নয়া জামানা ডেস্ক : দু’দফার ভোটযুদ্ধ শেষ। নবান্নের চাবিকাঠি কার হাতে যাবে, তা এখন বন্দি ইভিএমে। আগামী ৪ মে ফলপ্রকাশের আগেই রাজ্য রাজনীতিতে পারদ চড়ছে বিভিন্ন সংস্থার বুথফেরত সমীক্ষা বা এগজিট পোল ঘিরে। অধিকাংশ সমীক্ষাই ইঙ্গিত দিচ্ছে ‘পরিবর্তন’-এর। ২৯৪ আসনের বিধানসভায় ম্যাজিক ফিগার ১৪৮ পেরিয়ে বিজেপি এ বার সরকার গড়তে পারে বলে দাবি করছে বেশ কিছু সমীক্ষক সংস্থা। তবে পাল্টা ঘাসফুলের জয়ের পূর্বাভাসও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এখন প্রশ্ন উঠছে, বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বরা প্রথম থেকেই দাবি করছিল, অঙ্গ কলিঙ্গ জয় হয়েছে এবার বঙ্গম জয় করবে। বুথ ফেরত সমীক্ষায় তারই আভাস পাওয়া যাচ্ছে যে বিজেপি এবার বঙ্গ জয় করতে চলেছে । সব মিলিয়ে গোটা বাংলা এখন ‘হাড্ডাহাড্ডি’ লড়াইয়ের সাক্ষী।
বুথফেরত সমীক্ষার এই চাকা ঘোরানোর খেলায় বিজেপির পালে হাওয়া দেখছে ম্যাট্রিজ থেকে চাণক্য স্ট্র্যাটেজি। ম্যাট্রিজের হিসেবে বিজেপি পেতে পারে ১৪৬ থেকে ১৬১টি আসন, যেখানে তৃণমূল থমকে যেতে পারে ১২৫ থেকে ১৪০-এর ঘরে। চাণক্য স্ট্র্যাটেজিও গেরুয়া শিবিরকে ১৫০ থেকে ১৬০টি আসন দিয়ে এগিয়ে রেখেছে। আরও এক ধাপ এগিয়ে প্রজা পোল বিজেপিকে ১৭৮ থেকে ২০৮টি আসন দিয়ে রাজ্যে ‘গেরুয়া ঝড়’-এর ইঙ্গিত দিচ্ছে। পোল ডায়েরি এবং পি-মার্কের সমীক্ষাতেও পাল্লা ভারী মোদী-শাহের দলের দিকেই। বিজেপির কাছে এ এক বিশাল উত্থানের হাতছানি।
উল্টো ছবি ধরা পড়েছে পিপল্স পাল্স এবং জনমত পোল্সের পরিস্ক্যানে। পিপল্স পাল্সের দাবি অনুযায়ী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল ১৭৮ থেকে ১৮৯টি আসন পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখবে। সেখানে বিজেপি থেমে যেতে পারে ১১০-এর নিচে। জনমত পোল্স আরও সাহসী, তারা তৃণমূলকে দিচ্ছে ১৯৫ থেকে ২০৫টি আসন। জেভিসি-র সমীক্ষা অবশ্য কাউকেই স্পষ্ট স্বস্তি দিচ্ছে না; তাদের হিসেবে তৃণমূল ১৩১-১৫২ এবং বিজেপি ১৩৮-১৫৯, যা আদতে এক চুল না ছাড়ার লড়াই। অর্থাৎ, সমীক্ষায় সমীক্ষায় এখন ধুন্ধুমার যুদ্ধ চলছে।
এ বারের নির্বাচনে রেকর্ড সংখ্যক ভোট পড়েছে। ভোটদানের হার ৯০ শতাংশ ছাড়িয়ে নজির গড়েছে বঙ্গে। পরে আরও বাড়তেও পারে । যদিও ভোটার তালিকা থেকে বহু বৈধ নাম বাদ পড়া বা মৃত ভোটারদের নাম থাকা নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই। এসআইআর বা বিশেষ নিবিড় সংশোধনের পর এই ব্যাপক ভোটদানের প্রভাব ফলে কতটা পড়বে, তা নিয়ে চর্চা তুঙ্গে। এর মাঝেই বুথফেরত সমীক্ষায় বাম-কংগ্রেস শিবিরের জন্য বিশেষ সুখবর নেই। অধিকাংশ সংস্থাই তাদের ‘শূন্য’ হাতে ফেরানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। ‘মহাশূন্য’ থেকে খাতা খোলার স্বপ্নে তারা বিভোর থাকলেও জনমতের ঝোঁক সে দিকে দেখা যাচ্ছে না।
