দীপাবলির আলো জ্বলার আগেই বিষাক্ত বাতাসের অন্ধকারে ঢেকে গেল দেশের রাজধানী। উৎসবের আনন্দে যখন মেতে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছে দিল্লি, ঠিক তখনই বিষবাষ্পের চাদরে কার্যত দমবন্ধ হওয়ার জোগাড় রাজধানী ও সংলগ্ন জাতীয় রাজধানী অঞ্চলের মানুষের। বাতাসে দূষণের মাত্রা এতটাই উদ্বেগজনক যে, সাধারণ মানুষের সুস্থভাবে শ্বাস নেওয়াটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। দীপাবলির আর মাত্র দু’দিন বাকি থাকতেই পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করে তড়িঘড়ি জারি করতে হয়েছে কঠোর বিধিনিষেধ।কার্যকর হয়েছে গ্রেডেড রেসপন্স অ্যাকশন প্ল্যানের তৃতীয় পর্যায় বা জিআরএপি-৩। কিন্তু প্রশ্ন হল, উৎসবের মরশুমে কেন বারবার বিষবাতাসের কাছে এভাবে অসহায় হয়ে পড়তে হবে রাজধানীবাসীকে?
কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৮টায় দিল্লির সামগ্রিক এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স বা একিউআই পৌঁছেছে ৩৬৪-তে। অর্থাৎ বাতাসের মান ‘ভয়ানক খারাপ’ পর্যায়ে। শুধু তাই নয়, রাজধানীর একাধিক এলাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। কয়েকটি নজরদারি কেন্দ্রে একিউআই ৪০০-র গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে গিয়েছে ‘অতীব বিপজ্জনক’ স্তরে। আইআইটি দিল্লিতে দূষণের সূচক ৪৪৩, পাঞ্জাবি বাগে ৪৩৩ এবং নরেলায় ৪০৯। এই পরিসংখ্যানই বুঝিয়ে দিচ্ছে, রাজধানীর বাতাসে কী পরিমাণ বিষ মিশেছে।দিল্লি ক্যাফে এলাকায় একিউআই ৩১৫, ধৌলা কুয়াঁয় ৩১৮ এবং আনন্দ বিহারে ২৭২। অর্থাৎ কোথাও সামান্য স্বস্তির ইঙ্গিত থাকলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়।
শুক্রবার সকালেও দিল্লির গড় একিউআই ছিল ৩৮৯। শনিবার সামান্য কমে ৩৬৪ হলেও সেই পরিসংখ্যানকে স্বস্তির খবর বলে ধরে নেওয়ার কোনও কারণ নেই।কারণ,দূষণের মাত্রা এখনও এমন জায়গায় রয়েছে, যা দীর্ঘক্ষণ শরীরে প্রবেশ করলে সুস্থ মানুষেরও শ্বাসকষ্ট-সহ নানা শারীরিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ এবং শ্বাসযন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের কাছে এই পরিস্থিতি যথেষ্ট উদ্বেগের।আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী,শনিবার ভোরে সফদরজঙে হালকা কুয়াশা দেখা গিয়েছে।সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে কুয়াশা ও বাতাসের অনুকূল পরিবেশের অভাবে দূষণ আটকে থাকার আশঙ্কাও বাড়ছে।
এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় কমিশন ফর এয়ার কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট বা সিএকিউএম-এর নির্দেশে এক দিন আগেই দিল্লি-এনসিআর এলাকায় জিআরএপি-৩ কার্যকর করা হয়েছে। আবহাওয়া দপ্তর এবং ট্রপিক্যাল মেটিরিওলজির পূর্বাভাস পর্যালোচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জিআরএপি-৩ কার্যকর হওয়ার অর্থ, দূষণ নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর পদক্ষেপ। নির্মাণ ও ভাঙার কাজের উপর বিধিনিষেধ, ধুলো নিয়ন্ত্রণে বাড়তি নজরদারি, দূষণ ছড়ানো যানবাহনের চলাচলে নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের মতো পদক্ষেপ এর আওতায় আসে। লক্ষ্য একটাই, দূষণের আরও অবনতি আটকানো এবং সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো।
