
সুনীল মাইতি
সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক
ইতিহাসের কিছু ঘটনা শুধু সময়কে চিহ্নিত করে না রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনার ক্যানভাসে একদিন দীর্ঘস্থায়ী প্রকম্পন সৃষ্টি করে। যে কলকাতা ২০০৭ সালের এক বিষাদময় দিনে রাজনৈতিক তোষণ এবং মৌলবাদী হুমকির মুখে তসলিমা নাসরিনকে ছিটকে ফেলেছিল সেই শহরের রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে তসলিমার নামটি আজও এক অমলিন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। পঁচিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে গৃহহীন নির্বাসিত এই মুক্তচিন্তক লেখকের কলকাতায় প্রত্যাগমন কিংবা তাঁর ফিরে আসার আকুতি কেবল একজন ব্যক্তির ঘরে ফেরার গল্প নয় এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এপার ও ওপার বাংলার বহুমাত্রিক রাজনীতির সূক্ষ্ম ইঙ্গিত এবং শক্তির সমীকরণ।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ‘লজ্জা’ উপন্যাস প্রকাশের পর বাংলাদেশী মৌলবাদীদের ফতোয়ার শিকার হয়ে দেশ ছাড়তে হয়েছিল তসলিমা নাসরিনকে। ইউরোপের তীব্র শীত আর দীর্ঘ একাকিত্বের পথ পেরিয়ে তিনি আশ্রয় খুঁজেছিলেন এই কলকাতায়। ভাষা; সংস্কৃতি এবং জলবায়ুর টানে কলকাতা ছিল তাঁর আত্মিক নিবাস। কিন্তু ২০০৭ সালের ২১ শে নভেম্বর কলকাতার পার্ক সার্কাস চত্বরে যে তাণ্ডব ঘটেছিল; তার জল গড়িয়েছিল তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের ক্ষমতার অলিন্দে। ভোট ব্যাংক রক্ষার তাগিদে এবং রাজনৈতিক সমীকরণের চাপে তৎকালীন রাজ্য সরকার তাঁকে রাতারাতি পশ্চিমবঙ্গ ছাড়তে বাধ্য করে। আয়রনি এটাই যে; যে প্রগতিশীলতার দোহাই দিয়ে তৎকালীন শাসকদল ক্ষমতা ধরে রাখতে চেয়েছিল; তসলিমা পর্ব সেই প্রগতিশীলতার মুখোশ খসিয়ে দিয়েছিল।
পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও তসলিমা নাসরিনের কলকাতায় স্থায়ীভাবে ফেরার বিষয়টি অধরাই থেকে গেছে। শাসক বদলালেও রাজনৈতিক সমীকরণের মূল কাঠামোটি যে বদলাইনি; তসলিমার ক্রমাগত নির্বাসনই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। জাতীয় এবং আঞ্চলিক–উভয় স্তরের রাজনীতির কাছেই ‘তসলিমা নাসিরিন’ এমন এক নাম; যাকে ঘিরে পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়াটা সরাসরি ভোট ব্যাংকের ওপর প্রভাব ফেলে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে তসলিমা নাসরিনের বক্তব্য; সামাজিক মাধ্যমে তাঁর নিয়মিত মতামত এবং কলকাতায় তাঁর ছায়াসঙ্গী হয়ে থাকা উপস্থিতি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এই প্রত্যাগমনের ভেতরে কেবল সাহিত্যের টান নয়; স্পষ্ট রাজনৈতিক ইঙ্গিতও দৃশ্যমান।
প্রথমত; জাতীয় রাজনীতির মেরুকরণ ও ব্যবহারের রাজনীতি। তসলিমা নাসরিন বহুবার স্পষ্ট করেছেন যে তিনি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পতাকাতলে নেই। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া ‘রেসিডেন্স পারমিট’ বা ‘ভিসার’ ভিত্তিতেই তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। দিল্লিতে তাঁর থাকার বন্দোবস্ত এবং কলকাতার রাজনীতিতে তাঁর অপ্রত্যক্ষ উপস্থিতি অনেক সময় ডানপন্থী রাজনৈতিক শিবিরকে বাম ও আঞ্চলিক দলগুলোর ‘তোষন রাজনীতি’কে আক্রমণ করার অস্ত্র তুলে দেয়।ফলে তসলিমার ফিরে আসার লড়াইটি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত অধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই ভারতীয় রাজনীতি ছদ্ম- ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম তোষণ নীতির বিতর্কে এক বড় অনুঘটক হয়ে উঠেছে।
