ব্রেকিং
[pj-news-ticker]

গোপনতার অনন্য রহস্যে ঘেরা সাহিত্যের নোবেল

সুনীল মাইতি সাংবাদিক,সাহিত্যিক ও শিক্ষক   প্রতি বছর অক্টোবরের শুভ্র শরতে গোটা বিশ্ব পরম আগ্রহে অপেক্ষা করে সুইডেনের স্টকহোম শহরের দিকে। চিকিৎসা,পদার্থবিদ্যা,রসায়ন কিংবা অর্থনীতির মতো বিজ্ঞানের নানা শাখায় কারা নোবেল সম্মান পেতে চলেছেন, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে নানা ধরনের বস্তুনিষ্ঠ....

গোপনতার অনন্য রহস্যে ঘেরা সাহিত্যের নোবেল

সুনীল মাইতি সাংবাদিক,সাহিত্যিক ও শিক্ষক   প্রতি বছর অক্টোবরের শুভ্র শরতে গোটা বিশ্ব পরম আগ্রহে অপেক্ষা....

Facebook
Twitter
LinkedIn
Email
WhatsApp
X
Threads
Telegram

আরও পড়ুন


সুনীল মাইতি

সাংবাদিক,সাহিত্যিক ও শিক্ষক

 

প্রতি বছর অক্টোবরের শুভ্র শরতে গোটা বিশ্ব পরম আগ্রহে অপেক্ষা করে সুইডেনের স্টকহোম শহরের দিকে। চিকিৎসা,পদার্থবিদ্যা,রসায়ন কিংবা অর্থনীতির মতো বিজ্ঞানের নানা শাখায় কারা নোবেল সম্মান পেতে চলেছেন, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে নানা ধরনের বস্তুনিষ্ঠ পূর্বাভাস বা সমীকরণ দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু যে একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে চরম রহস্য, উৎকন্ঠ,জল্পনা আর তুমুল কৌতূহল দানা বাঁধে তা হলো সাহিত্যের নোবেল পুরস্কার। কার হাতে উঠতে চলেছে বিশ্ব সাহিত্যের এই সর্বাগ্রে গণ্য পরম সম্মান,সেই সিদ্ধান্ত চূড়ান্তভাবে ঘোষণার মুহূর্তটি পর্যন্ত সুইডিশ অ্যাকাডেমি যে অভাবনীয় মাত্রার গোপনতা বজায় রাখে,তা নোবেল পুরস্কারের অন্য যেকোনো বিভাগের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা, স্বতন্ত্র ও নজিরবিহীন।

 

সাহিত্যের নোবেল ঘোষণার এই অতি গোপনতার পেছনে রয়েছে একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সুনির্দিষ্ট নান্দনিক দর্শন এবং কঠোর প্রশাসনিক নীতি। ১৮৯৫ সালে শিল্পপতি এবং বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলের ঐতিহাসিক উইলে স্পষ্ট নির্দেশ ছিল, মানবজাতির কল্যাণে সাহিত্যক্ষেত্রে যিনি আদর্শগত এবং সেরা কাজ উপস্থাপন করবেন, তাঁকেই পুরস্কৃত করতে হবে। ১৮৯৭ সালে গঠিত হওয়া ঐতিহ্যবাহী সুইডিশ অ্যাকাডেমিকে এই গুরু দায়িত্ব পালনের জন্য নির্ধারিত করা হয়। অ্যাকাডেমির ১৮ জন আজীবন সদস্য, যাদের সুইডিশ ভাষায় ‘দে এইটিন’ বা ‘সেই আঠারো জন’ বলা হয়, এই সামগ্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়া অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পরিচালনা করেন। এই বিশিষ্ট সদস্যদের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত ও গোপনীয়তা রক্ষার যে ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি তা কেবল সাধারন কোনো প্রশাসনিক নিয়ম নয়,বরং শতাব্দীর শতাব্দী ধরে চলে আসা পবিত্র ব্রত ও নৈতিক অনুশাসন।

 

