[pj-news-ticker]

শিক্ষাঙ্গনে নতুন সূর্যোদয় ‘টার্নিং পয়েন্ট স্কুল’

মানস দাস, নয়া জামানা,মালদা     পল্লীবাংলায় সম্ভাবনার নতুন সূচনা গ্রামীণ ভারতে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়া চিরকালই এক বড় চ্যালেঞ্জ।বিশেষ করে সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে উন্নত মানের শিক্ষাব্যবস্থার অভাব বহু মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্নকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেয়। কিন্তু সদিচ্ছা, কঠোর পরিশ্রম এবং....

শিক্ষাঙ্গনে নতুন সূর্যোদয় ‘টার্নিং পয়েন্ট স্কুল’

মানস দাস, নয়া জামানা,মালদা     পল্লীবাংলায় সম্ভাবনার নতুন সূচনা গ্রামীণ ভারতে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়া....

Facebook
Twitter
LinkedIn
Email
WhatsApp
X
Threads
Telegram

আরও পড়ুন


মানস দাস,

নয়া জামানা,মালদা

 

 

পল্লীবাংলায় সম্ভাবনার নতুন সূচনা

গ্রামীণ ভারতে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়া চিরকালই এক বড় চ্যালেঞ্জ।বিশেষ করে সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে উন্নত মানের শিক্ষাব্যবস্থার অভাব বহু মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্নকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেয়। কিন্তু সদিচ্ছা, কঠোর পরিশ্রম এবং সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে যে যেকোনো প্রতিকূল পরিবেশকে জয় করা সম্ভব তার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে মালদা জেলার গোলাপগঞ্জের লালুটোলা।

২০২৩ সাল। পিছিয়ে পড়া এই জনপদে শিক্ষার এক নতুন ভোর নিয়ে আত্মপ্রকাশ ঘটে ‘টার্নিং পয়েন্ট স্কুল’-এর। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে এই শিক্ষানিকেতনটি শুধু একটি স্কুলের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং হয়ে উঠেছে স্থানীয় বহু পরিবার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বেঁচে থাকার স্বপ্ন এবং নতুন আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু।

 

একমুঠো স্বপ্ন ও ১১ জন পথপ্রদর্শকের অদম্য যাত্রা

 

 

কোনো বড় উদ্যোগের নেপথ্যে থাকে কয়েকজন দূরদর্শী মানুষের স্বপ্ন এবং আত্মত্যাগ। টার্নিং পয়েন্ট স্কুলের ক্ষেত্রেও গল্পটা আলাদা ছিল না। এলাকার শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সুগম করতে এবং তাদের সঠিক দিশা দেখাতে এগিয়ে আসেন বিশ্বনাথ রায় ও সন্তোষ মণ্ডল।তাঁদের সাথে আরও নয়জন শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব যুক্ত হন।এই মোট এগারো জন স্বপ্নদ্রষ্টার যৌথ উদ্যোগ ও সুদৃঢ় সংকল্পের ফসল হিসেবেই গড়ে ওঠে বিদ্যালয়টি।

প্রতিষ্ঠালগ্নে পথচলাটা খুব সহজ ছিল না।সূচনা পর্বে মাত্র ১১ জন ডেডিকেটেড শিক্ষক-শিক্ষিকাকে পাশে পেয়েছিলেন উদ্যোক্তারা। আর সেই সীমিত পরিকাঠামো নিয়ে স্কুলে ভর্তি হয়েছিল ৪৫০ জন ছাত্র-ছাত্রী।তবে সংকল্প যেখানে দৃঢ়,সেখানে প্রতিবন্ধকতা হার মানতে বাধ্য। সীমিত সম্পদ সত্ত্বেও শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থীদের প্রতি ব্যক্তিগত নজরদারির কোনো খামতি ছিল না।শিক্ষকমণ্ডলীর নিরলস পরিশ্রম আর উদ্যোক্তাদের সঠিক ব্যবস্থাপনায় খুব অল্প সময়েই এলাকাবাসীর মধ্যে এক গভীর আস্থার পরিবেশ তৈরি হয়।

সময়ের সাথে বিস্তার: পরিকাঠামো ও বর্তমান রূপরেখা

 

 

সাফল্যের আলো ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগে না। প্রথম বছরের সাফল্যের পর থেকে এই স্কুলে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির ঢল নামে। অভিভাবকরা বুঝতে পারেন, ঘরের কাছেই এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে যেখানে সন্তান শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়, নীতি ও আদর্শের শিক্ষা পাবে।

বর্তমানে টার্নিং পয়েন্ট স্কুলের কলেবর অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে। সময়ের সাথে সাথে এখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে মোট ৫৫০ জনে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সুবিধার্থে বিদ্যালয়টিকে আবাসিক ও অনাবাসিক এই দুই ধারায় সাজানো হয়েছে:

 

আবাসিক বিভাগ:দূর-দূরান্ত থেকে আসা ২৫০ জন শিক্ষার্থী এখন স্কুলের আবাসিক সুবিধায় থেকে নিয়মিত পঠনপাঠন চালাচ্ছ।

অনাবাসিক বিভাগ:স্থানীয় ৩০০ জন ছাত্র-ছাত্রী প্রতিদিন বাড়ি থেকে এসে এই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে।একই সাথে বৃদ্ধি করা হয়েছে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর সংখ্যাও।বর্তমানে এই শিক্ষায়তনে ৩০ জন দক্ষ শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং কর্মী যুক্ত রয়েছেন, যাঁরা পরম স্নেহে ও আন্তরিকতায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও দেখাশোনা করে চলেছেন।

