নয়া জামানা ডেস্ক : ভোটের দামামা বাজার ঠিক কয়েক মিনিট আগেই বড়সড় চমক দিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দীর্ঘ টালবাহানার পর অবশেষে রাজ্য সরকারি কর্মীদের বহু প্রতীক্ষিত বকেয়া মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) মেটানোর কথা ঘোষণা করলেন তিনি। রবিবার বিকেলে দিল্লির বিজ্ঞান ভবন থেকে নির্বাচন কমিশন বিধানসভা ভোটের নির্ঘণ্ট প্রকাশের মাত্র কয়েক মিনিট আগে সমাজমাধ্যমে এই ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। জানা গিয়েছে, রোপা-২০০৯ কাঠামো অনুযায়ী বকেয়া এই ডিএ ২০২৬ সালের মার্চ মাস থেকেই পেতে শুরু করবেন রাজ্যের লক্ষ লক্ষ কর্মচারী ও পেনশনভোগীরা।
মুখ্যমন্ত্রী তাঁর পোস্টে স্পষ্ট করেছেন, মা-মাটি-মানুষের সরকার শিক্ষক, শিক্ষাকর্মী, পুরসভা ও পঞ্চায়েত কর্মী থেকে শুরু করে সকলের প্রতি দেওয়া কথা রেখেছে। রাজ্য অর্থ দফতর ইতিমধ্যেই এই অর্থ প্রদানের পদ্ধতি ও সময়সূচি নির্দিষ্ট করে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। মূলত সুপ্রিম কোর্টের কড়া অবস্থান এবং আইনি লড়াইয়ের পর রাজ্যের এই পিছু হটা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে প্রশাসনিক মহল। উল্লেখ্য, শীর্ষ আদালত আগেই নির্দেশ দিয়েছিল বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ অবিলম্বে মিটিয়ে দিতে হবে। বাকি টাকা মেটানোর রূপরেখা গড়তে আদালত একটি বিশেষ কমিটিও গড়ে দেয়। রাজ্য সরকার ডিসেম্বরের সময়সীমা চেয়ে আবেদন জানালেও, ভোটের ঠিক মুখে ডিএ প্রদানের এই ঘোষণা রাজনৈতিক মহলে শোরগোল ফেলে দিয়েছে।
প্রসঙ্গত,রাজ্যে ডিএ আন্দোলন দীর্ঘদিনের। কেন্দ্রীয় হারে মহার্ঘ ভাতার দাবিতে সরব সরকারি কর্মীদের এই লড়াই আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। ২০২২ সালে কলকাতা হাই কোর্ট রায় দিয়েছিল, ডিএ কর্মীদের মৌলিক অধিকার। সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে রাজ্য সুপ্রিম কোর্টে গেলেও সুবিধা হয়নি। শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের চাপে পড়েই কি এই সিদ্ধান্ত? বামপন্থী কো-অর্ডিনেশন কমিটির নেতা বিশ্বজিৎ গুপ্ত চৌধুরী সরাসরি বলছেন, ‘গত ১৩ মার্চ আমরা রাজ্য জুড়ে কর্মবিরতি পালন করেছিলাম। সেই আন্দোলনের ফলেই রাজ্য সরকার চাপে পড়ে আমাদের ডিএ দিতে বাধ্য হয়েছে।’
অন্যদিকে, এই ঘোষণাকে ‘নির্বাচনী গিমিক’ বলে তোপ দেগেছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তিনি সমাজমাধ্যমে তীব্র আক্রমণ শানিয়ে লিখেছেন, ‘কী ভয়ঙ্কর প্রহসন! নির্বাচন কমিশন ভোটের দিন ঘোষণা করার ঠিক কয়েক মিনিট আগে হঠাৎ করে লক্ষ লক্ষ সরকারি কর্মচারী, পেনশনভোগী, শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীদের কথা মনে পড়ল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের? রোপা ২০০৯ অনুযায়ী বকেয়া ডিএ ২০২৬-এর মার্চ থেকে দেওয়া হবে? বছরের পর বছর রাজ্যের কোষাগার লুট করার পর, কর্মচারীদের সঙ্গে প্রতারণা করার পর এটা আপনার শেষ মুহূর্তের মরিয়া রাজনৈতিক কৌশল।’ শুভেন্দুর দাবি, এটি মানুষকে বোকা বানানোর একটি বিজ্ঞপ্তিমাত্র।
মুখ্যমন্ত্রীর এই পদক্ষেপকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে তৃণমূল সমর্থিত সরকারি কর্মচারী ফেডারেশন। সংগঠনের আহ্বায়ক প্রতাপ নায়েক বলেন, ‘আমরা বরাবর বলে এসেছি, সময়-সুযোগ পেলে অবশ্যই সরকারি কর্মচারীদের দাবিদাওয়া মুখ্যমন্ত্রী মিটিয়ে দেবেন। তাই সব দাবি তিনি মেনে নিয়েছেন। আমরা তাঁর উপর আস্থা রেখে যে সঠিক কাজ করেছিলাম, তা আবার প্রমাণ হয়ে গেল।’ পাল্টা সুর চড়িয়েছে সংগ্রামী যৌথ মঞ্চও। সংগঠনের আহ্বায়ক ভাস্কর ঘোষের মতে, ১৩ মার্চের সফল ধর্মঘটের চাপেই নতিস্বীকার করতে হয়েছে সরকারকে। বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির নেতা স্বপন মন্ডলও মনে করেন, সরকার আগে কেবল সরকারি কর্মীদের কথা বললেও আন্দোলনের চাপে শিক্ষক ও বোর্ড-করপোরেশনের কর্মীদেরও এই সুবিধায় অন্তর্ভুক্ত করতে বাধ্য হয়েছে। সব মিলিয়ে, বকেয়া ডিএ-র এই কিস্তি মেটানোর সিদ্ধান্ত এখন ভোটের উত্তাপে নতুন ঘি ঢালল ।