
সুমন কল্যাণ মন্ডল
দুর্গাপূজা ফুরোবার পর কদিন কাটতে না কাটতেই হেমন্তের হিমেল হাওয়া উঁকি ঝুঁকি দিয়ে যায় বাংলার ধানের শীষ আর শিশিরস্নাত ঘাসের ডগায়। পূজার ব্যস্ত দোকানপাটগুলো একে একে গুটিয়ে যেতে থাকে, কেবল পড়ে থাকে দু- একটি মিষ্টি আর তেলে ভাজার দোকান – ভাইফোঁটা পর্যন্ত যারা পসরা সাজিয়ে বসে থাকে। এরই মাঝে প্রকৃতির রূপ পরিবর্তন অনুভূত এবং চাক্ষুষ হয় এক গভীর রূপে। গ্রামের ঢোকার মুখে বাঁশঝাড় থেকে ভেসে আসে খসে পড়া পাতার মর্মর ধ্বনি, আর সোনালী ধানের ক্ষেতের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া হালকা হাওয়ায় যেন অজান্তেই নাচে হেমন্তের মন। ঠিক এই আবহেই গ্রামীণ জনপদে আগমন ঘটে মহাশক্তি মা কালীর।
অমাবস্যার গাঢ় অন্ধকারকে চিরে, আলোর মালা নিয়ে হাজির হয় এই উৎসব। শহরের রং ঝলমলে কালী পূজার রোশনাই গ্রাম বাংলায় এসে পৌঁছালেও, তার নিজস্ব শেকড় ও গ্রামীণ নিজস্বতা সম্পূর্ণ রূপে গিলে খাওয়ার সাধ্য তার এখনো হয়নি। গ্রাম বাংলার কালী পূজার একটি নিজস্ব সুবাস আছে, আছে এক অপূর্ব অন্তরের টান। আছে একটা আলাদা আমেজ।
গ্রামবাংলায় কালীপূজার প্রস্তুতি শুরু হয় অনেক আগে থেকেই। পাড়ার তরুণদের মধ্যে চাঁদা তোলা, বাঁশ ও ত্রিপল জোগাড় করা আর মণ্ডপ সাজানোর ব্যস্ততা বাড়তে থাকে। কারও হাতে রং-তুলি, কারও হাতে আলোর তার, কেউ আবার মণ্ডপের শক্তপোক্ত কাঠামো বাঁধতে ব্যস্ত। যে ছেলেটির সারা বছর খোঁজ খবর থাকে না, পূজার কদিন তাকেও বেশ কর্মঠ মনে হয়। মণ্ডপের কাজ শেষ হলে পাড়ার দুরন্ত ছেলেরা সেখানে দল বেঁধে আড্ডা জমায়।ছোট ছেলেরা মন্ডপের বাঁশে ঝুলে বাঁদর বাঁদর খেলে।গ্রামের চায়ের দোকানে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে চলে বাজেট, প্রতিমা, আলোকসজ্জা , খিচুড়ি বিতরন কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সম্পর্কে চুলচেরা বিশ্লেষণ। কারও মতামত মেনে নেওয়া হয়, কারও কথায় বাধে মৃদু বাকবিতণ্ডা। তবে শেষ পর্যন্ত সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে পাড়ার প্রাণের পূজামণ্ডপ। এই মেনে নেওয়া না মেনে নেওয়ার মধ্যেও এক অদৃশ্য সুতো দিয়ে সবাই সবাইকে যেনো বেঁধে রাখে।
কালী প্রতিমা গড়ার অর্ডার দেওয়া হয় গ্রাম থেকে দূরের কোনো এক কুমোরপাড়ায়। পূজার দিন বিকেলে পিকআপ ভ্যানে বা টোটোতে করে মহাসমারোহে প্রতিমার আনয়ন হয় মণ্ডপে।কোনো থিম বা আধুনিকতার প্রলেপ নেই, অবিকল সনাতনী কালীর রূপ। দেবীর শ্যামবর্ণা দেহ, লম্বা কেশ, গলায় মুণ্ডমালা, হাতে খড়্গ ও পদতলে শেয়ালের উপস্থিতি এবং পা তুলে রেখেছেন শিবের ওপর ।প্রথম দর্শনে রূপটি ভয়ংকর মনে হলেও ভক্তের কাছে তিনিই পরম আশ্রয়দাতা,অশুভ বিনাশকারী মা।
দেবী কালীর শক্তি বাংলার ঐতিহ্য।মহাপ্রলয়ের মধ্য দিয়ে নতুন সৃষ্টির প্রতীক।সেই দেবীর চরণেই গ্রামের অপোগন্ড থেকে আশির বৃদ্ধ সব বয়সের মানুষ নিজেদের মনের আকুতি নিবেদন করে।মায়ের চরণে ভোগ অর্পণ করার মধ্যে দিয়েই মানুষ খুঁজে পায় শান্তি ও নিরাপত্তার আশ্বাস।
সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গেই মেঠোপথ ধরে লোকজনের গুঞ্জন বাড়ে। মায়ের মণ্ডপের সামনে জমে কালো মাথার ভিড়। ধূপ, কাঁসর আর ঘণ্টার ধ্বনিতে চারপাশের স্তব্ধতা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। গ্রামের মোড়ে, পুরোনো বটবৃক্ষতলে কিংবা শ্মশানঘাটসংলগ্ন অঞ্চলে মণ্ডপে মণ্ডপে শুরু হয় মায়ের আমন্ত্রণ। এই পূজায় বাইরের আড়ম্বর নেই, আছে প্রাণের এক গভীর আশ্বাস ও অগাধ বিশ্বাস।
