।। টিঙ্কু দত্ত ।। নয়া জামানা ।। : মতুয়াগড় থেকে গঙ্গার দুই তীর, আজ নজর কাড়ছে বাংলার সাতটি জেলা। প্রথম দফার হাইভোল্টেজ লড়াইয়ের পর আজ বুধবার দ্বিতীয় দফায় নির্ধারিত হতে চলেছে বাংলার মসনদের ভাগ্য। দ্বিতীয় দফার এই ১৪২টি আসনকে বলা হচ্ছে ঘাসফুল শিবিরের ‘শক্ত ঘাঁটি’। যে দক্ষিণবঙ্গ গত বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলকে দু’হাত ভরে আশীর্বাদ করেছিল, সেই দুর্গ রক্ষা করার চ্যালেঞ্জ আজ শাসকদলের সামনে। অন্যদিকে, ‘বন্ধ্যা’ জমি পুনরুদ্ধারে মরিয়া পদ্মশিবির। কড়া নিরাপত্তায় মোড়া সাত জেলার ভাগ্যবিধাতা আজ সোয়া তিন কোটিরও বেশি ভোটার। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘এসআইআর’ নিয়ে তরজা, একাধিক আদালতে মামলা ও প্রচারের আক্রমণ পেরিয়ে আজ দ্বিতীয় দফায় শেষ হচ্ছে বঙ্গের ভোট-পর্ব।
উল্লেখ্য, গত ২৩ এপ্রিল রাজ্যের ১৬টি জেলার ১৫২টি আসনে ভোটগ্রহণ হয়েছে। বুথের সংখ্যা ছিল ৪৪ হাজার ৩৭৬। কমিশন জানিয়েছে, মোট ৩ কোটি ৩৬ লক্ষ জন ভোটদান করেছেন। অর্থাৎ, ৯৩.১৯ শতাংশ ভোট পড়েছে। আজ দেখা যাবে প্রথম দফার ভোটদানের রেকর্ড ভেঙে ফের নজির গড়ে কি না । সেদিকেই তাকিয়েই সব পক্ষ ।
আশা করা যাচ্ছে বুধবার সকাল থেকেই বুথে বুথে লম্বা লাইন দেখা যাবে । ১৪২টি আসনের জন্য লড়ছেন ১,৪৪৮ জন প্রার্থী। কলকাতা, দুই ২৪ পরগনা, হাওড়া, হুগলি, পূর্ব বর্ধমান ও নদিয়ার এই লড়াই গতবারের সমীকরণকে ওলটপালট করার শেষ সুযোগ বিজেপির কাছে। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে এই ১৪২টি আসনের মধ্যে ১২৩টিই ছিল তৃণমূলের দখলে। বিজেপি জিতেছিল মাত্র ১৮টিতে। কলকাতার সবকটি আসন থেকে শুরু করে হাওড়া, পূর্ব বর্ধমান ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় বিজেপি ছিল পুরোপুরি ‘শূন্য’। এবার সেই চিত্র বদলাতে চায় গেরুয়া শিবির। লোকসভা ভোটের নিরিখে বিজেপি ১৮ থেকে বেড়ে ২৭টি আসনে এগিয়ে থাকলেও, সেই লিড বিধানসভার লড়াইয়ে ভোটবাক্সে ধরে রাখাটাই এখন বড় পরীক্ষা। উত্তরবঙ্গ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী বিজেপিকে প্রথমবারের মতো বাংলায় সরকার গড়তে হলে এই পর্বে ভালো ফল করতেই হবে।
মতুয়া ভোট ও সংখ্যালঘু ভোটের রসায়ন এই দফার অন্যতম চালিকাশক্তি। নদিয়া ও উত্তর ২৪ পরগনার অন্তত ১৫টি আসনে মতুয়া ভোটাররা নির্ণায়ক শক্তি। সিএএ থেকে শুরু করে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রচারের ঝাঁঝ বাড়িয়েছে দুই পক্ষই। মতুয়াদের ঠাকুরবাড়িতেও এবার আড়াআড়ি বিভাজন। একদিকে শান্তনু ঠাকুর, সুব্রত ঠাকুরেরা, অন্যদিকে মমতাবালা ঠাকুর ও মধুপর্ণা ঠাকুর। কার পাল্লা ভারী হবে, তা নিয়ে তুঙ্গে রাজনৈতিক তরজা। একইভাবে, মুসলিম ভোটও এই ১৪২টি আসনের এক-তৃতয়াংশ জায়গায় জয়-পরাজয় নির্ধারণ করে। গত দেড় দশক ধরে এই ভোটব্যাঙ্ক তৃণমূলের একচেটিয়া থাকলেও, এবার বাম-আইএসএফ জোট কতটা কামড় বসাবে, সেটাই দেখার। পূর্ব বর্ধমান, দুই ২৪ পরগনা ও শিল্পাঞ্চলে নওশাদ সিদ্দিকির সভায় উপচে পড়া ভিড় শাসকদলের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। ভাঙড়ের বিধায়ক ধর্মকে সরিয়ে রুটি-রুজিকে সামনে রেখে যে নতুন রাজনীতির বয়ান তৈরি করেছেন, তা কতটা ভোট টানবে সেটাই প্রশ্ন।
প্রার্থীদের তালিকায় এবার বিত্ত আর অপরাধের ছায়াও দীর্ঘ। দ্বিতীয় দফায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৩২১ জন কোটিপতি প্রার্থী। এই তালিকায় সবার উপরে রয়েছে তৃণমূল। তাদের ১৪২ জন প্রার্থীর মধ্যে ১০৩ জনই কোটিপতি। সম্পত্তির নিরিখে রায়দিঘির বিজেপি প্রার্থী পলাশ রানা ১০৪ কোটি টাকা নিয়ে শীর্ষে থাকলেও, ৭৬ কোটির মালিক পাণ্ডুয়ার সমীর চক্রবর্তী ও ৩৯ কোটির মালিক কসবার জাভেদ খান তৃণমূলের হয়ে পাল্লা দিচ্ছেন। অন্যদিকে, ফৌজদারি মামলার নিরিখেও পিছিয়ে নেই কেউ। ৩৩৮ জন প্রার্থীর বিরুদ্ধে অপরাধমূলক মামলা রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ৯১টি মামলা রয়েছে বিজেপি প্রার্থী রাকেশ সিংয়ের বিরুদ্ধে। নারীঘটিত অপরাধে অভিযুক্ত ৯৪ জনের তালিকায় ৫ জন বিজেপির ও ১ জন তৃণমূলের। এই দফায় নিরক্ষর প্রার্থীর সংখ্যা ১৬ জন এবং উচ্চশিক্ষিত ৩৯ জন।
নির্বাচন কমিশনের কাছে এবারের বড় চ্যালেঞ্জ নিরাপত্তা। ২৩২১ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে এই দফায়। গত দফার তুলনায় এবারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার। শান্তিপূর্ণ ভোট নিশ্চিত করতে ১৪২ জন সাধারণ পর্যবেক্ষক, ৯৫ জন পুলিশ পর্যবেক্ষক ও ১০০ জন হিসাব পর্যবেক্ষক নজরদারি চালাচ্ছেন। কমিশনের পক্ষ থেকে বিশেষ হেল্পলাইন নম্বরও জারি করা হয়েছে। ওয়েস্টবেঙ্গল সেক্টর ও রাজ্য ফোর্স কোঅর্ডিনেটর সিআরপিএফের আইজি এই নম্বরগুলি প্রকাশ করেছেন। ভোটের দিন কোনও সমস্যা হলে বা অভিযোগ থাকলে ‘৮৪২০২৭২১০১’, ‘৮৪২০২৭২৩৪৩’ বা ‘০৩৩-২৩৬৭১১১৭’ নম্বরে সরাসরি যোগাযোগ করা যাবে। সকাল ৭টা থেকে শুরু হওয়া এই ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া চলবে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত।
শহরাঞ্চলের ভোট নিয়ে রাজনৈতিক মহলে কৌতূহল তুঙ্গে। বিশেষ করে আরজি কর-কাণ্ডের পরবর্তী সময়ে এই প্রথম বড় মাপের জনমত যাচাই হতে চলেছে। গত লোকসভা ভোটে শহরাঞ্চলে তৃণমূলের সমর্থন কিছুটা আলগা হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছিল। পানিহাটিতে নির্যাতিতার মায়ের বিজেপির টিকিটে লড়া সেই আবেগকে উসকে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও তৃণমূলের দাবি, ওই আন্দোলন ছিল একটি নির্দিষ্ট ঘটনার প্রতিবাদ, তাতে সরকার-বিরোধিতা ছিল না। তবে শহর ও শহরতলির মহিলারা যেভাবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে পথে নেমেছিলেন, তার প্রভাব ব্যালট বক্সে পড়ে কি না, তা নিয়ে ধন্দ কাটেনি। কলকাতার ১১টি আসন ও সংলগ্ন এলাকার জনবিন্যাস এবার বড় সূচক হতে চলেছে।
