তারিক আনোয়ার,নয়া জামানা,সিউড়ি: ২০১৭ সালে স্কুলের ৭ শতক জমি দখল করে দলীয় কার্যালয় তৈরির অভিযোগ। প্রতিবাদ করতে না পেরে পরিচালন সমিতির রেজুলেশনে লেখা হয়েছিল—জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে লড়াই করা যাবে না। সঙ্গে ছিল ভবিষ্যতের অঙ্গীকার—সময় হলেই স্কুলের সম্পত্তি ফিরিয়ে নেওয়া হবে। রাজনৈতিক পালাবদলের পর প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় বিদ্যালয়ের দখলে ফিরল ভবন। যে ঘরে একসময় চলত রাজনৈতিক বৈঠক, সেখানে এখন বসছে ছাত্রছাত্রীদের ক্লাস। ঘটনাকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি দাবি-অভিযোগে উত্তপ্ত রাজনৈতিক মহল।
বীরভূমের সাঁইথিয়া বিধানসভার সিউড়ি–২ ব্লকের পুরন্দরপুর হাইস্কুলকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। বিদ্যালয় সূত্রের দাবি, জমিদাতারা স্কুলের জন্য ৩৪ শতক জমি দান করেছিলেন। ২০১৭ সালে সেই জমির মধ্যে প্রায় ৭ শতক জায়গা তৎকালীন তৃণমূল নেতৃত্ব দখল করে সেখানে দোতলা দলীয় কার্যালয় নির্মাণ করে। সে সময় রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ সম্ভব না হলেও পরিচালন সমিতির রেজুলেশনে লেখা হয়েছিল, জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে লড়াই করা যাবে না। একই সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছিল, সুযোগ এলে বিদ্যালয়ের সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করা হবে।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিডিও ও ভূমি দফতরের কাছে আবেদন করে। পরে স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকদের সহযোগিতায় ভবনটি বিদ্যালয়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়। অতিরিক্ত শ্রেণিকক্ষের অভাব মেটাতে সেই ভবনেই শুরু হয়েছে পঠন-পাঠন। সোমবার দেখা যায়, যে ঘরে এতদিন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চলত, সেখানে এখন শিক্ষক পাঠদান করছেন এবং ছাত্রছাত্রীরা নিয়মিত ক্লাস করছে।
স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক শান্তনু আচার্য বলেন, জমিদাতারা ৩৪ শতক জমি স্কুলকে দান করেছিলেন। কিন্তু ২০১৭ সালে তৃণমূল জোর করে সেই জায়গা দখল করে পার্টি অফিস বানায়। তখন আমরা রেজুলেশনে লিখেছিলাম, ‘জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে লড়াই করলে চলবে না।’ একই সঙ্গে লিখেছিলাম, সরকার পরিবর্তন হলে জায়গা ফিরিয়ে নেওয়া হবে। সরকার পরিবর্তনের পর আমরা বিডিও ও ভূমি দফতরে আবেদন করি। বর্তমানে ভবনটি স্কুলের দখলে এসেছে।আমাদের স্কুলে ১,৯৬২ জন ছাত্রছাত্রী রয়েছে। শ্রেণিকক্ষের অভাব ছিল। এই ঘরগুলি পাওয়ায় ছাত্রছাত্রীদের অনেক সুবিধা হবে।স্থানীয়দের একাংশের দাবি, দোতলা ভবনটির নিচতলায় দলীয় কর্মীদের বৈঠকের ব্যবস্থা এবং দ্বিতীয় তলায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ ছিল। বিজেপির অভিযোগ, ভবনটি বিদ্যালয়ের দখলে আসার পর সেখান থেকে মহিলাদের ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রীও উদ্ধার হয়েছে। তবে এই দাবির স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বিজেপির বীরভূম সাংগঠনিক জেলা সভাপতি উদয় শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, তৃণমূল সারা রাজ্যেই এভাবে জায়গা দখল করেছে। পুরন্দরপুর স্কুলের জমিতেও একইভাবে পার্টি অফিস তৈরি করা হয়েছিল। স্কুল কর্তৃপক্ষকে আমরা সাধুবাদ জানাই ভবনটি পুনরুদ্ধার করার জন্য। ওই ভবনে তৃণমূল নেতারা ফুর্তি করতেন। এটাই ওদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি।অন্যদিকে, সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন তৃণমূলের সিউড়ি–২ নম্বর ব্লকের প্রাক্তন সভাপতি নুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ওই জায়গা আমরা কিনেছিলাম। স্কুল কর্তৃপক্ষ অনৈতিকভাবে পার্টি অফিস দখল করেছে। আমরা যদি জোর করে জায়গা দখল করে থাকতাম, তাহলে স্কুল কর্তৃপক্ষ তখনই আইনের দ্বারস্থ হয়নি কেন? এই ঘটনার বিরুদ্ধে আমরাও আইনের দ্বারস্থ হব।
ফলে পুরন্দরপুর হাইস্কুলের জমি ঘিরে বিরোধ এখন নতুন রাজনৈতিক ও আইনি মাত্রা পেয়েছে। একদিকে স্কুল কর্তৃপক্ষ ও বিজেপির দাবি, বিদ্যালয়ের দান করা জমি দীর্ঘদিন দলীয় কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। অন্যদিকে তৃণমূলের দাবি, জমিটি বৈধভাবে কেনা হয়েছিল এবং পার্টি অফিসের দখল নেওয়া হয়েছে অনৈতিকভাবে। এখন এই বিতর্কের নিষ্পত্তি শেষ পর্যন্ত আইনি লড়াইয়ের দিকেই গড়াতে পারে।
নিরাপত্তাহীনতায় স্কুল, রান্নাঘর থেকে উধাও মিড-ডে মিলের সামগ্রী