প্রদীপ কুন্ডু ৷৷ নয়া জামানা ৷৷ কোচবিহার: উত্তরবঙ্গের সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবায় নতুন করে নজির গড়ল তুফানগঞ্জ মহকুমা হাসপাতাল। এক বিরল ও জটিল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এক মহিলার গলব্লাডার থেকে ৪০টিরও বেশি পাথর সফলভাবে বের করে আনলেন হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। এই সাফল্যে গোটা মহকুমার স্বাস্থ্য মহলে খুশির হাওয়া। রোগী বর্তমানে সুস্থ আছেন এবং চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, তুফানগঞ্জ মহকুমার বাসিন্দা উজ্জ্বলা দাস, বয়স ৪৭ বছর। গত কয়েক মাস ধরে তিনি তীব্র পেটের যন্ত্রণা, বমি ভাব এবং হজমের সমস্যায় ভুগছিলেন। স্থানীয় চিকিৎসকদের কাছে চিকিৎসা করিয়েও কোনও স্থায়ী সমাধান মেলেনি। ব্যথা ক্রমশ বাড়তে থাকায় অবশেষে পরিবারের লোকজন তাঁকে তুফানগঞ্জ মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে আসেন।
হাসপাতালে আসার পর কর্তব্যরত চিকিৎসকরা প্রথমে তাঁর শারীরিক পরীক্ষা করেন। পেটের ব্যথার কারণ সঠিকভাবে নির্ণয় করতে দ্রুত আল্ট্রাসোনোগ্রাফির পরামর্শ দেওয়া হয়। রিপোর্ট হাতে আসতেই চিকিৎসকরা হতবাক। রিপোর্টে স্পষ্ট দেখা যায় উজ্জ্বলা দেবীর পিত্তথলি অর্থাৎ গলব্লাডার পাথরে ভরে গেছে। সংখ্যাটা ৪০টিরও বেশি। চিকিৎসকদের মতে, এত সংখ্যক পাথর একসঙ্গে গলব্লাডারে থাকা অত্যন্ত বিরল ঘটনা।
রিপোর্ট দেখার পরই হাসপাতালের শল্যচিকিৎসা বিভাগের প্রধান ডা. সম্বরণ ঘোষের নেতৃত্বে দ্রুত একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। রোগীর শারীরিক অবস্থা, বয়স এবং পাথরের সংখ্যা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় দ্রুত অস্ত্রোপচার করতেই হবে। নইলে পিত্তথলি ফেটে যাওয়া বা সংক্রমণের মতো বড় ঝুঁকি ছিল।
গত ১৬ জুলাই সকালেই হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে উজ্জ্বলা দেবীর অস্ত্রোপচার শুরু হয়। অস্ত্রোপচারের জন্য বেছে নেওয়া হয় ‘ওপেন কোলেসিস্টেক্টমি’ পদ্ধতি। ল্যাপারোস্কোপির মাধ্যমে এত সংখ্যক পাথর বের করা সম্ভব ছিল না, তাই পেট কেটে সরাসরি গলব্লাডার বের করে আনার সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকরা।
অস্ত্রোপচারকারী দলের নেতৃত্বে ছিলেন ডা. সম্বরণ ঘোষ। তাঁকে সহযোগিতা করেন অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট ডা. সৈকত কুন্ডু। অপারেশন থিয়েটারের দায়িত্বে ছিলেন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট শুভঙ্কর মজুমদার। সঙ্গে ছিলেন অভিজ্ঞ স্টাফ নার্স দীপালি মণ্ডল ও লাবণ্য সরকার। ওটি সহায়তা কর্মী হিসেবে ছিলেন আজিজুল রহমান। গোটা দল প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেন।
ডা. সম্বরণ ঘোষ জানান, রোগীর গলব্লাডারের ভিতরে ছোট-বড় মিলিয়ে ৪০টির বেশি পাথর ছিল। কিছু পাথর আবার একে অপরের সঙ্গে জুড়ে বড় আকার ধারণ করেছিল। এ কারণে অস্ত্রোপচারটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তবে আমাদের টিমের সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং সঠিক পরিকল্পনার কারণে অস্ত্রোপচারটি সম্পূর্ণ সফল হয়েছে।
অস্ত্রোপচারের পর রোগীকে পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে রাখা হয়। প্রথম ২৪ ঘণ্টা তাঁকে কড়া নজরদারিতে রাখেন চিকিৎসক ও নার্সরা। বর্তমানে উজ্জ্বলা দেবীর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। তিনি স্বাভাবিক খাবার খেতে পারছেন এবং ব্যথাও অনেকটাই কমেছে। চিকিৎসকরা আরও কয়েকদিন তাঁকে পর্যবেক্ষণে রাখার পর ছুটি দেওয়ার কথা ভাবছেন।
এই সফল অস্ত্রোপচারের খবর পেয়ে হাসপাতালে আসেন কোচবিহারের অতিরিক্ত মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক-১ ডা. শচীন্দ্রনাথ সরকার। তিনি গোটা টিমের সঙ্গে কথা বলেন এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন। তিনি বলেন, তুফানগঞ্জ মহকুমা হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা যে দক্ষতা ও নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন তা সত্যিই প্রশংসনীয়। এত ঝুঁকিপূর্ণ একটি অস্ত্রোপচার সরকারি হাসপাতালে সফলভাবে করা নিঃসন্দেহে বড় সাফল্য। আমি গোটা টিমকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।
স্থানীয় বাসিন্দারাও এই সাফল্যে খুশি। উজ্জ্বলা দেবীর পরিবারের সদস্যরা বলেন, আমরা ভেবেছিলাম বড় শহরের নার্সিংহোমে যেতে হবে। কিন্তু তুফানগঞ্জ হাসপাতালের ডাক্তারবাবুরা বিনা খরচে এত বড় অপারেশন করে দিলেন। আমরা তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ।
স্বাস্থ্য দপ্তরের আধিকারিকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে তুফানগঞ্জ মহকুমা হাসপাতালে পরিকাঠামো ও চিকিৎসক সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও আধুনিক যন্ত্রপাতির কারণেই এখন জটিল অস্ত্রোপচারও এখানে সম্ভব হচ্ছে। এর ফলে রোগীদের আর কোচবিহার বা শিলিগুড়ি ছুটতে হচ্ছে না।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী দিনে আরও উন্নত পরিষেবা দেওয়ার লক্ষ্যে নতুন ওটি এবং আইসিইউ-এর পরিকল্পনা রয়েছে। এই সাফল্য সেই লক্ষ্যের দিকে আরও একধাপ এগিয়ে দিল।
চিকিৎসকরা রোগীদের পরামর্শ দিয়েছেন, পেটের যন্ত্রণা বা হজমের সমস্যাকে অবহেলা না করতে। সময়মতো পরীক্ষা করালে অনেক বড় সমস্যা এড়ানো সম্ভব।
উজ্জ্বলা দেবীর এই সফল অস্ত্রোপচার শুধু একজন রোগীর নতুন জীবন ফিরিয়ে দেওয়া নয়, এটি সরকারি হাসপাতালের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও বাড়িয়ে দিল। তুফানগঞ্জ মহকুমা হাসপাতালের এই কৃতিত্ব উত্তরবঙ্গের স্বাস্থ্য পরিষেবার মানচিত্রে নতুন দিগন্ত খুলে দিল বলেই মনে করছেন চিকিৎসা মহল।