দ্বিতীয়ত; বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক আবহাওয়া ও ভূ-রাজনীতি। বাংলাদেশে যখনই রাজনৈতিক পরিবর্তন বা মৌলবাদী শক্তির পুনরুত্থান ঘটে তখনই তসলিমা নাসরিনের কণ্ঠস্বর আরো সোচ্চার হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গ– পুরো বঙ্গভাষী অঞ্চলে ধর্মীয় কট্টরপন্থার প্রসারের বিরুদ্ধে তাঁর দীর্ঘদিনের আপোসহীন অবস্থান স্পষ্ট। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন ও বক্তব্য মূলত রাজনৈতিক নেতৃত্বকে মনে করিয়ে দেয় যে; সীমান্ত পেরিয়ে আসা মৌলবাদের ঢেউকে উপেক্ষা করা কতটা বিপদজনক হতে পারে।
তৃতীয়ত; কলকাতার সুশীল সমাজ ও বুদ্ধিজীবীদের রাজনৈতিক অবস্থান পরীক্ষা।একসময় তসলিমার সমর্থনে কলকাতার রাজপথে মিছিল হয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতা এবং রাজনীতির পালাবদলে বহু বুদ্ধিজীবীই আজ নীরব। তসলিমার বারবার কলকাতায় ফিরে আসার চেষ্টা কোলকাতার তথাকথিত ‘মুক্তচিন্তার সুশীল সমাজে’- এর দ্বিচারিতাকে জনসমক্ষে উন্মুক্ত করে দেয়। কোন বাকস্বাধীনতা গ্রহণযোগ্য আর কোনটি দলীয় স্বার্থে বর্জনীয়— তসলিমা কেন্দ্রিক রাজনীতি সেই লক্ষণরেখাকে বারবার স্পষ্ট করে তোলে।
রাজনৈতিক এই জটিল আবর্তের বাইরে এসে দেখলে বোঝাই যায়; তসলিমা নাসরিন কেবল একটি রাজনৈতিক ঘুঁটি নন; তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের নাম; যা ক্ষমতার চোখ রাঙ্গানিকে তোয়াক্কা করে না। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ডিগ্রিধারী এই লেখিকা তাঁর জীবন দিয়ে বুঝেছেন সমাজের আসল রোগটি কোথায়। কিন্তু রাজনীতির কারবারিরা সবসময় সত্যের থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে ভালোবাসে; কারণ নির্ভেজাল সত্য ভোটের বাক্সে লাভ এনে দেয় না।
কলকাতা শহরটি চিরকাল বিদ্রোহী ও সংস্কারকদের আশ্রয় দিয়ে এসেছে। রামমোহন থেকে বিদ্যাসাগর– যাঁরাই প্রথার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন; সমাজ তাঁদের আঘাত করেছে। তসলিমা নাসরিন সেই একই ইতিহাসের ধারক। আর যখন তিনি নিঃসঙ্গতা আর অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে নিজের লেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছেন; তখন তাঁর কলকাতায় ফেরার আকুতি আমাদের রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থার দিকে এক বিরাট প্রশ্ন চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
তসলিমা নাসরিনের এই প্রত্যাগমন এবং তা ঘিরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক ইঙ্গিত আসলে একটি আয়না। এই আয়নায় রাজনৈতিক দলগুলো দেখে তাদের ক্ষমতার হিসাব- নিকাশ; আর সাধারণ মানুষ দেখে বাক স্বাধীনতার প্রকৃত সীমারেখা। রাজনৈতিক মেরুকরণ বা ভোট ব্যাংকের স্বার্থ যেভাবেই তাঁকে ব্যবহার করার চেষ্টা করুক না কেন; ইতিহাস দিনশেষে মনে রাখবে সেই আপোসহীন লেখিকাকেই; যিনি ভিটেমাটি হারিয়েও রাজনীতির কাছে মাথা নত করেননি। কলকাতা যদি সত্যি নিজেকে মুক্তচিন্তার পীঠস্থান বলে দাবি করতে চায়; তবে রাজনীতির উর্ধ্বে উঠে তসলিমাকে তাঁর ভালোবাসার শহরে ফিরিয়ে আনাই হবে ঐতিহ্যের সঠিক উদযাপন।