মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান শিবিরের প্রত্যাশিত ফল না মেলায় এবার দায় ঠেললেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর সেই দায়ের কেন্দ্রে উঠে এল ইরান যুদ্ধ। নির্বাচনে দলের খারাপ ফলাফলের পিছনে যুদ্ধের প্রভাব ছিল বলে কার্যত স্বীকার করে নিলেন তিনি।তবে নিজের সামরিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিন্দুমাত্র অনুতাপ নেই তাঁর। বরং তাঁর দাবি,সময় যত এগোবে,ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের গুরুত্ব তত বেশি করে বুঝতে পারবেন আমেরিকার মানুষ।অর্থাৎ ভোটের বাক্সে যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়লেও নিজের সিদ্ধান্তকে সঠিক প্রমাণ করতে মরিয়া ট্রাম্প।
ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, নির্বাচনে রিপাবলিকানদের প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়ার পিছনে ইরান যুদ্ধের একটা ভূমিকা ছিল।তাঁর কথায়,আমি মনে করি, এর একটি অংশ ছিল ইরান।একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন,ইরানের বিরুদ্ধে তাঁর পদক্ষেপের গুরুত্বও মানুষ বুঝতে পেরেছে। বিশ্বের অন্যতম সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক দেশকে কোনওভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র রাখতে দেওয়া যায় না বলেও সওয়াল করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। কিন্তু প্রশ্ন হল, জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি দেখিয়ে কোনও সামরিক অভিযান চালানো হলে তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক খেসারত কি এড়ানো সম্ভব?
আসলে যুদ্ধের ময়দানে শক্তি প্রদর্শন আর গণতন্ত্রের ময়দানে জনসমর্থন আদায়, দুটো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। দেশের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক প্রভাব এবং সামরিক আধিপত্য নিয়ে প্রেসিডেন্ট যতই কঠোর অবস্থান নিন না কেন, সাধারণ নাগরিকের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন নিজের সংসার চালানো। জ্বালানির দাম বাড়ছে কি না, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের খরচ কতটা বাড়ল, কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি কী এই হিসাবেই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বের জনপ্রিয়তা বিচার করেন ভোটাররা।ইরান যুদ্ধের জেরে তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়া এবং তার সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে আমেরিকার সাধারণ মানুষের উদ্বেগ তাই অস্বাভাবিক নয়।
নির্বাচনের আগে ইরান যুদ্ধ যে বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছিল, তা স্পষ্ট। ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে সরাসরি যোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন বহু মার্কিন নাগরিক।এমনকী ট্রাম্পের নিজস্ব সমর্থক শিবিরেও এই যুদ্ধ নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ বিরোধীদের সমালোচনা তো ছিলই,পাশাপাশি নিজের রাজনৈতিক ঘাঁটির মধ্যেও যুদ্ধের প্রশ্নে ঐকমত্য ধরে রাখতে পারেননি ট্রাম্প। এখানেই তাঁর রাজনৈতিক কৌশলের বড় ধাক্কা।যে জাতীয়তাবাদী আবেগ এবং শক্তিশালী আমেরিকার স্লোগানকে হাতিয়ার করে তিনি ক্ষমতায় এসেছিলেন সেই একই নীতির প্রয়োগ এবার ভোটের অঙ্কে উল্টো ফল দিয়েছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে নিজের বিস্ময়ের কথাও গোপন করেননি ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্য, তিনি ভেবেছিলেন রিপাবলিকানরা আরও ভালো ফল করবে। নির্বাচনের আগে দলের প্রার্থীদের সমর্থনে প্রায় ৩০টি জনসভা করেছিলেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। তাঁর ধারণা ছিল, জনসভায় বিপুল মানুষের উপস্থিতি ভোটের বাক্সেও প্রতিফলিত হবে। কিন্তু রাজনীতির বাস্তবতা যে মঞ্চের হাততালির সঙ্গে সবসময় মেলে না, নির্বাচনের ফলাফল ফের তা মনে করিয়ে দিল। জনসভায় সমর্থকদের উচ্ছ্বাস আর ব্যালট বাক্সে সাধারণ মানুষের সিদ্ধান্তের মধ্যে যে বিস্তর ফারাক থাকতে পারে, ট্রাম্পের অভিজ্ঞতায় তা আরও একবার স্পষ্ট হল।
অন্যদিকে, নির্বাচনের ফলাফলে ডেমোক্র্যাটদের অগ্রগতি রিপাবলিকান শিবিরের সামনে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমীকরণ তাদের আইন প্রণয়ন এবং প্রশাসনিক পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে। কয়েকজন রিপাবলিকান প্রার্থীর জয় সত্ত্বেও সামগ্রিক ফলাফল নিয়ে যে হতাশা তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কারণ মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু কয়েকটি আসনের লড়াই নয়,এটি ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা, নীতির গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রশাসনের কাজের উপর জনগণের মূল্যায়নও।
তবে নির্বাচনী ধাক্কা সামলে নেওয়ার বদলে ট্রাম্পের পরবর্তী বক্তব্য আরও সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগামী দুই বছর ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণে থাকলে নিজের পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেছেন, তিনি ‘মিস্টার ভিটো’ হয়ে উঠবেন। অর্থাৎ তাঁর কাছে পাঠানো আইনগুলিতে ভেটো প্রয়োগ করবেন।এই মন্তব্যে স্পষ্ট, বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতার রাস্তা কতটা খোলা রাখতে চান তিনি তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।অথচ আমেরিকার মতো শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও প্রশাসনিক কাজকর্ম এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সমঝোতা অত্যন্ত জরুরি।
সবচেয়ে বড় কথা,ইরান যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ট্রাম্পের যুক্তি থাকতেই পারে। কিন্তু সেই যুক্তির গ্রহণযোগ্যতা শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে আমেরিকার জনগণ।দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অবশ্যই রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের নামে অর্থনীতি, জ্বালানির বাজার এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উপর কতটা চাপ তৈরি হচ্ছে তার জবাবও দিতে হবে সরকারকে।যুদ্ধের সাফল্য শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে মাপা যায় না তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিণতিও বিচার করতে হয়।
ট্রাম্প হয়তো মনে করছেন, ইতিহাস একদিন তাঁর ইরান নীতির গুরুত্ব স্বীকার করবে। কিন্তু বর্তমানের ভোটাররা ইতিহাসের অপেক্ষায় বসে নেই। তাঁরা বিচার করছেন আজকের পরিস্থিতি, আজকের খরচ এবং আগামী দিনের নিরাপত্তা। তাই নির্বাচনে ধাক্কা খেয়ে ইরান যুদ্ধকে দায়ী করলেও আসল প্রশ্ন এড়ানোর উপায় নেই যে যুদ্ধকে জাতীয় নিরাপত্তার লড়াই বলে তুলে ধরা হচ্ছে, তার মূল্য যদি শেষ পর্যন্ত সাধারণ মার্কিন নাগরিককেই চোকাতে হয়, তবে সেই যুদ্ধের রাজনৈতিক দায় কে নেবে? ট্রাম্পের সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শুধু ইরান নয়, নিজের দেশের মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধার করা।