[pj-news-ticker]

ব্লক করলেই হেনস্তা!

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আজ মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের সহজ মাধ্যম। মুহূর্তের মধ্যে পরিচয়, বন্ধুত্ব, কথোপকথন সবই সম্ভব হচ্ছে একটি স্মার্টফোনের পর্দায়। কিন্তু এই প্রযুক্তির দুনিয়াতেই যখন কারও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, পছন্দ-অপছন্দ এবং নিরাপত্তা বিপন্ন হয়ে ওঠে, তখন প্রশ্ন ওঠে আমাদের সামাজিক মানসিকতা....

ব্লক করলেই হেনস্তা!

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আজ মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের সহজ মাধ্যম। মুহূর্তের মধ্যে পরিচয়, বন্ধুত্ব, কথোপকথন সবই সম্ভব....

Facebook
Twitter
LinkedIn
Email
WhatsApp
X
Threads
Telegram

আরও পড়ুন


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আজ মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের সহজ মাধ্যম। মুহূর্তের মধ্যে পরিচয়, বন্ধুত্ব, কথোপকথন সবই সম্ভব হচ্ছে একটি স্মার্টফোনের পর্দায়। কিন্তু এই প্রযুক্তির দুনিয়াতেই যখন কারও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, পছন্দ-অপছন্দ এবং নিরাপত্তা বিপন্ন হয়ে ওঠে, তখন প্রশ্ন ওঠে আমাদের সামাজিক মানসিকতা নিয়ে। ইনস্টাগ্রামে মেসেজের উত্তর না দেওয়া কিংবা কাউকে ব্লক করে দেওয়ার মতো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ‘শাস্তি’ যদি কোনও তরুণীকে রাস্তায় হেনস্তার শিকার হতে হয় তবে তা শুধু একটি অপরাধের অভিযোগ নয়, সমাজের সুস্থতার পক্ষেও এক অশনিসংকেত। বারাকপুরের মণিরামপুরে এক গৃহশিক্ষিকাকে কেন্দ্র করে ওঠা এমনই অভিযোগ নতুন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতি অসম্মান কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
অভিযোগ, ইনস্টাগ্রামে বারবার মেসেজ পাঠিয়ে ওই গৃহশিক্ষিকাকে উত্তর দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন দুই যুবক। তাঁদের ব্লক করলে ভালো পরিণতি হবে না বলেও হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি তরুণীর। শুক্রবার টিউশন পড়াতে যাওয়ার পথে মণিরামপুর ব্যায়াম সমিতি এলাকার একটি গলিতে তাঁর পথ আটকে হাত ধরে টানাটানি এবং শ্লীলতাহানির অভিযোগ উঠেছে অর্ক সাহা ও দীপ কুণ্ডুর বিরুদ্ধে। ঘটনার পর পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি জানান তরুণী। অভিযোগের ভিত্তিতে দু’জনকে গ্রেপ্তার করেছে বারাকপুর থানার পুলিশ। শুরু হয়েছে তদন্ত। তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, অভিযোগের যথাযথ তদন্ত, নির্যাতিতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দোষ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।
প্রথমেই স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারও সঙ্গে কথা বলা বা না বলা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। কেউ মেসেজের উত্তর দিতে না চাইলে, বন্ধুত্ব রাখতে অস্বীকার করলে কিংবা কোনও ব্যক্তিকে ব্লক করলে, সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়াই সভ্য আচরণের পরিচয়। পরিচিতি থাকলেই অন্যের ব্যক্তিগত পরিসরে প্রবেশের অধিকার জন্মায় না। বন্ধুত্বের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়া কোনও অপরাধ নয় কিন্তু প্রত্যাখ্যান মেনে নিতে না পেরে কাউকে ভয় দেখানো, অনুসরণ করা কিংবা শারীরিকভাবে হেনস্তা করার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। ভালো লাগা কখনও জোরজবরদস্তির লাইসেন্স হতে পারে না।সম্পর্কের নামে অধিকার ফলানোর মানসিকতা আসলে সম্মানের অভাবকেই সামনে আনে।
আরও উদ্বেগের বিষয়, অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানিকে নিছক দুষ্টুমি, সামান্য মজা কিংবা তরুণ বয়সের আবেগ বলে এড়িয়ে যেতে চান। এই প্রবণতা বিপজ্জনক। অনবরত মেসেজ পাঠানো, উত্তর দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা, প্রত্যাখ্যানের পর হুমকি দেওয়া এ ধরনের আচরণ ধীরে ধীরে একজন মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনকেও আতঙ্কিত করে তুলতে পারে। ভার্চুয়াল জগতে শুরু হওয়া হয়রানি বাস্তবের রাস্তায় এসে দাঁড়ালে তার পরিণতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। তাই প্রথম থেকেই এমন আচরণকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি। ডিজিটাল দুনিয়ায় স্বাধীনতার অর্থ যেমন নিজের পছন্দমতো যোগাযোগ করা, তেমনই অন্যের যোগাযোগ প্রত্যাখ্যান করার অধিকারকেও সম্মান করা।

