঘটছে; তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিপ্রস্তর হলো ব্রিকস(BRICS)। ব্রাজিল; রাশিয়া; ভারত; চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে গঠিত এই জোট এখন আর কেবল উদীয়মান অর্থনীতির একটি আনুষ্ঠানিক মঞ্চ নয়; বরং এটি বৈশ্বিক দক্ষিণ বা ‘গ্লোবাল- সাউথ’-এর কণ্ঠস্বর হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে নয়া সদস্য রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে ব্রিকসের পরিধি ও ভূ- রাজনৈতিক গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক ব্রিকস সম্মেলনগুলোতে ভারতের সচিন্তিত কৌশল এবং বৈশ্বিক ভারসাম্য রক্ষার অবস্থান আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
ব্রিকস মূলত পশ্চিমা অর্থনীতির একক আধিপত্য বা ‘একমেরু কেন্দ্রিক বিশ্ব-এর বিকল্প হিসেবে গড়ে উঠেছিল। ডলারনির্ভর বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থা; বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের(IMF) নীতি কাঠামোর বাইরে গিয়ে নিজেদের মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক(NDB) -এর মাধ্যমে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ত্বরান্বিত করাই এই জোটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল।
সাম্প্রতিক সম্মেলনগুলোতে ব্রিকস কেবল পাঁচ দেশের অর্থনৈতিক সমঝোতায় সীমাবদ্ধ থাকে নি। এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দেশের অন্তর্ভুক্তি জোটের ভূ-রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি করেছে। পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা; উন্নত বিশ্বের জলবায়ু অর্থায়নের প্রতি শ্রুতি ভঙ্গ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের বঞ্চনার বিরুদ্ধে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর মধ্যে সহমর্মিতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ব্রিকস একটি কার্যকর অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।
ব্রিকসের ক্রমবর্ধমান প্রসারের মুখে ভারতের অবস্থান দেশ সংবেদনশীল এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত একদিকে যেমন ব্রিকসের এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসাবে গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধিত্বমূলক স্বর হতে চায়; অন্যদিকে ভারত কোনো অবস্থাতেই ব্রিকসকে একটি ‘পশ্চিমা- বিরোধী’ বা ‘আমেরিকা- বিরোধী’ জোটে রূপান্তরিত করতে দিতে চায় না।
ভারত বিশ্বাস করে; ব্রিকসের এর মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন; বহুমুখী বাণিজ্যের প্রসার এবং প্রযুক্তি ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা— কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্লকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা নয়। একদিকে ভারত কোয়াড(QUAD); আইটুইউটু টু(I2U2)-র মতো পশ্চিমা ঘেঁষা বা মার্কিন-বান্ধব জোটে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী; অন্যদিকে ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার(SCO) মতো মঞ্চে চীন ও রাশিয়ার সাথে একই টেবিলে বসে আলোচনায় রত। ভারতের এই ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’(Strategic Autonomy ) বা ‘বহু- মেরুভিত্তিক কূটনীতি’ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নয়াদিল্লিকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
ব্রিকস সম্মেলনের একটি অন্যতম প্রধান অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ হলো জোটের ভেতরে চীন ও রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা। ইউক্রেন সংঘাত ও বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার পর রাশিয়া অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবেই অনেকটাই চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে চীন ব্রিকসকে ব্যবহার করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে নিজের বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তার করতে আগ্রহী।
এই পরিস্থিতিতে ভারত জোটের ভেতর একটি নিরপেক্ষ কিন্তু দৃঢ় ভারসাম্যকারী শক্তি(Balancing Force) হিসেবে কাজ করছে। ভারত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে; আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন; কিন্তু তার অর্থ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে দুই খন্ডে বিভক্ত করা নয়। স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের পক্ষে সওয়াল করলেও ভারত কোনো সর্বজনীন ‘ব্রিকস- মুদ্রা’ চালুর বিষয়ে সতর্ক পদক্ষেপ নিয়েছে; যাতে নিজের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ন না হয়।
ভারতের কাছে ব্রিকস হলো উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ তুলে ধরার একটা শক্তিশালী মঞ্চ। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সংস্কার; পরিবেশগত ন্যায়বিচার(Climate Justice); ডিজিটাল পরিকাঠামোর সার্বজনীন সুবিধা এবং খাদ্য ও শক্তি নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার দাবিগুলোতে ভারতের কণ্ঠস্বর সর্বদা সোচ্চার। নয়াদিল্লী ব্রিকসকে কেন্দ্র করে নিজের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি আফ্রিকা; লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে দক্ষিণ- দক্ষিণ সহযোগিতার(South – South cooperation) পথ প্রশস্ত করছে।
ব্রিকসের ভবিষ্যতের রূপরেখা কেবল বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবে না; বরং বিশ্ব রাজনীতির ভারসাম্য রক্ষায় নতুন দিক নির্দেশ করবে। ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো— জোটের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ এড়িয়ে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ ও ভূ- রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন টিকিয়ে রাখা। ভারত যদি ব্রিক্সের মঞ্চ ব্যবহার করে বিশ্বব্যাপী শান্তি; উন্নয়ন এবং গ্লোবাল সাউথের কণ্ঠস্বরকে আরোও সুদৃঢ় করতে পারে; তবেই এই অর্থনৈতিক জোটের প্রকৃত সাফল্য অর্জিত হবে। ভারত আজ কেবল একজন অংশগ্রহণকারী নয়; বরং পরিবর্তনশীল বিশ্ব ব্যবস্থার একজন অন্যতম প্রধান নীতি-নির্ধারক।