নয়া জামানা ডেস্ক : ইতিহাস গড়ল, ইতিহাস ফেরাল। পাল্টাল ইতিহাসও। আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে ইতিহাসের নতুন অধ্যায় লিখল ভারতীয় ক্রিকেট দল। টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে ৯৭ রানে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হল টিম ইন্ডিয়া। এই জয়ের ফলে ভারতের ঝুলিতে উঠল তৃতীয় টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শিরোপা, যা এখনও পর্যন্ত কোনও দেশের পক্ষেই সম্ভব হয়নি। প্রায় ১ লক্ষ ৩২ হাজার দর্শকে ভরা স্টেডিয়ামে ভারতের এই জয়ে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন ক্রিকেটপ্রেমীরা। একই মাঠে প্রায় তিন বছর আগে যে তিক্ত স্মৃতি তৈরি হয়েছিল, রবিবার সেই ক্ষত মুছে দিয়ে ইতিহাস পাল্টে দিলেন সূর্যকুমার যাদবদের দল।
ফাইনালে টসে হেরে প্রথমে ব্যাট করতে নামে ভারত। শুরুটা খুব একটা ঝড়ো ছিল না। প্রথম দুই ওভারে ব্যাটসম্যানরা পরিস্থিতি বুঝে খেলছিলেন। বিশেষ করে অভিষেক শর্মাকে নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তাই ছিল, কারণ পুরো বিশ্বকাপ জুড়ে তাঁর ব্যাট তেমন কথা বলেনি। তবে ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস ফিরে পান তিনি। জেকব ডাফির ওভারে দুটি চার মারলেও ততটা স্বচ্ছন্দ দেখাচ্ছিল না তাঁকে। কিন্তু লকি ফার্গুসনের বলে একটি শক্তিশালী ছক্কা হাঁকানোর পর যেন বদলে যায় ম্যাচের গতি।এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাননি অভিষেক। মাত্র ১৮ বলে অর্ধশতরান পূর্ণ করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ৫২ রান করে আউট হলেও ততক্ষণে ভারতের ইনিংস শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে গেছে। প্রথম ছয় ওভারেই ভারত তুলে ফেলে ৯২ রান, যা ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।অন্য প্রান্তে সঞ্জু স্যামসনও দুরন্ত ব্যাটিং করেন। শুরুতে কিছুটা ধীর গতিতে খেললেও একবার ছন্দে ফিরতেই বোলারদের উপর চড়াও হন তিনি। ৪৬ বলে ৮৯ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন সঞ্জু। তাঁর ইনিংসে ছিল আটটি ছক্কা ও পাঁচটি চার। সেঞ্চুরির খুব কাছে গিয়েও শতরান হাতছাড়া করেন তিনি।ইশান কিষানও এই ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। মাত্র ২৫ বলে ৫৪ রান করে দলের রান বাড়াতে সাহায্য করেন তিনি। সঞ্জু ও ঈশানের জুটিতে একসময় মনে হচ্ছিল ভারত ৩০০ রানের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে।তবে ম্যাচে নাটকীয়তা আনেন নিউজিল্যান্ডের জিমি নিশাম। ১৬তম ওভারে তিনি সঞ্জু স্যামসন, ঈশান কিষান ও সূর্যকুমার যাদব—তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নেন। এতে ভারতের রান তোলার গতি কিছুটা কমে যায়।কিন্তু শেষদিকে শিবম দুবের ঝোড়ো ব্যাটিং আবারও ম্যাচের রং বদলে দেয়। মাত্র ৮ বলে ২৬ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলেন তিনি। শেষ ওভারে একাই ২৪ রান তুলে ভারতকে বড় সংগ্রহ এনে দেন। নির্ধারিত ২০ ওভারে ভারতের স্কোর দাঁড়ায় ২৫৫ রান।বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো ম্যাচে এই বিশাল রান তাড়া করা নিউজিল্যান্ডের জন্য কঠিন ছিল। তবুও ভারতের সমর্থকদের মনে কিছুটা উদ্বেগ ছিল। কারণ সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড প্রায় বড় রান তাড়া করে ফেলেছিল। পাশাপাশি শিশিরের সম্ভাবনাও ছিল।কিন্তু ভারতের বোলিং আক্রমণ সেই সব উদ্বেগ দূর করে দেয়। জশপ্রীত বুমরাহ শুরু থেকেই কিউই ব্যাটিং লাইনআপে চাপ তৈরি করেন। নিজের প্রথম ওভারেই তিনি রাচিন রবীন্দ্রকে আউট করেন। ডিপ স্কোয়ার লেগে দারুণ ক্যাচ নেন ইশান কিষান।
অন্যদিকে অক্ষর প্যাটেলও অসাধারণ বোলিং করেন। তৃতীয় ওভারে ফিন অ্যালেনকে আউট করার পর পঞ্চম ওভারে গ্লেন ফিলিপসের উইকেটও তুলে নেন তিনি। এই দুই উইকেটেই কার্যত নিউজিল্যান্ডের ব্যাটিংয়ের মেরুদণ্ড ভেঙে যায়।পাওয়ার প্লে শেষে নিউজিল্যান্ডের স্কোর দাঁড়ায় ৩ উইকেটে মাত্র ৫২ রান। এত বড় লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে ক্রমশ চাপে পড়ে যায় কিউই দল।মাঝের ওভারগুলোতে ভারতের ফিল্ডিংও ছিল নজরকাড়া। যদিও দুটি ক্যাচ হাতছাড়া হয়েছিল, তবে কয়েকটি অসাধারণ ক্যাচ ম্যাচের মোড় পুরোপুরি ভারতের দিকে ঘুরিয়ে দেয়।বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল টিম সেইফার্টের ক্যাচ। বাউন্ডারি লাইনে দাঁড়িয়ে ইশান কিষান অসাধারণ দক্ষতায় বলটি তালুবন্দি করেন। ভারসাম্য হারাতে বসেও বলটি আকাশে ছুড়ে দিয়ে আবার নিয়ন্ত্রণে এনে ক্যাচ সম্পূর্ণ করেন তিনি। সেই দৃশ্য অনেকের মনে করিয়ে দেয় অতীতের কিছু স্মরণীয় ক্যাচের কথা।