গ্রাম বাংলার কালী পূজার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো মাটির গন্ধঘেরা তার আবহাওয়া। পুরোহিত মশাইয়ের গম্ভীর মন্ত্রোচ্চারণ গ্রামের নিস্তব্ধ বাতাসে যেন বেত্রাঘাত করে। প্রদীপের স্নিগ্ধ আলোয় মণ্ডপে বসা মানুষের মুখে সৃষ্টি করে অন্য উজ্জ্বলতা। নতুন শাড়ি পরে মহিলারা কপালে সিঁদুরের টিপ দিয়ে থালায় নৈবেদ্য সাজিয়ে সারিবদ্ধভাবে উপস্থিত হন। ঢাকের বাদ্যি যখন বেজে ওঠে – ‘ধ্যাং কুড়াকুড় ,ধ্যাং কুড়াকুড়’ ছন্দে তখন আপামর মানুষের হৃদয়ও যেন সেই তালে নাচতে শুরু করে। ঢাকের বোলে গ্রামীণ যুবকদের বুক কেঁপে ওঠে অব্যক্ত আনন্দে, আর বৃদ্ধদের মনে চলে আসে অতীতে স্মৃতির রোমন্থন। ছোটো ছেলেমেয়েরা মেতে ওঠে রঙবেরঙের বাজি পোড়ানোর আনন্দে।
শহরের মেকি নিয়ন লাইটের আলো গ্রাম বাংলায় এলেও , চোখ রাঙিয়ে দাপোট দেখাতে আজও অক্ষম। গ্ৰাম তার নিজস্ব ঐতিহ্যে অমলিন। পূজার রাতে ঘরের বারান্দা আর দালানজুড়ে জ্বলে ওঠে মোমবাতি, দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন জোনাকিদের বাড়ি। প্রতি ঘরের উঠোনে, গোয়ালঘরে এবং তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বালানো হয় – দেখে মনে হয় যেন অন্ধকারকে চিরতরে দূর করার জন্য ব্রতী হয়েছে সম্পূর্ণ গ্ৰাম।
কালীপূজার সঙ্গে দীপাবলির সম্পর্কও বেশ নিবিড়। ঘরদোর পরিষ্কার আর প্রদীপ জ্বালানোর পাশাপাশি শুরু হয় আত্মীয়স্বজনের বাড়ি যাওয়া এবং মিষ্টিমুখ করানোর পালা। তবে সব গ্রামে পূজার ধরন এক রকম নয়, কোথাও পারিবারিক মন্দিরে বহু প্রজন্মের পুরোনো রীতিতে পুজো হয়, আবার কোথাও সর্বজনীন মণ্ডপে উৎসবের ব্যাপ্তি অনেক বেশি। এই বৈচিত্র্যই গ্ৰাম বাংলার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পড়ে।
উৎসবের এই আনন্দের আড়ালে থাকে গ্রামীণ সমাজের এক সহজ সরল ছবি। বহু পরিবার আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সাধ্যমতো পূজায় অংশ নেয়। কারও জাঁকজমক বেশি, কারও কেবল একটি প্রদীপ জ্বালানোর সামর্থ্য – কিন্তু আন্তরিকতার মাপকাঠিতে তা সমান মূল্যবান। গ্রামের উৎসব মানুষকে ব্যক্তিগত গণ্ডি পেরিয়ে এক সামাজিক পরিবারের অংশ হতে শেখায়। ধনী-দরিদ্র, ছোট-বড় নির্বিশেষে সবাই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আনন্দ উপভোগ করে।
গ্রাম বাংলার কালী পূজার আরেকটি অঙ্গ হলো বলির প্রথা ,যদিও তা বর্তমানে অনেক কমে গিয়েছে ।আধুনিক সময়ে অনেক গ্রামেই বলি প্রথা উঠে গিয়ে তার প্রতীকী রূপ এসেছে। হোম এর আগুনের লেলিহান শিখা যখন অন্ধকার আকাশ ছুঁতে চায়, তখন সেই অগ্নিকুন্ডের সামনে বসে মানুষ তাদের দুঃখ-দুর্দশা আর না পাওয়াগুলো সমর্পণ করে মহাশক্তির চরণে এই ভেবে যে – মা তাদের সকল দুঃখ কষ্ট মোচন করবেন ।
গ্রামবাংলার কালীপূজা নিছক কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়,এটি মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষের আনন্দ, বেদনা, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির সজীব চিত্র,যা অঙ্কনে ফুটিয়ে তোলা অসম্ভব, চাক্ষুষ করে অনুভব করতে হয়। শহরের কোলাহল থেকে বহুদূরে, এই নিভৃত পল্লী অঞ্চলের কালীপূজা গুলি তাই চিরকালই বাংলার মাটিতে অনন্য সংস্কৃতি বহন করে নিয়ে যাবে ।কালী পূজোর ঘুটঘুটে কালো অমাবস্যার রাতেও গ্ৰাম গুলো ছোট্ট প্রদীপ আর মোমবাতির স্পর্শে প্রান পেয়ে থাকুক আজীবন।