তবে প্রশ্ন উঠছে,প্রতি বছর শীতের মুখে দিল্লির বাতাস কেন এমন বিষাক্ত হয়ে ওঠে? শুধু দীপাবলির বাজি ফাটানোকে দায়ী করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে?বাস্তব হল,দিল্লির বায়ুদূষণের পিছনে রয়েছে একাধিক কারণ। যানবাহনের ধোঁয়া,শিল্পাঞ্চলের নির্গমন, নির্মাণকাজের ধুলো, আবর্জনা পোড়ানো, আশপাশের রাজ্যে ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো এবং আবহাওয়াগত পরিস্থিতি সব মিলিয়েই তৈরি হয় দূষণের এই ভয়ংকর চক্র।শীতের শুরুতে বাতাসের গতি কমে গেলে দূষিত কণা সহজে ছড়িয়ে পড়তে পারে না। ফলে বিষাক্ত উপাদান জমতে থাকে শহরের বাতাসে। রাজধানীর আকাশে তখন নীলের বদলে জায়গা করে নেয় ধূসর কুয়াশার আস্তরণ।
দীপাবলির আগে এই পরিস্থিতি আরও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। উৎসব মানেই আলো, আনন্দ, মিলন এবং উদ্যাপন। কিন্তু সেই আনন্দ যদি অন্যের জীবনে শ্বাসকষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে উৎসবের প্রকৃত অর্থই হারিয়ে যায়। পরিবেশবান্ধব দীপাবলি পালনের প্রয়োজনীয়তা তাই নতুন করে সামনে এসেছে। শব্দবাজি ও আতশবাজির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ,অপ্রয়োজনে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমানো এবং যেখানে-সেখানে আবর্জনা পোড়ানো বন্ধ করার মতো ছোট ছোট পদক্ষেপও দূষণ মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে প্রশাসনের দায়িত্ব শুধু বিধিনিষেধ জারি করেই শেষ হতে পারে না। নিয়মের বাস্তবায়ন, নিয়মিত নজরদারি এবং দূষণের উৎসগুলির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
দিল্লির দূষণ আজ আর নিছক কোনও একটি শহরের সমস্যা নয়।এটি দেশের নগরায়ণ, পরিবেশনীতি এবং জনস্বাস্থ্যের সামনে এক বড় সতর্কবার্তা। প্রতি বছর শীত এলেই দূষণের বিরুদ্ধে জরুরি বৈঠক, বিধিনিষেধ এবং সাময়িক পদক্ষেপের ছবি দেখা যায়। কিন্তু কয়েক মাস পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই যেন সব উদ্বেগ উধাও হয়ে যায়।এই প্রবণতা বদলানো দরকার। দূষণ নিয়ন্ত্রণে চাই সারা বছরের পরিকল্পনা, রাজ্যগুলির মধ্যে সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশবান্ধব পরিবহণ ও শিল্পনীতি।
উৎসবের আলোয় দিল্লি আলোকিত হোক, এটাই প্রত্যাশা। কিন্তু সেই আলো যেন বিষাক্ত ধোঁয়ার আড়ালে হারিয়ে না যায়। উন্নয়নের নামে যদি মানুষের নির্মল বাতাসে শ্বাস নেওয়ার অধিকারই বিপন্ন হয়, তবে সেই উন্নয়নের সার্থকতা কোথায়? মনে রাখতে হবে, দীপাবলির প্রদীপ কয়েক ঘণ্টার জন্য অন্ধকার দূর করে কিন্তু দূষণের বিষ মানুষের শরীরে রেখে যায় দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত। তাই এবার উৎসবের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার হোক আতশবাজির ঝলকানি নয়, নির্মল বাতাসই হোক রাজধানীর আসল আলো।