নকআউট পর্বে খুব একটা ছন্দে না থাকলেও ফাইনালে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন বরুণ চক্রবর্তী। বিধ্বংসী ব্যাটিং করা সেইফার্টকে আউট করে তিনি এই বিশ্বকাপে সর্বাধিক উইকেট শিকারির তালিকায় শীর্ষে ওঠেন।
এরপর ম্যাচে আর কোনও নাটকীয়তার সুযোগ ছিল না। নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ক মিচেল স্যান্টনার ছাড়া আর কোনও ব্যাটার উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেননি।ভারতের বোলাররা ধারাবাহিকভাবে উইকেট তুলে নিতে থাকেন। অক্ষর প্যাটেল তিনটি উইকেট নেন। অন্যদিকে জশপ্রীত বুমরাহ চার ওভারে মাত্র ১৫ রান দিয়ে চারটি উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচের সেরা বোলার হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেন।শেষ পর্যন্ত নিউজিল্যান্ড অলআউট হয়ে যায় ভারতের চেয়ে ৯৭ রান কমে। সেই সঙ্গে ভারত নিশ্চিত করে আরেকটি বিশ্বকাপ জয়ের গৌরব।এই জয়ের মাধ্যমে ভারত শুধু ট্রফিই জেতেনি, বিশ্ব ক্রিকেটে নতুন ইতিহাসও তৈরি করেছে। তিনবার টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের নজির আগে কোনও দেশের ছিল না। পাশাপাশি টানা দুইবার এই টুর্নামেন্ট জেতার কৃতিত্বও প্রথমবার অর্জন করল ভারত।আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, দেশের মাটিতে এই প্রথম কোনও দল টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতল। ফলে এই জয় ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব পাবে।স্টেডিয়ামে উপস্থিত ছিলেন ভারতের দুই প্রাক্তন বিশ্বজয়ী অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি ও রোহিত শর্মা। তাঁদের সামনে নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটাররা ইতিহাস গড়ে দিলেন।ম্যাচ শেষে পুরো নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়াম উৎসবে মেতে ওঠে। গ্যালারি ভরে ওঠে স্লোগান, গান ও উচ্ছ্বাসে। প্রায় তিন বছর ধরে এই মাঠে জমে থাকা হতাশা যেন এক মুহূর্তে মুছে যায়।এই জয়ের মাধ্যমে ভারত আবারও প্রমাণ করল যে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে তারা বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দল। নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটারদের হাত ধরে বিশ্বমঞ্চে ভারতের আধিপত্য আরও দৃঢ় হল।আর ভারতীয় দলের জয়ের পর তাঁদের অভিনন্দন জানালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি।
এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট করে মোদি লেখেন, ‘ভারতীয় ক্রিকেট দলকে আইসিসি পুরুষদের টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের জন্য অভিনন্দন। এই ঐতিহাসিক সাফল্য দলের অসাধারণ দক্ষতা, দৃঢ় সংকল্প এবং দুর্দান্ত দলগত সমন্বয়ের প্রতিফলন। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে ভারতীয় ক্রিকেটাররা অসাধারণ লড়াইয়ের মানসিকতা ও ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন। সবাইকে অভিনন্দন। তোমাদের এই জয়ে গোটা দেশের মানুষ গর্বিত।’এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট করেছেন মমতাও। তিনি লিখেছেন, ‘টিম ইন্ডিয়াকে অভিনন্দন। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ে আমরা গর্বিত।’সোশ্যাল মিডিয়ায় বিশেষ পোস্ট করেছেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুও। টিম ইন্ডিয়ার বিশ্বজয়ে অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি তাঁদের রেকর্ডের কথাও উল্লেখ করেছেন রাষ্ট্রপতি।এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট তিনি লিখেছেন,’আইসিসি পুরুষদের টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতে ইতিহাসের একাধিক মাইলফলক স্পর্শ করায় টিম ইন্ডিয়াকে আন্তরিক অভিনন্দন। এই জয়ের মাধ্যমে ভারত গর্বের সঙ্গে এমন এক দেশ হিসেবে পরিচিতি পেল, যারা তিনবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতেছে। পাশাপাশি টানা দু’বার এই ট্রফি জেতার কৃতিত্বও একমাত্র ভারতেরই।’
ক্রিকেটে বলা হয়, রেকর্ড তৈরি হয় ভাঙার জন্য। কিন্তু এই বিশ্বকাপে ভারতের যে আধিপত্য দেখা গেল, তা দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আহমেদাবাদের সেই রাত তাই শুধু একটি ম্যাচের জয় নয়, বরং ভারতীয় ক্রিকেটের গর্ব, আত্মবিশ্বাস এবং নতুন ইতিহাসের সূচনা।