ব্রেকিং
  • Home /
  • উপ-সম্পাদকীয় /
  • আন্তর্জাতিক নারী দিবস, নাগরিকত্ব ও নতুন প্রশ্ন: নারীর অধিকার কোথায় দাঁড়িয়ে ?

আন্তর্জাতিক নারী দিবস, নাগরিকত্ব ও নতুন প্রশ্ন: নারীর অধিকার কোথায় দাঁড়িয়ে ?

সাদ্দাম হোসেন অধ্যাপক সারা পৃথিবীতে প্রতি বছর ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করা হয়। এই দিনটি কেবল উৎসবের দিন নয়; এটি নারীর অধিকার, মর্যাদা এবং সমতার দাবি পুনরায় স্মরণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। প্রতি বছর এই দিনকে কেন্দ্র করে....

আন্তর্জাতিক নারী দিবস, নাগরিকত্ব ও নতুন প্রশ্ন: নারীর অধিকার কোথায় দাঁড়িয়ে ?

সাদ্দাম হোসেন অধ্যাপক সারা পৃথিবীতে প্রতি বছর ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করা হয়। এই....

Facebook
Twitter
LinkedIn
Email
WhatsApp
X
Threads
Telegram

আরও পড়ুন


সাদ্দাম হোসেন
অধ্যাপক

সারা পৃথিবীতে প্রতি বছর ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করা হয়। এই দিনটি কেবল উৎসবের দিন নয়; এটি নারীর অধিকার, মর্যাদা এবং সমতার দাবি পুনরায় স্মরণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। প্রতি বছর এই দিনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন থিম নির্ধারণ করা হয়, যাতে সমাজে নারীর অবস্থান ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে নতুনভাবে ভাবা যায়।
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের থিম হল “Give to Gain”। এই থিম আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—নারীদের এগিয়ে নিতে হলে সমাজের প্রতিটি স্তরে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমর্থন প্রয়োজন। জ্ঞান ভাগ করে নেওয়া, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করা, সমান মজুরি নিশ্চিত করা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা—এসবই নারীর ক্ষমতায়নের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের মূল বার্তাই হল—নারীরা এগিয়ে গেলে সমাজও এগিয়ে যায়।
কিন্তু প্রশ্ন হল—বাস্তবে কি নারীরা সত্যিই সেই অধিকার ও নিরাপত্তা পাচ্ছেন?
প্রায়ই আমরা নারীর অগ্রগতির কথা বলতে গিয়ে সফল, শহুরে বা আলোচিত নারীদের উদাহরণ তুলে ধরি। কিন্তু সমাজের এক বড় অংশের নারীরা—বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের নারী, শ্রমজীবী নারী, আদিবাসী ও দলিত নারী—আজও নানাভাবে বঞ্চনার শিকার। তাদের অনেকেই প্রতিদিন জীবিকার জন্য সংগ্রাম করেন, মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হন, এবং তাদের কণ্ঠস্বর খুব কমই মূলধারার আলোচনায় উঠে আসে।
নারীর অধিকার নিয়ে আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সমাজ ও গণমাধ্যমে নারীর উপস্থাপনা। সিনেমা, বিজ্ঞাপন কিংবা জনপ্রিয় সংস্কৃতির বহু ক্ষেত্রে এখনও নারীদের অনেক সময় পণ্য বা ভোগ্যবস্তুর মতো করে দেখানো হয়। বিভিন্ন গবেষণায় বারবার এই বিষয়টি উঠে এসেছে। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়—নারীরা কি সত্যিই তাদের পূর্ণ মর্যাদা ও অধিকার পাচ্ছেন?
এই প্রশ্নকে আরও জটিল করে তুলেছে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা। পশ্চিমবঙ্গে SIR–এর একটি তালিকা প্রকাশের পর দেখা গেছে, সেখানে বহু নারীর নাম “বিবেচনাধীন (Under Adjudication)” হিসেবে রাখা হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে নাম বাদ পড়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। এখানে বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হল—এই তালিকায় সংখ্যালঘু, আদিবাসী এবং অন্যান্য প্রান্তিক সম্প্রদায়ের নারীদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি বলে অভিযোগ উঠছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—এই প্রক্রিয়ায় কি কোথাও কোনো প্রশাসনিক ত্রুটি বা বৈষম্য ঘটেছে?
