
সুমিত্রা সাউ গিরি
কাঁথি,পূর্ব মেদিনীপুর
রুটিনমাফিক শহুরে ব্যস্ত জীবন যখন আমাদের অনুভূতিদের ভোঁতা করে দেয়, হাঁসফাস করা জীবনে মন চায় প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে ,দুদণ্ড শ্বাস নিতে প্রকৃতির কোলেই।শহুরে কোলাহল আর চেনা ব্যস্ততাকে পেছনে ফেলে খারাপ আবহাওয়ার মধ্যেও সেদিন সকালে রওনা দিয়েছিলাম কাকভোরে কাঁথি থেকে। তখনও গন্তব্য তেমনভাবে ভাবা নেই।খড়গপুর হয়ে টাটারোড ধরেই পৌঁছে গেলাম গৌরিকুঞ্জ।নামের মধ্যেই কেমন যেন একটা শান্ত, স্নিগ্ধ আর বনেদিভাব লেগে আছে।শুধু একটি বাড়ি বা বাগান নয়,এ যেন এক টুকরো জীবন্ত ইতিহাস, বাংলা সাহিত্যের এক তীর্থস্থান যা কালের চাকা পেরিয়ে আজও তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।
পথের ধুলোয় যে ইতিহাস লুকিয়ে থাকে, তাকে স্পর্শ করার আনন্দই আলাদা।
‘আরণ্যক’ কিংবা ‘পথের পাঁচালী’র পাতাগুলো ওল্টাতে ওল্টাতে যে মানুষটার কথা ভাবতাম, আজ হুট করেই দাঁড়িয়ে পড়লাম সপরিবারে তাঁরই বসবাড়ির উঠোনে। ঝাড়খণ্ডের ঘাটশিলার এক শান্ত কোণে সুবর্ণরেখা নদীর তীরে লাল টালির এই বাড়িটাই কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রিয় ‘গৌরীকুঞ্জ’।
“ভালোবাসা করুণা নয়
ভালোবাসা সহানুভূতি নয়
এমনকি বন্ধুত্বও নয়
ভালোবাসা শুধুই ভালোবাসা “।
বিয়ের মাত্র একবছরের মাথায় মারা যাওয়া প্রথম স্ত্রী গৌরী দেবীর স্মৃতিতে বিভূতিভূষণ ভালোবেসে নিজের এই নীড়ের নামকরণ করেছিলেন।
ঘাটশিলা থেকে সামান্য দূরে ডাহিগোরার লাল মাটির রাস্তা ‘অপুর পথ ‘ ধরে এসে লোহার গেটটির সামনে দাঁড়াতেই এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া গ্রাস করলো। ভেতরে ঢুকে নিস্তব্ধ বারান্দায় দাঁড়ালে বুকের ভেতর কোথাও একটা উদাস করা সুর বেজে ওঠে। মনে হয়, এই বুঝি ঘরের কোণ থেকে ফ্রক পরা ছোট্ট দুর্গা কিংবা কাশের বনে ট্রেন দেখতে যাওয়া অপু ছুটে আসবে!
বাড়িটি একটি স্মারক সংগ্রহশালা ও পাঠাগার। প্রাঙ্গণে স্থাপন করা হয়েছে লেখকের একটি আবক্ষ মূর্তি, যার সামনে শ্রদ্ধাভরে থমকে দাঁড়াতে হয়।গৌরিকুঞ্জের ফটক পেরিয়ে ভেতরে পা রাখতেই চারপাশের পরিবেশ এক অদ্ভুত শান্ততায় মুড়িয়ে নিল আমাদের। ঘরের মধ্যে স্মৃতিচিহ্ন, পাণ্ডুলিপি, চিঠিপত্র,খবরের কাগজের কাটিং উঠোন জুড়ে নানান চিত্রে যাপনমালা ও পারিবারিক উষ্ণতা,তারা দাস মঞ্চ অপুর পাঠশালা, ভাইয়ের লাগানো আমগাছ মন ছুঁয়ে গেল। রোজ সকাল এটা থেকে নয়টা পর্যন্ত খোলা থাকে।
“স্মৃতিরা কখনো মরে না, তারা কেবল পুরনো ঘরের কোণে, ঝরা পাতার শব্দে আর বাতাসের ফিসফিসানিতে বেঁচে থাকে।”
চারপাশে তাকালে মনে হয়, এই বুঝি বারান্দা দিয়ে কেউ হেঁটে গেলেন, কিংবা ওই জানলার পাশে বসে কেউ কালজয়ী কোনো উপন্যাসের পাতা ওল্টাচ্ছেন। সময় যেন এখানে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। মনে মনে ভাবছিলাম সুবর্ণরেখা নদীর তীরে,ফুলডুংরি টিলার উপরে বসে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতেই অসামান্য সব সৃষ্টি করেছেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, প্রচারের অভাবে অনেক বাঙালি পর্যটক ঘাটশিলায় এলেও এই ঐতিহাসিক স্থলের কথা জানতে পারেন না,গৌরী কুঞ্জ উন্নয়ন সমিতি’র এক কর্মকর্তা জানান। কিছু সাহায্য প্রদান করতেও বলেন। রেজিস্টারে সই করে করতে করতে আলাদা এক অনুভূতি ঘিরে ধরেছিল।
প্রকৃতি যেখানে ইতিহাসের হাত ধরে, সেখানে নীরবতাও কথা বলে ওঠে।”
পুরনো দালানের প্রতিটি কোণ, ঐ আমগাছ, অপুর পাঠশালা চত্বর,কাঠের জানলা, পটচিত্র দিয়ে আঁকা জীবনকাহিনী আর স্মৃতিচিহ্ন যেন এক-একটি গল্পের খসড়া। মনের ভেতর এক অদ্ভুত ভালোলাগা আর নস্টালজিয়া ভিড় করে আসছিল।
এই গৌরীকুঞ্জের সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক তাৎপর্য রয়েছে বৈকি এই প্রযুক্তির যুগেও। সত্যজিৎ রায় বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের “পথের পাঁচালী “কে অস্কার এনে দিয়েছিলেন কিন্তু অপু দুর্গার জন্ম এই ঘাটশিলার জঙ্গলে, ফুলডুংরি টিলা আর সুবর্ণরেখার পাড়ে।
গৌরিকুঞ্জ সেই সৃষ্টির উঠোন।
এই বাড়ি না দেখলে অপু দুর্গা কে,প্রকৃতির মধ্যে বড় হওয়া কি ,অভাবের মধ্যেও কিভাবে স্বপ্ন দেখা যায়-এসব শুধু বই পড়ে বোঝা যায় না।এই প্রজন্মকেও এই বাড়ি,এই স্থান দেখার আগ্ৰহী করার দায়িত্ব আমাদেরই। প্রকৃতির মধ্যে একটা বিরাট শান্তি আছে এই প্রজন্মের কাছে তা অনুপ্রেরণা হোক।
ইচ্ছে করছিলো কিছুক্ষণ থেকে যাই, কিন্তু ফেরার তাড়া তো রয়েইছে। পেছনে ফেলে আসলাম এক টুকরো সোনালী অতীত, আর সাথে নিয়ে চললাম এক বুক শান্তি। তিনি যাতায়াত করতেন যে পথে সেই পথ ধরে এগোতে এগোতে ভাবছিলাম তার কালজয়ী সৃষ্টির কথা।
ভ্রমণ শেষ হয়েও শেষ হয় না, তা বেঁচে থাকে আমাদের মনের মণিকোঠায়,আর ডায়েরির অক্ষরে।