এই ঘটনায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে মেয়েদের নিরাপত্তা কি এখনও তাঁদের চলাফেরার সতর্কতা, পোশাক কিংবা পরিচিত মানুষের ওপর নির্ভর করে বিচার করা হবে? একজন গৃহশিক্ষিকা নিজের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন। সেই স্বাভাবিক যাতায়াতের পথে তাঁকে হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে বলে অভিযোগ। কোনও তরুণীকে কেন প্রতিটি গলি দিয়ে যাওয়ার সময় আশঙ্কা নিয়ে ভাবতে হবে, কে তাঁর পথ আটকে দাঁড়াবে? নিরাপদে পড়াতে যাওয়া, কাজ করা কিংবা নিজের মতো জীবনযাপন করা কোনও বিশেষ সুবিধা নয়, নাগরিক অধিকার। সেই অধিকার রক্ষার দায়িত্ব পরিবার, সমাজ, প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর।
তবে অভিযোগের বিচার করতে গিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাকেও সমর্থন করা যায় না। ঘটনার পর এক অভিযুক্ত স্থানীয়দের হাতে গণপ্রহারের শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। অপরাধের অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, তার বিচার করার দায়িত্ব আদালতের। জনরোষের নামে মারধর কোনও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে না বরং পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। পুলিশের উচিত নিরপেক্ষভাবে সমস্ত অভিযোগ ও প্রমাণ খতিয়ে দেখা এবং প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ করা। একই সঙ্গে অভিযোগকারী তরুণীর নিরাপত্তা, মানসিক স্বস্তি ও মর্যাদা রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।

পরিবারের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানদের শুধু স্মার্টফোন ব্যবহার শেখালেই দায়িত্ব শেষ হয় না,শেখাতে হবে সম্মতি, সংযম এবং প্রত্যাখ্যান মেনে নেওয়ার শিক্ষা। স্কুল-কলেজে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও নারী-সম্মান নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাউকে ব্লক করা মানেই শত্রুতা নয়, অনেক সময় সেটি নিজের নিরাপত্তা ও মানসিক শান্তি রক্ষার উপায়। সেই সিদ্ধান্তকে সম্মান করতে শেখাই সুস্থ সমাজের প্রথম পাঠ।
বারাকপুরের এই ঘটনা ঘিরে ওঠা অভিযোগের সত্যতা তদন্তেই স্পষ্ট হবে। কিন্তু ঘটনাটি যে প্রশ্ন সামনে এনেছে, তা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। প্রযুক্তি যত আধুনিক হচ্ছে, মানুষের মানসিকতাও কি ততটা পরিণত হচ্ছে? অন্যের ‘না’ মেনে নেওয়ার শিক্ষা যদি না থাকে তবে ডিজিটাল বন্ধুত্বও বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে। মনে রাখতে হবে, ইনস্টাগ্রামে ব্লক হওয়া কোনও অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার অজুহাত নয়।একজন নারীর ‘না’ তাঁর অধিকার, আর সেই অধিকারকে সম্মান করাই সভ্যতার পরিচয়।


 

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

আজকের খবর