নয়া জামানা, কলকাতা : টানা ২৬ বছর অপরাজেয় থাকার রেকর্ড চূর্ণ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অগাধ আস্থা এবং জেলের অন্ধকার কাটিয়ে ফেরার লড়াই— সবটাই ফিকে হয়ে গেল জনতার রায়ে। ২০১১ সালে যে হাবড়া থেকে ‘পরিবর্তনের’ কারিগর হিসেবে উত্থান হয়েছিল জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের, ১৫ বছর পর সেই হাবড়াতেই মুখ থুবড়ে পড়লেন তিনি। বিজেপি প্রার্থী দেবদাস মণ্ডলের কাছে ২৩ হাজার ৮০০ ভোটে পরাজিত হয়ে প্রাক্তন এই খাদ্যমন্ত্রীর তরী ডুবল সেই ‘পরিবর্তনের’ পাল্টা ঢেউয়ে। গণনার শুরুতে ব্যবধান বাড়ালেও বেলা গড়াতেই শুরু হয় ‘উলটপুরাণ’। শেষ পর্যন্ত বালুর সাম্রাজ্যের পতন নিশ্চিত করে হাবড়া। তৃণমূলের জন্মলগ্ন থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছায়াসঙ্গী হিসেবে পরিচিত জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক ওরফে বালু। ২০০১ সাল থেকে উত্তর ২৪ পরগনার রাজনীতির অবিসংবাদিত নেতা। রেশন দুর্নীতি মামলায় ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইডির হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ার শেষ বলে মনে করেছিলেন অনেকে। কিন্তু বালু বুঝিয়েছিলেন, তিনি পার্থ চট্টোপাধ্যায় নন। ১৪ মাস জেল খাটার পর ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি জামিন পান তিনি। দুর্নীতির দাগ গায়ে মেখেই যখন পার্থকে দল ছেঁটে ফেলেছিল, বালুর ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল উল্টো ছবি। মমতা বার বার তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এমনকি টিকিট পাওয়ার ক্ষেত্রেও দলনেত্রীর ‘আস্থাভাজন’ তকমা কাজে দিয়েছিল তাঁর। যদিও বালুর নিজের পছন্দ ছিল বারাসত আসন, যা তাঁর কাছে ‘সহজ’ মনে হয়েছিল, কিন্তু দল তাঁকে হাবড়াতেই লড়াইয়ের ময়দানে নামায়। জ্যোতিপ্রিয়ের রাজনীতির হাতেখড়ি কংগ্রেসের হাত ধরে। পরে মমতা যখন নতুন দল গড়ছেন, তখন থেকেই তিনি তাঁর অনুগত সৈনিক। জননেতা হওয়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে ২০০১ সালে গাইঘাটা থেকে প্রথম বার বিধায়ক হন। ২০০৬ সালেও সেখানে জয়ী হন। ২০১১ সালে আসনটি সংরক্ষিত হয়ে যাওয়ায় তিনি পা রাখেন হাবড়ায়। বাম দুর্গ ভেঙে সে বার ২৫ হাজার ভোটে জিতেছিলেন। ২০১৬ সালে সেই জয়ের ব্যবধান পৌঁছেছিল ৪৫ হাজারে। তবে ২০২১ সালে বিজেপির ‘ঝড়ে’ কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন। সে বার মাত্র ৩, ৮৪১ ভোটে কোনো রকমে মান রক্ষা হয়েছিল। এবার আর শেষরক্ষা হল না। দেবদাস মণ্ডলের কাছে পর্যুদস্ত হতে হল তিন বারের এই বিধায়ককে। মন্ত্রিত্বের দশ বছরে বালুকে ঘিরে বিতর্কের শেষ ছিল না। খাদ্যমন্ত্রী থাকাকালীন বরুণ বিশ্বাসের খুনের ঘটনায় তাঁর দিকে আঙুল তুলেছিল নিহতের পরিবার। বিরোধীদের মুখে মুখে ঘুরত ‘চালচোর’ শব্দবন্ধটি। তাঁর অস্বাভাবিক সম্পত্তি বৃদ্ধি নিয়ে গুঞ্জন ছিল রাজনৈতিক মহলে। ২০২১ সালে ক্ষমতায় ফেরার পর তাঁকে খাদ্য দফতর থেকে সরিয়ে বন মন্ত্রকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পুরনো দুর্নীতির ভূত তাঁর পিছু ছাড়েনি। রেশন দুর্নীতি মামলার সূত্র ধরেই তাঁকে হাজতবাস করতে হয়। জেলের ভেতরে থাকলেও বালুর গুরুত্ব কমেনি তৃণমূলের অন্দরে। দীর্ঘ দিন তাঁর মন্ত্রিত্ব না সরিয়ে দল বুঝিয়ে দিয়েছিল, বালু এখনও ‘স্পেশাল’। শেষ পর্যন্ত ‘পরিবারের অনুরোধে’ তাঁকে মন্ত্রিত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের মতো ‘একঘরে’ হতে হয়নি তাঁকে। বিধায়ক পদে থেকে বিধানসভায় নিয়মিত যাতায়াত করেছেন। এমনকি বারাসত সাংগঠনিক জেলার কোর কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক করে তাঁর হাতে দেওয়া হয়েছিল সংগঠনের দায়িত্ব। নির্বাচনের টিকিট পাওয়ার লড়াইয়ে মানিক ভট্টাচার্য বা জীবনকৃষ্ণ সাহারা ছিটকে গেলেও মমতা ভরসা রেখেছিলেন বালুর ওপর। এমনকি তাঁর গ্রেফতারিকে ‘ষড়যন্ত্র’ বলে জনসভায় সরব হয়েছিলেন খোদ তৃণমূলনেত্রী। জেলের কালো দাগ মুছে ফেলার জন্য তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্ব যখন সব শক্তি বাজি রেখেছিল, তখন হাবড়ার মানুষ দুর্নীতির অভিযোগকেই বেশি গুরুত্ব দিলেন। ২৬ বছরের দীর্ঘ বিধায়ক জীবনে এই প্রথম পরাজয়ের স্বাদ পেলেন বালু। গণনার রাউন্ড যত এগিয়েছে, তত স্পষ্ট হয়েছে তাঁর পিছিয়ে পড়া। দেবদাস মণ্ডলের কাছে এই হার কার্যত জ্যোতিপ্রিয়ের রাজনৈতিক কেরিয়ারে এক বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন বসিয়ে দিল। রাজনীতির কারবারিদের মতে, শুধু জয়-পরাজয় নয়, এই নির্বাচন ছিল বালুর গ্রহণযোগ্যতার পরীক্ষা। যে জনভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তিনি উত্তর ২৪ পরগনার ‘বেতাজ বাদশা’ হয়ে উঠেছিলেন, হাবড়ার ইভিএম সেই ভিতটাই ধসিয়ে দিল। ১৫ বছর আগে যে পরিবর্তনের ডাক দিয়ে বালু এই কেন্দ্রে আধিপত্য শুরু করেছিলেন, ২০২৬-এর সেই একই মেজাজে হাবড়া বেছে নিল নতুন প্রতিনিধিকে। বালু-সাম্রাজ্যের এই পতন সম্ভবত বাংলার রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি। ফাইল ফটো।