নয়া জামানা,বাঁকুড়া : স্কুলের বেহাল দশা নিয়ে প্রশ্ন তোলার ‘মাশুল’ দিতে হল এক পরিবারকে— এমনই অভিযোগ উঠল বাঁকুড়ার ইন্দাস থানার করিশুন্ডা গ্রামে। হামলায় প্রাণ হারালেন শেখ মহম্মদ মাফিক নামে এক প্রৌঢ়। অভিযোগের আঙুল উঠেছে বিজেপির দিকে, যদিও রবিবার নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সরাসরি সেই অভিযোগ খারিজ করে দিয়েছেন।
করিশুন্ডা গ্রামের বাসিন্দা শেখ আবদুল হাফিজ গত ১৯ জুলাই দিল্লিতে যান ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) একটি কর্মসূচিতে যোগ দিতে। অভিযোগ, পরদিন ২০ জুলাই রাজীব চকে তাঁকে আটকে দেয় পুলিশ, লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাসের মুখেও পড়তে হয় তাঁকে। ২৭ জুলাই গ্রামে ফেরার পরও হাফিজ সিজেপির পরবর্তী আন্দোলনগুলির সঙ্গে যুক্ত থাকেন। অভিযোগ, তখন থেকেই বিজেপির তরফে তাঁকে লাগাতার হুমকি দেওয়া হচ্ছিল, এমনকি ৯ অগস্ট তাঁকে মারধরের হুমকিও দেওয়া হয় বলে দাবি।
দেশের স্কুলগুলির উন্নয়ন নিয়ে সিজেপির আন্দোলনের অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার করিশুন্ডা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অব্যবস্থা নিয়ে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলেন হাফিজ। প্রশাসনের কাছে বিষয়টি তুলে ধরার উদ্দেশ্যে স্কুলের বেহাল অবস্থার ভিডিও তুলে রাখেন তিনি। অভিযোগ, সেই রাতেই বিজেপির লোকজন তাঁর বাড়িতে হামলা চালায়, হাফিজকে মারধর করে ফোন কেড়ে নিয়ে ভিডিও-ছবি মুছে দেওয়া হয়। ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে মারধরের শিকার হন বাবা শেখ মহম্মদ মাফিকও। হামলাকারীরা হুমকি দেয়, ছেলেকে না পেরে বাবাকেই মারধর করা হবে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ১৪ আগস্ট হাফিজের বাড়ি কার্যত ঘিরে রাখা হয় এবং পরিবারটি গৃহবন্দি অবস্থায় থাকতে বাধ্য হয়। সেই রাতেই ৫১ বছর বয়সি মাফিকের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে পুলিশি সহযোগিতায় তাঁকে প্রথমে ইন্দাস হাসপাতাল ও পরে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানে সন্ধ্যা নাগাদ তাঁর মৃত্যু হয়। খবর ছড়িয়ে পড়তেই রবিবার সকাল থেকে গ্রামে ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয়। প্রতিবেশীরাও বিজেপির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে দাবি করেছেন, এই মৃত্যুর নেপথ্যে বিজেপির হাত রয়েছে।
খবর পেয়ে রবিবার দুপুরে বর্ধমান মেডিক্যালে গিয়ে হাফিজের সঙ্গে দেখা করেন সিজেপির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা দেদীপ্য গঙ্গোপাধ্যায়। ময়নাতদন্তের সময়ও তিনি হাফিজের পাশে ছিলেন। দেদীপ্য বলেন, ‘‘হাফিজ আমাদের সদস্য। স্কুলের অব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল বলেই হামলা করা হয়েছে। তাতে হাফিজের বাবা মারা গিয়েছেন, হাফিজও জখম হয়েছেন। যাঁরা এই কাজে যুক্ত, তাদের ঘুম উড়িয়ে দেব। বিজেপিরও ঘুম উড়িয়ে দেব। শিক্ষার অব্যবস্থা নিয়ে আমরা প্রশ্ন তুলবই।’’ সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপ সোশাল মিডিয়ায় জানিয়েছেন, দলের প্রতিনিধিদল শিগগিরই বাঁকুড়ায় গিয়ে হাফিজের পাশে দাঁড়াবে।
এই ঘটনায় বিজেপির যোগসাজশের অভিযোগ প্রসঙ্গে রবিবার নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে প্রশ্নের মুখে পড়েন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, ‘‘যে ৫ জনের বিরুদ্ধে এফআইআর হয়েছে, তাদের ৩ জন ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার। বাকিদেরও করা হবে। এখানে বিজেপির কোনও ব্যাপার নেই। এরা সবাই দুষ্কৃতী। এরা বিজেপির, সেটা কে বলল? রাজ্যে আইনের শাসন চলছে, সব ঘটনায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’
একই সুরে রাজ্যের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল বলেন, ‘‘বিজেপির কার্যকর্তারা জড়িত মানে কী? কোনও কার্যকর্তা এরকম কিছু করে থাকলে পুলিশ তাদের বিজেপি বলে বাদ দেবে না, নিশ্চয়ই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’
আপাতত পুলিশি হেফাজতে তিন অভিযুক্ত। বাকিদের খোঁজে তল্লাশি চলছে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হামলার প্রকৃত কারণ ও দায় নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা।
স্কুলের জমিতে তৃণমূলের কার্যালয়, ৯ বছর পর পুনরুদ্ধার করে শুরু ক্লাস