বাস্তবে এই পুরস্কারের মনোনয়ন পর্ব থেকেই শুরু হয় গভীর গোপনতার খেলা। প্রতি বছর জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্বজুড়ে নিবন্ধিত বিশ্ববিদ্যালয়, সাহিত্যের অধ্যাপক; সাহিত্য অ্যাকাডেমী, আন্তর্জাতিক পেন ক্লাব এবং সাবেক নোবেলজয়ীদের কাছ থেকে প্রায় সাড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ বিখ্যাত লেখকের নাম প্রস্তাব হিসেবে এসে পৌঁছায় সুইডিশ অ্যাকাডেমীর দপ্তরে। এপ্রিল মাসের মধ্যে অ্যাকাডেমি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে সেই বিশালাকার তালিকা ছোট করে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি খসড়া তালিকা তৈরি করে। এরপর মে মাসের শেষভাগে এসে সেই তালিকা আরও ছেঁকে মাত্র পাঁচজন চূড়ান্ত সাহিত্যিকের একটি সংক্ষিপ্ত গোপন তালিকায় নামিয়ে আনা হয়।গ্রীষ্মকালীন ছুটির দীর্ঘ চার মাসে অ্যাকাডেমির ১৮ জন বিচারক বিশ্বসাহিত্যের সেই পাঁচ জন মহান লেখকের সমস্ত সৃষ্টিশীল কাজ নিবিড়ভাবে অধ্যয়ন করেন, অনুবাদ বিশ্লেষণ করেন এবং সাহিত্যমূল্য বিচার করেন।কিন্তু এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় যাঁদের নাম আলোচনায় আসে তাঁদের কারও পরিচয় বাইরে প্রকাশ করা তো দূরের কথা, সামান্যতম তথ্যও যেন কোনোভাবেই লিক না হয়, তার জন্য চরম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।নোবেল কমিটির নিজস্ব প্রথা ও সংবিধান অনুযায়ী যেকোনো বছরের মনোনয়ন, বিচারকদের ব্যক্তিগত মতামত এবং বাছাই প্রক্রিয়ার মূল নথি আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তত ৫০ বছর সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত এবং গোপন রাখা আইনি বাধ্যবাধকতা‌।

 

তথ্য গোপন রাখার এই সংস্কৃতি বজায় রাখতে সুইডিশ অ্যাকাডেমি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নানাবিধ বিচিত্র ও বুদ্ধিমত্তাপূর্ণ কৌশল ব্যবহার করে আসছে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই দেখা যায়, ডিজিটাল যুগের আগে যখন চিঠিপত্রে বা সরাসরি সভায় আলোচনা চলত,তখন কোনো লেখকের আসল নাম মুখে বা কাগজে উচ্চারণ করা হতো না। বিচারকরা লেখকদের জন্য তৈরি করতেন বিশেষ সাংকেতিক নাম বা ছদ্মনাম। উদাহরণস্বরূপ,বিশিষ্ট সুয়েডিয় লেখক তথা অ্যাকাডেমির সদস্য হ্যালি মার্টিসন যখন বিচার প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন, তখন লেখকদের সাংকেতিক কোড ছাড়া সম্মোধনই করা হতো না। অনেক সময় সুনির্দিষ্ট কোনো বইয়ের কথা আলোচনা করতে গিয়েও বিকল্প কোনো কাল্পনিক নাম ব্যবহার করা হতো,যাতে ভুলবশত সেই চিঠি বা কাগজ হস্তান্তরিত হলেও কেউ আসল প্রার্থীর নাম টের না পায়।

 

বিংশ শতাব্দীর পর একবিংশ শতাব্দীতে প্রযুক্তির ব্যাপক বিস্তারের সাথে সাথে সুরক্ষার কৌশলও আমূল বদলে গেছে। যেকোনো ধরনের আধুনিক ডিজিটাল হ্যাকিং, সাইবার আক্রমণ বা গোপনে আড়ি পাতা রোধ করতে বিচারকদের যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ এনক্রিপ্টেড এবং অতি- সুরক্ষিত অভ্যন্তরীণ সংকেতের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।এমনকি কোনো মিটিংয়ের খসড়া নথি বা ব্যক্তিগত মতামত আদান- প্রদানের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা ও নিরাপদ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হয়।কাগজপত্রের মূল রূপ থেকে শুরু করে অ্যাকাডেমির বার্ষিক নৈশভোজের গোপন আলোচনা প্রতিটি পদক্ষেপে সদস্যরা বজায় রাখেন অলঙ্ঘনীয় সতর্কতা।

 

অন্যান্য বিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কারের ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে চলা গবেষণার প্রভাব ও সাইটেশন দেখে সম্ভাব্য বিজয়ীর নাম অনুমান করা কিছুটা হলেও সহজ হয়। কারণ বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার মানদন্ড মূলত নির্দিষ্ট আবিষ্কার,তথ্য, উপাত্ত ও প্রমাণের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু সাহিত্যের ক্ষেত্রটি তা নয়, এটি অত্যন্ত মননশীল, নান্দনিক সাংস্কৃতিক, ব্যক্তিগত অনুভূতির জায়গা। নির্ধারণ করার মতো কোনো বৈজ্ঞানিক স্কেল,নির্দিষ্ট মাপকাঠি বা গাণিতিক সূত্র নেই। ফলে সিদ্ধান্ত প্রকাশের আগে নাম লিক হয়ে গেলে তা বিচারকদের ওপর রাজনৈতিক, সামাজিক, ভূ- রাজনৈতিক বা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রবল ও অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ তৈরি করতে পারে। কোনো বিশেষ ভাবধারার লেখককে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে লবিং শুরু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। সুইডিশ অ্যাকাডেমী বিশ্বাস করে,সম্পূর্ণ স্বাধীন,নিরপেক্ষ এবং সৎভাবে একজন লেখকের সাহিত্যিক অবদানকে মূল্যায়ন করতে হলে আন্তর্জাতিক চাপ ও বাহ্যিক প্রভাব থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা আবশ্যিক। আর সেই স্বাধীনতা রক্ষার একমাত্র সুদৃঢ় গ্যারান্টি হলো চরম নিরপেক্ষতা ও পরম গোপনতা।

