অসমে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে এবার আর কথার লড়াই নয়, সরাসরি আইনের কঠোর আঘাত! ৫৫৭ জন গ্রেফতার, ৪৭৬টি মামলা-মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সরকারের এই অভিযান স্পষ্ট করে দিয়েছে, সামাজিক কুপ্রথার আড়ালে অপরাধ করে পার পাওয়ার দিন শেষ হওয়া উচিত।তাঁর সাফ হুঁশিয়ারি,অসম থেকে বাল্যবিবাহ সম্পূর্ণ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত অভিযান থামবে না।এই ঘোষণার তাৎপর্য এখানেই একটি শিশুর ভবিষ্যৎকে বলি দিয়ে সমাজের কোনও কুপ্রথাই চিরকাল টিকে থাকতে পারে না।প্রশ্ন হল,যে বয়সে হাতে বই থাকার কথা, সেই বয়সে কেন বিয়ের বোঝা চাপবে কিশোরীর কাঁধে?
প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি অভিযানে এখনও পর্যন্ত ৪৭৬টি মামলা দায়ের হয়েছে এবং ৫৫৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ২০২৪ সালে গোটা অভিযানে যেখানে ৩৬৩টি মামলা হয়েছিল এবং ৪৩২ জন গ্রেফতার হয়েছিলেন সেখানে এবার প্রাথমিক পর্বেই সেই পরিসংখ্যান ছাপিয়ে গিয়েছে। মামলা বেড়েছে ১১৩টি, গ্রেফতারির সংখ্যা বেড়েছে ১২৫। এই পরিসংখ্যান নিছক সংখ্যা নয়, বরং প্রশাসনিক সক্রিয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। তবে আসল লড়াই শুধু গ্রেফতারির হিসাব বাড়ানো নয়, বরং এমন পরিস্থিতি তৈরি করা যেখানে কোনও পরিবার বাল্যবিবাহের কথা ভাবার আগেই আইনের ভয় এবং সামাজিক সচেতনতা তাকে থামিয়ে দেয়।
বাল্যবিবাহ কোনও নিরীহ পারিবারিক প্রথা নয় এটি শিশুর অধিকার হরণের নির্মম বাস্তবতা। অল্প বয়সে বিয়ে মানে শিক্ষার দরজা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা, অকাল মাতৃত্বের ঝুঁকি, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিপর্যয় এবং স্বনির্ভর হওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাওয়া। যে সমাজ কন্যাসন্তানের হাতে বই তুলে দেওয়ার বদলে বিয়ের সাজ তুলে দেয়, সেই সমাজ আসলে নিজের ভবিষ্যৎকেই অন্ধকারে ঠেলে দেয়। দারিদ্র্য, কুসংস্কার কিংবা সামাজিক চাপ কোনও অজুহাতেই একটি শিশুর শৈশব কেড়ে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। আইন যদি এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর হয় তবে তাকে দুর্বলতা নয়, ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবেই দেখা উচিত।
অসম সরকারের দাবি, ২০২১-২২ থেকে ২০২৩-২৪ সালের মধ্যে ২০টি জেলার ১,১৩২টি গ্রামে পর্যালোচনায় বাল্যবিবাহের ঘটনা প্রায় ৮১ শতাংশ কমেছে। এই পরিসংখ্যান আশার আলো দেখায়। কিন্তু আত্মতুষ্টির কোনও জায়গা নেই।কারণ,যে কুপ্রথা দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক মানসিকতার মধ্যে শিকড় গেড়েছে,তাকে কয়েক দফা পুলিশি অভিযানেই উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়। গ্রেফতারির পাশাপাশি প্রয়োজন দ্রুত বিচার, নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগী শিশুদের সুরক্ষা এবং পরিবারগুলির পুনর্বাসনের ব্যবস্থা। একই সঙ্গে স্কুলছুট মেয়েদের শিক্ষায় ফেরানো, দরিদ্র পরিবারকে সহায়তা দেওয়া এবং গ্রামস্তরে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। আইন প্রয়োগের কঠোরতা ও সামাজিক সংস্কারের ধারাবাহিকতা দুটিকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট অভিযান যেন কেবল প্রচারের হাতিয়ার হয়ে না থাকে। অপরাধের অভিযোগ উঠলে যথাযথ তদন্ত হোক, দোষ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি হোক এবং কোনও নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন। প্রশাসনের সাফল্য মাপা উচিত শুধু কতজন গ্রেফতার হলেন তা দিয়ে নয়,কতজন শিশুকে বাল্যবিবাহের হাত থেকে রক্ষা করা গেল, কতজন কিশোরী স্কুলে ফিরল এবং কত পরিবার এই কুপ্রথা থেকে বেরিয়ে এল তার ভিত্তিতেও।
হিমন্ত বিশ্ব শর্মার হুঙ্কার তখনই সার্থক হবে, যখন অসমের প্রতিটি কন্যাশিশু নির্ভয়ে স্কুলে যেতে পারবে, নিজের ভবিষ্যৎ নিজে গড়ার সুযোগ পাবে এবং বিয়ের সিদ্ধান্ত তার শৈশবকে গ্রাস করবে না। বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে লড়াই কোনও রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের বিষয় নয়, এটি মানবিকতা, ন্যায়বিচার এবং আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করার লড়াই। শিশুর হাতে বই, কলম ও স্বপ্ন থাকুক-বাল্যবিবাহের শিকল নয়। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে অভিযান থামার নয়, থামা উচিতও নয়।
বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সচেতনতার চাকা ঘুরছে! ১২ দিন ধরে জেলাজুড়ে প্রচার গাড়ি