ভোটার তালিকায় নাম সংশোধন বা এসআইআর এবার বড় ফ্যাক্টর হতে পারে। প্রথম দফার তুলনায় দ্বিতীয় দফায় বেশি সংখ্যক নাম বাদ পড়েছে তালিকা থেকে। প্রথম দফায় বাদ গিয়েছিল ৪০ লক্ষ ৪৬ হাজার নাম, সেখানে এবার ৭টি জেলায় নাম বাদ পড়েছে ৫০ লক্ষ ৩৬ হাজার। বিশেষ করে দুই ২৪ পরগনার ৬৪টি আসনেই প্রায় ২৩ লক্ষ নাম বাদ যাওয়ায় ফলাফল কোন দিকে ঘুরে যাবে, তা নিয়ে হিসাব কষছেন রাজনৈতিক পণ্ডিতরা। নাগরিকত্ব ইস্যু ও এসআইআর-এর ফলে ভোটারদের ক্ষোভকে তৃণমূল হাতিয়ার করতে চাইলেও বিজেপি নিজেদের অবস্থানে অনড়। নদিয়া ও উত্তর ২৪ পরগনার মতুয়া অধ্যুষিত আসনগুলোতে গত তিনটি বড় নির্বাচনে বিজেপির প্রভাব থাকলেও এবার তৃণমূল সেখানে কামড় বসাতে মরিয়া।
সাতটি জেলার ১৪২টি আসনে লড়াইয়ের রসদ আলাদা আলাদা। কোথাও ধর্মীয় মেরুকরণ, কোথাও ভাষার রাজনীতি, আবার কোথাও বাঙালি গরিমার ভাষ্য প্রাধান্য পাচ্ছে। হাওড়া, হুগলি ও কলকাতার শিল্পাঞ্চলে অবাঙালি হিন্দু ভোট বড় ফ্যাক্টর। আবার কলকাতা লাগোয়া এলাকায় সংখ্যালঘু ভোটের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত বাঙালির ক্ষোভ-বিক্ষোভের লড়াই। হুগলিতে গতবার বিজেপি চারটি আসন পেলেও এবার সেখানে ঘাসফুলের পাল্টা হাওয়া রয়েছে। পূর্ব বর্ধমান ও হাওড়ায় গতবার শূন্য হাতে ফেরা বিজেপি এবার অন্তত খাতা খুলতে মরিয়া। অন্যদিকে, তৃণমূল নিজেদের ‘শক্ত ঘাঁটি’ তথা দুর্ভেদ্য দুর্গ আগলাতে চেষ্টার ত্রুটি রাখেনি। প্রার্থী চয়নেও তাই অভিজ্ঞ ও বিত্তশালী হেভিওয়েটদের ওপরই ভরসা রেখেছে শাসক দল।
এদিকে কড়া পাহারায় মুড়ে ফেলা হয়েছে বুথ চত্বর। বিকেল ৬টা পর্যন্ত চলবে এই ভাগ্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া। পশ্চিমবঙ্গের মসনদ কার দখলে থাকবে, তার বড় উত্তর লুকিয়ে রয়েছে আজকের এই দ্বিতীয় দফার লড়াইয়েই। বিজেপি যদি দক্ষিণবঙ্গে ছাপ ফেলতে না পারে, তবে তাদের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। অন্যদিকে, তৃণমূল যদি এই ১৪২টি আসনে তাদের দাপট বজায় রাখতে পারে, তবে নবান্নের রাস্তা তাদের জন্য অনেকটাই মসৃণ হয়ে যাবে। বাংলার রাজনীতির পালস্ এখন দ্বিতীয় দফার এই কেন্দ্রগুলিই। নদিয়া থেকে কলকাতা পর্যন্ত গঙ্গার দুই পাড়ে এখন শুধুই জয়-পরাজয়ের সমীকরণ। দিনভর টানটান উত্তেজনার পর বিকেলেই স্পষ্ট হবে কোন ফুলের সুবাসে মাতবে দক্ষিণবঙ্গ। বাংলার রাজনীতির ইতিহাসে এই দফাই হতে চলেছে ‘টার্নিং পয়েন্ট’।