 

প্রথম ব্যাচেই চমক:সাফল্যের শিখরে শিক্ষার্থীরা

কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আসল পরিচয় ফুটে ওঠে তার শিক্ষার্থীদের ফলাফলে।টার্নিং পয়েন্ট স্কুল তাদের প্রথম ব্যাচেই প্রমাণ করে দিয়েছে যে সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীরাও অলৌকিক কাণ্ড ঘটাতে পারে।

প্রথম ব্যাচের শিক্ষাবর্ষেই এই স্কুলের শিক্ষার্থীরা অসাধারণ ফলাফল অর্জন করে সবাইকে চমকে দেয়।

ব্যাচের সর্বোচ্চ নম্বর ছিল ৬৩২।

 

মোট দু’শো (২০০) জন ছাত্র-ছাত্রী ৮০ শতাংশের (80%) বেশি নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হয়।

এই অভূতপূর্ব ফল শুধু স্কুলের সুনামই বৃদ্ধি করেনি বরং লালুটোলার মতো এলাকায় শিক্ষা সংক্রান্ত ধারণাই বদলে দিয়েছে।সাধারণ পরিবারের সন্তানরাও যে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে সেই বিশ্বাস এখন প্রতিটি ঘরে ঘরে।

 

উচ্চশিক্ষার পথ সুগম: কলা ও বিজ্ঞান বিভাগ

 

 

একটি স্কুলের দায়িত্ব শুধু প্রাথমিক বা মাধ্যমিক স্তরেই শেষ হয়ে যায় না।শিক্ষার্থীরা যাতে উচ্চশিক্ষার আঙিনায় পৌঁছানোর জন্য সঠিক ভিত্তি তৈরি করতে পারে সে কথা মাথায় রেখে টার্নিং পয়েন্ট স্কুলে চালু করা হয়েছে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীর পাঠদান।

উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের মেধা ও রুচি অনুযায়ী দুটি প্রধান শাখা খোলা হয়েছে:

 

কলা বিভাগ (Arts Stream): সমাজবিদ্যা,সাহিত্য ও মানবিক বিষয়ে পারদর্শী করে তুলতে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা।

 

বিজ্ঞান বিভাগ (Science Stream): প্রযুক্তি ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতো উচ্চতর বিষয়ে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করার জন্য আধুনিক পাঠ্যক্রম ও চর্চার পরিবেশ।

দক্ষ শিক্ষকমণ্ডলীর তত্ত্বাবধানে প্রতি বিষয়ে খুঁটিনাটি বুঝিয়ে পড়ানো হয় যাতে জাতীয় স্তরের বিভিন্ন প্রবেশিকা পরীক্ষাতেও এখানকার শিক্ষার্থীরা লড়াই করতে পারে।

সুদৃঢ় নেতৃত্ব ও আগামীর দিগন্ত

যেকোনো সফল প্রতিষ্ঠানের পেছনে থাকে দক্ষ নেতৃত্ব। টার্নিং পয়েন্ট স্কুলের চালিকাশক্তি হিসেবে রয়েছেন দুই কণ্ডারী সম্পাদক বিশ্বনাথ রায় এবং প্রধান শিক্ষক সন্তোষ মণ্ডল।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সন্তোষ মণ্ডল প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য ও ভবিষ্যৎ ভাবনা নিয়ে জানান,আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য কেবল সিলেবাস শেষ করা নয়,বরং সীমান্ত ঘেঁষা এই প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার সার্বিক মান উন্নত করা। আমাদের এলাকার প্রতিটি মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীর ভিতরের সুপ্ত মেধা ও প্রতিভাকে ঘষে-মেজে আরও উজ্জ্বল করে তোলাই আমাদের দৈনন্দিন লড়াই।আমরা চাই লালুটোলার কোনো শিশু যেন সঠিক নির্দেশনার অভাবে পিছিয়ে না পড়ে।

 

সম্পাদক বিশ্বনাথ রায়ের সুচিন্তিত পরিকল্পনা এবং প্রধান শিক্ষক সন্তোষ মণ্ডলের কর্মসংকল্পে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি চরিত্র গঠন, শৃঙ্খলা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার শিক্ষাও দেওয়া হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।

আলোর পথে লালুটোলা

 

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যেমন বেড়েছে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা, তেমনই ধাপে ধাপে বৃদ্ধি পেয়েছে পঠনপাঠন ও পরিকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা।সব মিলিয়ে লালুটোলা ও সংলগ্ন বিস্তীর্ণ অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের কাছে টার্নিং পয়েন্ট স্কুল আজ সত্যি এক ‘টার্নিং পয়েন্ট’ বা জীবন পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যে শিক্ষার আলো ২০২৩ সালে জ্বেলেছিলেন ১১ জন স্বপ্নদ্রষ্টা, আজ সেই আলো ছড়িয়ে পড়েছে শত শত পরিবারে। গোলাপগঞ্জের লালুটোলার মাটি থেকে তৈরি হওয়া এই শিক্ষার ভিত আগামী দিনে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে দেবে নতুন নতুন তারা এই প্রত্যাশাই আজ সকলের।


 

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

আজকের খবর