২০২১-এর বিধানসভা বা ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে এগজ়িট পোল কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছিল। তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র সেই প্রসঙ্গ টেনেই বলেছেন, ‘এগজিট পোলগুলি দেখার আগে মনে রাখবেন— সমস্ত এক্সিট পোলই এনডিএ ৩৫০-এর বেশি আসন পাবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল। চাণক্য ৪০০, ইন্ডিয়া টুডে-অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়া ৩৬১-৪০১, এবিপি-সি ভোটার ৩৫৩-৩৮৩। কিন্তু বাস্তবে বিজেপি পেয়েছে ২৪০টি আসন— যা সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে অনেকটাই কম। ঠিক একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে ৪ঠা মে।’ তাঁর এই আক্রমণাত্মক মন্তব্য জোড়াফুল শিবিরের আত্মবিশ্বাসকেই প্রতিফলিত করছে।
অন্য দিকে, বিজেপি রাজ্য সভাপতি শমিক ভট্টাচার্যের গলায় সাবধানী সুর। সাংবাদিক সম্মেলনে তাঁকে বুথ ফেরত সমীক্ষা নিয়ে প্রশ্ন করা হলেও তিনি কার্যত বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছেন। তাঁর সংক্ষিপ্ত জবাব, ‘মানুষ জিতবে’। গেরুয়া শিবিরের এই সংযত অবস্থান কৌতূহল বাড়াচ্ছে। কারণ, সমীক্ষাগুলি বিজেপির পালে হাওয়া দিলেও রাজনৈতিক বাস্তব অনেক সময়ই আলাদা হয়। ২৯৪ কেন্দ্রের ভাগ্য এখন বাক্সবন্দি। ৪ মে বোঝা যাবে বঙ্গে ‘গেরুয়া ঝড়’ নাকি ‘প্রত্যাবর্তন’—কোনটি সত্য হতে চলেছে।
বুধবার। সাত জেলার ১৪২টি আসনে বুধবার শেষ দফার ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। এর আগে ১৬টি জেলায় ১৫২টি আসনে ভোট হয়েছিল। এই দীর্ঘ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ফলাফল এখন উত্তেজনার শীর্ষে। পরিসংখ্যানবিদদের মতে, এগজিট পোলের অনেক সময় বৈজ্ঞানিক ভিত্তি থাকে না। এটি মূলত ভোটারদের মতামতের ভিত্তিতে তৈরি একটি পূর্বাভাস মাত্র। অতীতে বহুবার এই হিসাব বাস্তবের সঙ্গে মেলেনি।
২০২১ সালে বিজেপি পেয়েছিল ৭৭টি আসন। এ বার অধিকাংশ সমীক্ষক সংস্থা দাবি করছে, বিজেপি এক লাফে সেই সংখ্যা অনেকটা বাড়িয়ে ক্ষমতায় আসছে। অন্য দিকে তৃণমূল ব্যাকফুটে থাকলেও জয়ের আশা ছাড়ছে না। ভবানীপুরের মতো হাইভোল্টেজ কেন্দ্রে জয় কার হবে, বা নন্দীগ্রামের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে কি না, তা নিয়ে এখন রাজ্যের চায়ের দোকানে দোকানে বিতর্ক। বামেরা কি শেষ পর্যন্ত শূন্যের গেরো কাটাতে পারবে? পোল ডায়েরি বা জেভিসি-র মতো সংস্থাগুলি অন্যদের ৫ থেকে ৯টি আসন দিলেও সেখানে বাম-কংগ্রেসের ভাগ কতটা, তা অস্পষ্ট।
