নয়া জামানা : দু’পাশে যতদূর চোখ যায় শুধু ঝকঝকে নীল জলরাশি, আর তার মাঝখান দিয়ে এগিয়ে গিয়েছে একটি সরু রাস্তা। সেই পথ ধরে এগোলেই চোখের সামনে ধরা দেয় এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্য— অক্ষত সমুদ্রসৈকত আর এমন এক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, যার তুলনা গোটা ভারতে আর কোথাও মেলে না। প্রবল সমুদ্রবাতাসে ঘেরা এই স্থানটির পরিচিতি তার রহস্যময় সৌন্দর্য আর আকর্ষণীয় ইতিহাসের জন্য। ভারতীয় মূল ভূখণ্ডের একেবারে শেষ প্রান্তে অবস্থিত এই জায়গার নাম ধনুষ্কোডি, যা প্রায়ই পরিচিত ‘ভারতের শেষ ভূখণ্ড’ নামে।
তামিলনাড়ুর রামেশ্বরম থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই ছোট্ট উপকূলীয় জনপদটি শ্রীলঙ্কার খুব কাছাকাছি। মনোরম সমুদ্রতট, পরিত্যক্ত ধ্বংসাবশেষ এবং অনন্য ভৌগোলিক অবস্থানের জন্য বিশেষভাবে বিখ্যাত ধনুষ্কোডি।
ধনুষ্কোডির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রামায়ণের গভীর সম্পর্ক। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এখান থেকেই ভগবান রাম তাঁর বানরসেনাকে নিয়ে নির্মাণ করেছিলেন রাম সেতু, যাতে লঙ্কায় পৌঁছে উদ্ধার করা যায় দেবী সীতাকে। জনশ্রুতি অনুসারে, পরবর্তীতে ভগবান রাম তাঁর ধনুকের আঘাতে সেই সেতুর একটি অংশ ভেঙে দেন। সেই থেকেই এই স্থানের নাম হয় ‘ধনুষ্কোডি’, যার অর্থ ‘ধনুকের শেষ প্রান্ত’।
১৯৬৪ সালের ২২ ডিসেম্বর রাতে এই জনপদের ইতিহাসে নেমে আসে এক ভয়াবহ বিপর্যয়। ভারতের ইতিহাসের অন্যতম প্রাণঘাতী ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় ধনুষ্কোডি। সেই দুর্যোগে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। পরবর্তীতে সরকার ধনুষ্কোডিকে মানব বসবাসের জন্য অনুপযুক্ত ঘোষণা করে, আর তারপর থেকেই এটি পরিচিতি পায় ‘ভূতের শহর’ নামে।
ধ্বংসযজ্ঞের পরও অতীতের বহু নিদর্শন আজও টিকে রয়েছে এখানে। দর্শনার্থীরা ঘুরে দেখতে পারেন প্রাচীন একটি গির্জা, পুরনো রেলস্টেশন, বাড়িঘর এবং অন্যান্য পরিত্যক্ত স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ। তবে কোঠান্ডারামস্বামী মন্দির সেই ঘূর্ণিঝড়ের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা পেয়েছিল, আর আজও এটি রামায়ণের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত।
ধনুষ্কোডির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ আরিচাল মুনাই, যেখানে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের (মান্নার উপসাগরের মাধ্যমে) মিলন ঘটে। এই স্থান পর্যন্ত যাওয়ার রাস্তাটিও অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর— দু’পাশে নীল জলরাশি এক অপূর্ব দৃশ্যের সৃষ্টি করে, যা ফটোগ্রাফার এবং রোড ট্রিপপ্রেমীদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয়।
শ্রীলঙ্কা এখান থেকে মাত্র প্রায় ২৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হলেও, বর্তমানে ধনুষ্কোডি থেকে সেখানে যাওয়ার কোনও সরাসরি ফেরি পরিষেবা নেই।
আজকের দিনে ভ্রমণপিপাসুরা এর মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক দৃশ্য, পৌরাণিক গুরুত্ব, রহস্যময় ধ্বংসাবশেষ এবং স্মরণীয় উপকূলীয় সৌন্দর্যের টানে ছুটে আসেন এখানে। এই সবকিছুর সমন্বয়েই ধনুষ্কোডি আজ পরিচিত ভারতের অন্যতম অসাধারণ ও অফবিট পর্যটন গন্তব্য হিসেবে।