নয়া জামানা ডেস্ক : নির্বাচন অবাধ ও শান্তিপূর্ণ করার নামে নাগরিকের ব্যক্তিস্বাধীনতায় যথেচ্ছ হস্তক্ষেপ করা যাবে না। স্রেফ ‘ট্রাবল মেকার’ বা গোলমাল সৃষ্টিকারী তকমা দিয়ে ঢালাও গ্রেফতারির পথে হাঁটা প্রাথমিক ভাবে ভুল। বুধবার এক তাৎপর্যপূর্ণ নির্দেশে কলকাতা হাই কোর্ট সাফ জানিয়ে দিল, নির্বাচন কমিশন যদি এই ধরনের কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, তবে তার উপর স্থগিতাদেশ জারি করা হচ্ছে। প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি পার্থসারথি সেনের ডিভিশন বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদে কমিশনকে ক্ষমতা দেওয়া হলেও তা ‘সীমাহীন’ নয়। দেশের অন্য আইন থাকলে সেই আইন মেনেই কমিশনকে কাজ করতে হবে। আইনের নির্দিষ্ট বিধি মেনেই যা করার করতে হবে। হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ স্পষ্ট করেছে, শুধুমাত্র সন্দেহের বশে কাউকে চিহ্নিত করে জালে তোলা যায় না। আদালতের কড়া মন্তব্য, ‘নাগরিকের স্বাধীনতা শুধুমাত্র আইন অনুযায়ীই সীমিত করা যায়। কেউ যদি অপরাধ করে, পুলিশ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবে। সতর্কতামূলক ভাবে কাউকে আটক করতে হলেও নির্দিষ্ট বিধি মেনেই করতে হবে।’ বেঞ্চ মনে করিয়ে দিয়েছে, আইন যদি কোনও কাজ নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে করার নির্দেশ দেয়, তবে সেই পথই অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। রাজনৈতিক পরিচয় দেখে কাউকে দাগিয়ে দেওয়া বা কলঙ্কিত করার প্রবণতাকেও ভালো চোখে দেখেনি উচ্চ আদালত। মূলত শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের করা একটি মামলার প্রেক্ষিতেই এই রায়। জোড়াফুল শিবিরের আশঙ্কা ছিল, নির্বাচনকে সামনে রেখে তাদের প্রায় ৮০০ কর্মীকে স্রেফ সন্দেহের বশে গ্রেফতার করা হতে পারে। এই অভিযোগ নিয়েই সোমবার আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল তারা। বুধবার তৃণমূলের পক্ষে আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় সওয়াল করেন, ‘কিসের ভিত্তিতে ট্রাবল মেকার বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে? এটা কলঙ্কজনক বিষয়। তাঁদের নাম প্রকাশ্যে আসছে, সংবাদমাধ্যমে বলা হচ্ছে।’ তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, ‘কাউকে গ্রেফতারের অধিকার কমিশনের নেই, তা পুলিশের রয়েছে। একজন ম্যাজিস্ট্রেট গ্রেফতারের নির্দেশ দিতে পারেন। কমিশন কি স্বাধীনতা কাড়তে পারে মানুষের? কোনও গুরুতর অপরাধ হলে পুলিশ গ্রেফতার করবে। কমিশন কি ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব নিতে পারে?’ রাজ্য সরকারের তরফে অ্যাডভোকেট জেনারেল কিশোর দত্ত মামলাকারীদের যুক্তিকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, বর্তমানে রাজ্যে এমন কোনও পরিস্থিতি নেই যে ‘প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন’ বা সতর্কতামূলক আটকের পথে হাঁটতে হবে। কিশোরবাবুর সওয়াল, ‘ট্রাবল মেকার শব্দ কোনও দণ্ডবিধিতে কি ব্যবহৃত হয়েছে? জনপ্রতিনিধিত্ব আইনে কি বলা হয়েছে এই শব্দ? সেখানে এ রকম শব্দের উল্লেখ নেই। অপরাধ হচ্ছে অপরাধ, তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হবে। কিন্তু এই শব্দ আইনের পরিভাষায় নেই।’ তিনি স্পষ্ট জানান, ভারতের অখণ্ডতা বা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি না হলে এভাবে কাউকে আটক করা যায় না। পাল্টা কমিশনের আইনজীবী দাবি করেন, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করানোই তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য। বিহার বা অন্যান্য রাজ্যের উদাহরণ টেনে তিনি জানান, কোনও রাজ্যকে আলাদা নজরে দেখা হয় না। প্রচলিত প্রথা মেনেই পদক্ষেপ করা হচ্ছে। তবে কমিশন হলফনামা দিয়ে বিস্তারিত জানাতে সময় চেয়েছে। আপাতত কমিশনের এই ঢালাও গ্রেফতারির সক্রিয়তায় কড়া লাগাম পরাল আদালত। আইনের ঊর্ধ্বে গিয়ে বা যথাযথ প্রক্রিয়া না মেনে কাউকেই যাতে হেনস্থা হতে না হয়, তা নিশ্চিত করাই ছিল এ দিনের রায়ের মূল নির্যাস। নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করাই যে আদালতের অগ্রাধিকার, উচ্চ আদালতের এই নির্দেশে তা পুনর্প্রতিষ্ঠিত হলো।
তৃণমূল স্তরে বিদ্রোহ রুখতে নতুন আইন , বিধানসভায় পাশ পঞ্চায়েত সংশোধনী বিল