পি-মার্কের সমীক্ষা বলছে বিজেপি ১৫০ থেকে ১৭৫টি আসনে জিততে পারে। প্রজা পোল সবচেয়ে বেশি আসন দিচ্ছে বিজেপিকে। অন্য দিকে পিপল্স পাল্স এবং জনমত পোল্স তৃণমূলের একক আধিপত্যের কথা বলছে। এই বৈপরীত্যই প্রমাণ করে যে বাংলার রাজনীতিতে লড়াই কতটা জটিল। ভোটারদের মনের হদিশ পাওয়া সব সময় সহজ নয়। সমীক্ষক সংস্থাগুলির এই পরস্পরবিরোধী দাবি রাজ্যবাসীকে আরও বেশি ধন্দ্বে ফেলে দিয়েছে। তবে ৪ মে-র সূর্যোদয়ের সঙ্গেই সব জল্পনার অবসান ঘটবে।
নবান্নের সিংহাসন কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতেই সুরক্ষিত থাকবে? নাকি দিল্লির নেতাদের হাত ধরে বাংলায় পদ্ম ফুটবে? বুথফেরত সমীক্ষার এই গোলকধাঁধায় আপাতত ঘুরপাক খাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ। ভোট গণনার দিনই বোঝা যাবে সমীক্ষার ‘ফল’ নাকি জনমতের ‘ফল’, কোনটি বেশি মিষ্টি। আপাতত রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা শহর থেকে গ্রামের প্রতিটি কোণায়। ভাগ্যপরীক্ষা হয়ে গিয়েছে প্রার্থীদের, এখন শুধু পরিণামের অপেক্ষা। ইভিএমের গোপন কুঠুরিই জানে আগামীর বাংলার শাসক কে।
বাংলার নির্বাচনী ইতিহাস বলছে, অনেক ক্ষেত্রেই এই ধরনের বুথফেরত বা প্রাক নির্বাচনী জনমত সমীক্ষা মেলা কঠিন। তবে মিলে যাওয়ার উদাহরণও নেহাত কম নয়। ২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ১৪৮টি আসন। ২০২১ সালের নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছিল তৃণমূল। ম্যাট্রিজের বুথফেরত সমীক্ষা বলছে, পশ্চিমবঙ্গে ১৪৬ থেকে ১৬১টি আসন পেতে পারে বিজেপি। তৃণমূল পাচ্ছে ১২৫ থেকে ১৪০টি আসন। অন্যেরা ছয় থেকে ১০টি আসন পেতে পারে। তবে বাম বা কংগ্রেস এ রাজ্যে খাতা খুলতে পারবে না বলে দাবি করা হয়েছে।
পোল ডায়েরির সমীক্ষা বলছে, পশ্চিমবঙ্গে ১৪২ থেকে ১৭১টি আসন পেতে পারে বিজেপি। তৃণমূল পেতে পারে ৯৯ থেকে ১২৭টি আসন। অন্যদের পাঁচ থেকে ন’টি আসনে জেতার সম্ভাবনা রয়েছে। জনমত পোল্স-এর সমীক্ষায় আবার তৃণমূলকে এগিয়ে রাখা হয়েছে। ১৯৫ থেকে ২০৫টি আসন পেয়ে রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল ক্ষমতা ধরে রাখবে বলে দাবি করা হচ্ছে। বিজেপি পেতে পারে ৮০ থেকে ৯০টি আসন। কংগ্রেসকে এক থেকে তিনটি আসন এবং বামেদের শূন্য থেকে একটি আসন দেওয়া হয়েছে। জেভিসি-র সমীক্ষায় তৃণমূলকে ১৩১ থেকে ১৫২টি আসনে এগিয়ে রাখা হয়েছে। বিজেপি পেতে পারে ১৩৮ থেকে ১৫৯টি আসন।