 

তবে শত চেষ্টা সত্ত্বেও অতীতের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়; এই অতি– গোপনতার নিশ্চিদ্র বর্ম ভেঙে কয়েকটি অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসে ২০১৮ সালে, যখন সুইডিশ অ্যাকাডেমি একটি বিরাট প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের মুখে পড়ে। অ্যাকাডেমীর এক প্রভাবশালী নারী সদস্যের স্বামীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য পাচার এবং গুরুতর অনৈতিকতার অভিযোগ ওঠে। অনুসন্ধানে জানা যায়,ঘোষণার আগেই টানা কয়েক বছর ধরে বিজয়ী লেখকদের নাম বেটিং সিন্ডিকেট বা বাইরের বাণিজ্যিক গোষ্ঠীর কাছে গোপন সূত্রে লিক করে দেওয়া হয়েছিল। এই চরম বিতর্কের ফলে শতবর্ষী সুইডিস অ্যাকাডেমীর আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও বিশ্বস্ততা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ২০১৮ সালের সাহিত্যের নোবেল প্রদান স্থগিত রাখা হয় এবং নতুন বিচারক নিয়োগ ও প্রশাসনিক সংস্কারের পর ২০১৯ সালে একসঙ্গে দুটি বছরের পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। এই অপ্রীতিকর ঘটনাটি সুইডিশ অ্যাকাডেমিকে আরও বেশি সতর্ক, অনুতপ্ত এবং কঠোর করে তোলে। গোপনতার অভ্যন্তরীণ বিধিনিয়মে যুক্ত করা হয় আরও নতুন কড়াকড়ি এবং অভূতপূর্ব নিরাপত্তা প্রটোকল, যাতে অ্যাকাডেমীর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে পৃথিবীর কোথাও কোনো বিন্দুমাত্র সংশয় না থাকে।

 

সবশেষে বলা যায়, সাহিত্যের নোবেলকে কেন্দ্র করে যে সুবিশাল এবং মোহময় রহস্যের আবহ তৈরি হয় তা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি বইপ্রেমী এবং পাঠকদের হৃদয়ে এক অদ্ভুত ও চিরন্তন রোমাঞ্চ সৃষ্টি করে। ঘোষণার কয়েক দিন আগে থেকেই আন্তর্জাতিক বেটিং সাইটগুলোতে বাজি ধরা থেকে শুরু করে সাধারণ কফি হাউসের আড্ডার টেবিল বা পত্রপত্রিকার সাহিত্য পাতা— সবখানেই জমে ওঠে যুক্তি- তর্কের ঝড়। তবে এই গোপন রহস্যের মূল উদ্দেশ্য সস্তা প্রাতিষ্ঠানিক প্রচার বা নাটকীয় চমক সৃষ্টি করা নয় বরং বিশ্বসাহিত্যের মতো অতি সূক্ষ্ম, স্বাতন্ত্র্যময় ও সংবেদনশীল সৃষ্টিশীল কাজকে বিশ্ব রাজনীতি,বাণিজ্যিক স্বার্থ ও অপ্রয়োজনীয় প্রচারের আলো থেকে আড়াল করে প্রকৃত সম্মান জানানো। প্রতিবছর অক্টোবরের এক মাহেন্দ্র ক্ষনে যখন সুইডিশ অ্যাকাডেমীর স্থায়ী সচিব প্রাচীন ঐতিহ্য মেনে স্টকহোমের স্টক এক্সচেঞ্জ ভবনের ঘরের ভারি দরজা খুলে বেরিয়ে আসেন এবং বিশ্ববাসীর সামনে নতুন বিজয়ী সাহিত্যিকের নাম উচ্চারণ করেন কেবল তখনই বিশ্ববাসী জানতে পারে সাহিত্যের নতুন নক্ষত্রের নাম। এই নীরবতা, পরম আত্ম-সংযম এবং কঠোর গোপনতাই আসলে সাহিত্যের নোবেল পুরস্কার কে বিশ্বমঞ্চে এক অতুলনীয়,সর্বজনশ্রদ্ধেয়,মহিমান্বিত ও রাজকীয় আসনে চিরদিনের জন্য অধিষ্ঠিত করে রেখেছে।


বাংলায় কি বড় কোনো ‘অপারেশন’? শাহের ‘গোপন বৈঠকে’ শঙ্কিত তৃণমূল

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

আজকের খবর