এখানে অবশ্যই নির্বাচন কমিশনের প্রশাসনিক কাজের বিষয়টি অস্বীকার করা যায় না। ভোটার তালিকা সংশোধন একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—কেন এই তালিকায় তুলনামূলকভাবে বেশি সংখ্যক নারী, বিশেষ করে প্রান্তিক সমাজের নারীরা, সন্দেহ বা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছেন?
সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে গ্রামীণ নারীদের নিজের নামে নথিপত্র কম থাকে। তারা বিয়ের পর বাড়ি বদলান, শিক্ষার সুযোগ সীমিত থাকে, এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে তাদের যোগাযোগও কম। ফলে নথির সামান্য অসঙ্গতিও তাদের নাগরিকত্ব বা পরিচয়ের প্রশ্নে জটিলতা তৈরি করতে পারে।
নির্বাচন কমিশন অবশ্যই তাদের নির্ধারিত কাজ করেছে। কোনো তথ্য বা নথিতে ভুল থাকলে তা সংশোধনের জন্য প্রক্রিয়া চালু থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু যেসব নারীর নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বা বিবেচনাধীন রাখা হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে যে যুক্তি বা ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে, তা অনেক সময় স্পষ্ট নয় বলে অভিযোগ উঠছে।
অনেক নারী দাবি করেছেন, তারা সমস্ত বৈধ নথি জমা দেওয়া সত্ত্বেও তাদের নাম এখনও নিশ্চিত তালিকায় নেই। ফলে তাদের মনে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে—তাদের নাগরিক অধিকার কি প্রশ্নের মুখে পড়ছে?
নারীর ক্ষমতায়নের কথা যখন আমরা আন্তর্জাতিক মঞ্চে বলি, তখন আমাদের মনে রাখতে হবে যে নাগরিক অধিকার তার একটি মৌলিক অংশ। ভোটাধিকার শুধু একটি রাজনৈতিক অধিকার নয়; এটি একজন নাগরিকের সামাজিক ও সাংবিধানিক মর্যাদার প্রতীক। যদি কোনো নারী নিজের পরিচয় প্রমাণ করার জন্য বারবার প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে বাধ্য হন, তাহলে তা তার সামাজিক অবস্থানকেও প্রভাবিত করতে পারে।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নারীর ক্ষমতায়ন মানে শুধু কিছু প্রতীকী সাফল্যের গল্প নয়। প্রকৃত ক্ষমতায়ন তখনই সম্ভব, যখন সমাজের প্রতিটি স্তরের নারী—গ্রামের শ্রমজীবী নারী থেকে শুরু করে শহরের কর্মজীবী নারী—সমান অধিকার ও মর্যাদা পান। যখন কোনও সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর পরিচয় নিয়ে বারবার সন্দেহ তৈরি হয়, তখন সেই সমাজে অবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি হয়। নাগরিকত্বের প্রশ্ন তখন শুধু প্রশাসনিক বিষয় থাকে না; তা সামাজিক মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং অধিকার—সব কিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে যায়।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রেক্ষাপটে তাই এই প্রশ্নগুলি নতুন করে ভাবা জরুরি। নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলার পাশাপাশি আমাদের দেখতে হবে—সমাজের সবচেয়ে প্রান্তিক নারীরা কি তাদের মৌলিক অধিকার, পরিচয় এবং নাগরিক মর্যাদা পাচ্ছেন? কারণ নারীর প্রকৃত মুক্তি তখনই সম্ভব, যখন সমাজের প্রতিটি নারী—শহর বা গ্রাম, ধনী বা দরিদ্র, সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু—সমানভাবে অধিকার ও মর্যাদা পাবে।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস তাই শুধু উদযাপনের দিন নয়; এটি আত্মসমালোচনা ও দায়বদ্ধতার দিনও। এই দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নারীর অধিকার, নাগরিকত্ব এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্ন এখনও শেষ হয়ে যায়নি। বরং সেই লড়াই আজও চলছে।
আজ তাই প্রয়োজন আত্মসমালোচনার। আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন করার পাশাপাশি আমাদের প্রশ্ন করতে হবে—আমরা কি সত্যিই নারীদের জন্য সেই সমান সুযোগ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেরেছি?
নারীর অধিকার কেবল একটি দিবসের আলোচনার বিষয় নয়; এটি একটি চলমান সামাজিক আন্দোলন। যতদিন না পর্যন্ত সমাজের প্রতিটি নারী তার অধিকার, নিরাপত্তা এবং মর্যাদা নিশ্চিত করতে পারছেন, ততদিন পর্যন্ত এই প্রশ্ন আমাদের সামনে থেকেই যাবে।


 

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

আজকের খবর