অর্থাৎ, একমাত্র পিপলস পালস ছাড়া প্রতিটি সমীক্ষক সংস্থার রিপোর্টেই এ বারে বাংলায় জয়ের বিষয়ে বিজেপি-কে এগিয়ে রাখা হয়েছে। ২০২১ সালে ৭৭টি আসন পাওয়া বিজেপি এ বার এক লাফে ক্ষমতা দখলের দোড়গোড়ায়। তবে বুথ ফেরত সমীক্ষা বা এগজিট পোল চূড়ান্ত ফলাফল নয়। এর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পরিসংখ্যানবিদদের অনেকেই বলেন এর কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। অতীতে বহুবার এগজিট পোলের হিসেব বাস্তবের সঙ্গে মেলেনি। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও মুখ থুবড়ে পড়েছিল অধিকাংশ সমীক্ষা সংস্থা।
ভবানীপুরের মতো হাইভোল্টেজ কেন্দ্রে জিতবে কে? নন্দীগ্রামে ২০২১ এর নির্বাচনের ফলাফলের কি পুনরাবৃত্তি হবে ভবানীপুরে? বামেরা কি খাতা খুলতে পারবে? শূন্যের গেরো কি কাটতে চলেছে? এই সব প্রশ্নের উত্তর এখন সময়ের অপেক্ষা। ভাগ্যপরীক্ষা হয়ে গিয়েছে ২৯৪ কেন্দ্রের প্রার্থীদের। বাংলার মসনদে কে বসতে চলেছে, তা জানা যাবে ৪ তারিখেই। প্রত্যাবর্তন নাকি পরিবর্তন? তৃণমূল কি ফের ক্ষমতায় আসবে নাকি বঙ্গে উঠবে গেরুয়া ঝড়? বুথ ফেরত সমীক্ষার অনেক সময়ে পুরো ভুলও প্রমাণিত হয়েছে। এই সমীক্ষার থেকে একটা আভাস পাওয়া যায় মাত্র।
সব মিলিয়ে বাংলার রাজনৈতিক আকাশে এখন ঘন মেঘ। কার মাথায় জয়ের মুকুট উঠবে আর কার কপালে জুটবে পরাজয়ের গ্লানি, তা নিয়ে সরগরম পাড়ার মোড় থেকে সোশ্যাল মিডিয়া। সমীক্ষার লড়াইয়ে কেউ এগিয়ে কেউ পিছিয়ে । বুথফেরত সমীক্ষা বিজেপিকে এগিয়ে রাখলেও তৃণমূলের তৃণমূল স্তরের সংগঠন শেষ মুহূর্তে ম্যাজিক দেখাবে কি না, সেটাই দেখার। বাম-কংগ্রেসের প্রাসঙ্গিকতা এ বারও কি প্রশ্নের মুখে পড়বে? না কি সাইলেন্ট ভোটাররা অন্য কোনও সমীকরণ তৈরি করেছেন? এই সব জল্পনার অবসান হবে ৪ তারিখেই । তবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই ২০২৬-এর নির্বাচন যে এক নতুন মাইলফলক হতে চলেছে, তা বুথফেরত সমীক্ষার এই চিত্র থেকেই পরিষ্কার। শেষ হাসি হাসবেন কে, দিদি না কি মোদী-শাহের সেনাপতিরা? চার তারিখের মহাপ্রলয়ের আগে এই সমীক্ষার ইঙ্গিত যেন ঝড়ের আগের স্তব্ধতা। বাংলার মানুষ কার রায় শিরোধার্য করেছে, তা আর কয়েক মুহূর্তের অপেক্ষা। প্রতীক্ষায় বুক বাঁধছে রাজনৈতিক দলগুলি। জনতাই শেষ কথা বলবে শেষ বিচারে। বুথফেরত সমীক্ষার কাটাছেঁড়া চলুক, নজর থাকুক ৪ মের সেই মাহেন্দ্রক্ষণটির দিকে।