
রণজিৎ দত্ত
পশ্চিম মেদিনীপুর
‘Rustic Woodland Beauty’ কথাটা বোধহয় ইউনেস্কো স্বীকৃত আড়াবাড়ী সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে চিরতরে হারিয়ে যেতে বসেছে।
মেদিনীপুর শহর থেকে এনএইচ – ৬০(এনএইচ -১৪) ধরে বাঁকুড়া অভিমুখে ৩০ কিমি এগোলে যে বনভূমিতে প্রবেশ করলেই প্রাণভরে শ্বাস নেওয়া যেত …. তা এখন পূতিগন্ধময় !
জঙ্গলের অগভীরে আকছার পোল্ট্রি মুরগি ফার্ম গড়ে উঠেছে….
প্রায় দিনই দেখা যাচ্ছে গৃহস্থের সেপটিক ট্যাংক থেকে অর্ধতরল নরবর নিয়ে গিয়ে সাফাইকারীরা জঙ্গলে ঢেলে দিচ্ছে।
অবিক্রীত, অখাদ্য ফলের অর্ধপচন যুক্ত অংশগুলি গাড়ি গাড়ি নিয়ে গিয়ে ঢালা হচ্ছে আড়াবাড়ী বনাঞ্চলে।
প্লাস্টিক ,ইলেকট্রিক এবং ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রের অপচনশীল অংশগুলি ফেলার জায়গা হিসেবেও এখন বেছে নেওয়া হচ্ছে আড়াবাড়ি বনাঞ্চল কে।
বলার কেউ নেই।
বাধা দেবার কেউ নেই।
আর বলাবাহুল্য, সেজন্যই বোধহয় অবাধে চলছে জঙ্গলের প্রাকৃতিক গন্ধ নষ্ট করে …. স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করে তাকে আস্তাকুড়ে পরিণত করার কাজ।
স্বাভাবিক দিনগুলোতে দুর্গন্ধের মাত্রা সহনসীমার মাত্রা ছাড়িয়ে না গেলেও,এক পশলা বৃষ্টি হবার পর পোল্ট্রি ফার্ম গুলোর থেকে যে “সৌরভ ” (?) সারা জঙ্গলময় ম ম করে তা পেটের খাবার বমন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বেরিয়ে আসার পক্ষে যথেষ্ট !
ড: অজিত ব্যানার্জী, আইএফএস….
যার স্বপ্ন প্রকল্প ছিল এই আড়াবাড়ি সোশ্যাল ফরেস্ট্রি …
যার হাত ধরে এই বনাঞ্চল পেয়েছিল আন্তর্জাতিক “পল গেট্টি ” পুরস্কার …
ইউনেস্কো দ্বারা স্বীকৃত হয়েছিল
” আড়াবাড়ি সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসেবে…
১৯৭২ সালে ১২৭২ হেক্টর কোর এলাকা নিয়ে শুরু হয়ে যার বর্তমান কলেবর আজ প্রায় ৭৬০২ হেক্টর ….
যা মূলতঃ শালগাছের জঙ্গল ….
যা পার্শ্ববর্তী ১১টি ….
চাঁদমুড়া,সাতশোল, মাঝিগড়,শাঁকরই,
সাফাডিহা, গুঁতামারা,সখিশোল ঘুঁচিশোল
উরামি ,জোড়াকেউদি এবং মহিষডুবি গ্রামের প্রত্যেক পরিবারের সক্রিয় সহযোগিতায় নতুন করে বেঁচে উঠেছিল ….
জয়েন্ট ফরেস্ট ম্যানেজমেন্ট এর মাধ্যমে যা সৃষ্টি হয়েছিল তৎকালীন ডিভিশনাল বনাধিকারিক ড: অজিত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সুবিমল রায় মহাশয়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় …
তা আজ দুর্গন্ধের ভাগীদার।
স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন আসে ….
১৯৮৭ সালে যে বনাঞ্চল ছিল পার্শ্ববর্তী ১১ গ্রামের মানুষের চোখের মণি …
যে জঙ্গল রক্ষা করে,সৃজন করে তাঁরা বিশ্বে প্রথম জেএফএম চালু করতে বিশ্ব সংস্থা কে বাধ্য করেছিল…
যা বর্তমানে পাঠ্য বইয়ের অন্তর্ভুক্ত …
যেখানে প্রতি বছর বিজ্ঞানের ছাত্র ছাত্রীরা এক্সকার্সনে আসে …
যেখানে নিয়মিত সিলভিকালচার( উদ্যান বিষয়ক বিদ্যা ) গবেষণা চলছে…
কেন সেটা আস্তাকুড়ে পরিণত হতে যাবে?
মুখ যেমন মনের আয়না ….
রাজপথ পার্শ্ববর্তী জঙ্গলও তেমনি পর্যটকদের কাছে প্রাথমিক ধারণা সৃষ্টিকারী ….
যে বনাঞ্চলের প্রবেশ পথে স্বাগত তোরণে লেখা ….”আপনি সংরক্ষিত আড়াবাড়ী বনাঞ্চলে প্রবেশ করছেন…”
যা দেখেই গাড়ির কাঁচখুলে নির্মল হাওয়ায় প্রাণ ভরে শ্বাস নিত মানুষ …
বুনো গন্ধ ভেসে আসতো বাতাসে…
যে জঙ্গলে গাড়ি থামিয়ে দু দণ্ড জিরিয়ে নিত শহুরে মানুষ ….
কখনও হরিৎ, কখনও হরিদ্রাভ ,ঋজু সুঠাম শাল বনানীর মাঝে “শালবনী” নামের স্বার্থকতা খুঁজে পেত ‘ইট কাঠ কংক্রিটের ” স্তুপ থেকে বেরিয়ে আসা মানুষ ….
বলতে পারেন কেন সে জঙ্গল আজ দুর্গন্ধের আস্তাকুড় হবে?
কেন জঙ্গলের পথে নাক চেপে দুর্গন্ধের চোটে ছুটে জঙ্গল পেরোতে বাধ্য হবে মানুষ ?
উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কি এখনও বোবা, কালা হয়ে থাকবেন ?
এভাবেই ডক্টর ব্যানার্জি সহ ১১ টি গ্রামের মানুষের “স্বপ্ন প্রকল্প ” চোখের সামনে আস্তাকুড়ে পরিণত হবে?
কিছুই কি করার নেই?
আড়াবাড়ি বনাঞ্চল কর্তৃপক্ষ একটু নড়েচড়ে বসবেন নাকি?
জনপ্রতিনিধির নামে যা ইচ্ছে অভিযোগ করা যায় না!তাপসকে আইনি নোটিশ সায়নীর