ব্রেকিং
[pj-news-ticker]

পাকা ধানে মেঘের মই

বাপন দেব লাড়ু ঘূর্ণিঝড়ের খবর এলেই আমরা সাবধান হই, বিপদ কাটলেই ভুলে যাই। এই চক্র ভাঙবে কবে? কার্তিকের শেষ বিকেল। মাঠের পর মাঠ জুড়ে আমন ধান সোনালি হয়ে মাথা নুইয়েছে। চাষির চোখে তখন হিসেবের খাতা খোলা। এবার ফলন ভালো, মহাজনের....

পাকা ধানে মেঘের মই

বাপন দেব লাড়ু ঘূর্ণিঝড়ের খবর এলেই আমরা সাবধান হই, বিপদ কাটলেই ভুলে যাই। এই চক্র ভাঙবে....

Facebook
Twitter
LinkedIn
Email
WhatsApp
X
Threads
Telegram

আরও পড়ুন


বাপন দেব লাড়ু

ঘূর্ণিঝড়ের খবর এলেই আমরা সাবধান হই, বিপদ কাটলেই ভুলে যাই। এই চক্র ভাঙবে কবে?

কার্তিকের শেষ বিকেল। মাঠের পর মাঠ জুড়ে আমন ধান সোনালি হয়ে মাথা নুইয়েছে। চাষির চোখে তখন হিসেবের খাতা খোলা। এবার ফলন ভালো, মহাজনের ধার শোধ হবে, ঘরের চালটাও হয়তো ছাওয়া যাবে। ঠিক এই সময়েই আকাশের কোণে জমছে কালো মেঘ। বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপ ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া দফতর। ২৮ অক্টোবর থেকে দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা। ঝড়ের মূল গতিপথ অন্ধ্র-ওডিশা উপকূলের দিকে হলেও তার ঝাপটা থেকে বাংলা পুরোপুরি রেহাই পাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। পাকা ধানের শত্রু শুধু ঝোড়ো হাওয়া নয়, অসময়ের বৃষ্টিও। কাটা ধান মাঠে ভিজলে দানা কালচে হয়, ভেঙে যায়, হাটে দাম পড়ে। খড় পচলে গোয়ালের গরুর খাবারও জোটে না। আলু আর শীতের সবজির বীজতলা জলে ডোবে। ক্ষতির হিসেবে শুধু জমির মালিকই নন। ধান কাটার দিনমজুর, ট্রলার বন্ধ হয়ে যাওয়া জেলে, ভ্যানচালক, সবার রোজগারে টান পড়ে। সমুদ্রে না যাওয়ার নির্দেশ মেনে যে জেলে ঘরে বসে থাকেন, তাঁর উনুন জ্বলবে কীসে, সতর্কবার্তায় সে উত্তর থাকে না। প্রতিবার চিত্রনাট্য একই: ঝড়ের আগে সতর্কবার্তা, ঝড়ের সময় ক্যামেরা, ঝড়ের পরে নীরবতা। আজ প্রায় প্রতিটি হাতে মোবাইল, সতর্কবার্তা পৌঁছে যায় নিমেষে। কিন্তু সেই বার্তা পেয়ে চাষি করবেন কী? কাটা ধান রাখবেন কোথায়? ত্রিপল কোথায় পাবেন? সেই রাতে সমবায়ের গুদাম কি খোলা থাকবে? পূর্বাভাস যদি শুধু খবরের শিরোনাম হয়ে থাকে, তা তথ্য, সুরক্ষা নয়। সুরক্ষা তখনই, যখন সতর্কবার্তার পিছনে থাকে হাতে-কলমে ব্যবস্থা। “ভারী বৃষ্টি হতে পারে” বলার চেয়ে অনেক বেশি কাজের কথা হল “আগামী দু-দিন ধান কাটা স্থগিত রাখুন”। সেই কথাটুকু যদি ব্লক-স্তরে, সহজ বাংলায়, এসএমএস আর হোয়াটসঅ্যাপে চাষির হাতে পৌঁছে যায়, আর একই সঙ্গে ব্লক অফিসে মজুত থাকে ত্রিপল, সতর্ক সময়ে খোলা থাকে সমবায় শেড বা সরকারি গুদাম, তবে অর্ধেক ক্ষতি ঝড়ের আগেই ঠেকানো যায়।

বাকি অর্ধেকের দায় ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থার। ফসল বিমা আর ক্ষয়ক্ষতির জরিপ কাগজে চমৎকার। বাস্তবে জরিপ আসে দেরিতে, সহায়তা আসে আরও দেরিতে। ভাগচাষি ও বর্গাদার, যাঁদের নামে জমির দলিল নেই, প্রায়ই তালিকার বাইরে থেকে যান। এ অভিযোগ নতুন নয়। যিনি মাঠে ঘাম ঝরান, ক্ষতির দায়ও তাঁর ঘাড়ে, অথচ সহায়তার দরজা তাঁর জন্যই সবচেয়ে সরু। বিমার দাবি নিষ্পত্তির একটা বেঁধে দেওয়া সময়সীমা থাকলে, আর সেই তালিকায় ভাগচাষিরা সবার আগে জায়গা পেলে, এই দরজা খানিকটা চওড়া হতে পারে। তার ওপর জলবায়ুর নির্মম রসিকতা তো আছেই। গবেষকদের পর্যবেক্ষণ, এক সময় পুরোপুরি বৃষ্টিনির্ভর আমন ধানেও এখন একাধিকবার সেচ লাগে, কারণ বর্ষার চরিত্র অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। সাগরের জল উষ্ণ হলে ঘূর্ণিঝড় আরও তীব্র হওয়ার প্রবণতা বাড়ে, এ কথাও বিজ্ঞানীরা বলছেন। আম্ফানের স্মৃতি সুন্দরবনের মানুষের গায়ে এখনও দগদগে। এখন বর্ষা আসে দেরিতে, যায় আরও দেরিতে। কখনও খরা, কখনও জলোচ্ছ্বাস। একই মরসুমে প্রকৃতি যেন চাষির সঙ্গে দুটো উল্টো রসিকতা করছে। এর মোকাবিলা শুধু ত্রাণে হয় না। উপকূলের বাঁধ মেরামত ও ম্যানগ্রোভ রোপণ চলা চাই সারা বছর, ঝড়ের মরসুমের তাড়াহুড়োয় নয়। আর স্বল্পমেয়াদি, জলমগ্নতা-সহনশীল ধানের জাত সময়মতো ন্যায্য দামে চাষির হাতে পৌঁছোনো চাই, যাতে আকাশের মর্জির ওপর ভরসা কিছুটা কমে। ঝড় শেষ পর্যন্ত কতটা ক্ষতি করবে, তা বলবে সময়। হয়তো দু-এক দিনের বৃষ্টিতেই সব মিটে যাবে, হয়তো যাবে না। কিন্তু প্রশ্নটা ঝড়ের চেয়ে বড়। মেঘের তো দোষ নেই, সে তার নিয়মে আসে, নিয়মে যায়। দোষ আমাদের ভুলে যাওয়ার অভ্যাসে। ঝড় থামলেই আমরা সব ভুলে যাই, আর পরের মরসুমে সেই একই আকাশের দিকে তাকিয়ে চাষি প্রার্থনা করেন। এবার প্রার্থনা নয়, দরকার প্রস্তুতি। যে মাটি আমাদের পাতে ভাত তোলে, তার পাশে দাঁড়ানোর দায় শুধু আকাশের নয়, আমাদেরও।


 

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

আজকের খবর