নয়া জামানা : একটা মোবাইল ফোন হারিয়েছিলেন তিনি। অভিযোগ জানাতে থানায় গিয়েও ঠিকমতো সাহায্য পাননি। ছোট্ট এই ঘটনাই একদিন বদলে দিয়েছিল তাঁর জীবনের লক্ষ্য। সেদিনই তিনি ঠিক করেছিলেন, একদিন নিজেই পুলিশ অফিসার হবেন। সেই সংকল্প থেকেই শুরু হয় দীর্ঘ লড়াই—আর্থিক অনটন, ছোট গ্রামের সীমিত সুযোগ আর পরিবারের কষ্টকে পিছনে ফেলে UPSC-র প্রস্তুতি। শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্নই সত্যি হয়েছে।
মহারাষ্ট্রের কোলহাপুর জেলার কাগল তহশিলের ইয়ামগে গ্রামের বাসিন্দা বিরুদেব সিদ্ধাপ্পা ঢোণ আজ বহু তরুণের কাছে অনুপ্রেরণার নাম। ২০২৪ সালের UPSC সিভিল সার্ভিসেস পরীক্ষায় সর্বভারতীয় ৫৫১তম র্যাঙ্ক করে তিনি IPS পদের জন্য নির্বাচিত হন, তাও তৃতীয় প্রচেষ্টায়। সাফল্য পাওয়ার সময় তাঁর বয়স ছিল ২৭ বছর।
বিরুদেবের পরিবার আর্থিকভাবে ছিল দুর্বল। তাঁর বাবা সিদ্ধাপ্পা দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর সংসারের দায়িত্ব সামলাতে ছাগল চরানোর কাজ শুরু করেন। অভাব ছিল, কিন্তু ছেলের পড়াশোনায় বাবা-মা কখনও পিছিয়ে যাননি। শুরু থেকেই পড়াশোনায় ভালো ছিলেন বিরুদেব। কাগল তহশিলের মুরগুড় কেন্দ্রে দশম ও দ্বাদশ শ্রেণিতে ভালো ফল করার পর তিনি ভর্তি হন পুনের বিখ্যাত COEP ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে।
বিরুদেবের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে একটি ছোট্ট ঘটনায়। একদিন তাঁর মোবাইল ফোন হারিয়ে যায়। অভিযোগ জানাতে থানায় গেলেও প্রত্যাশিত সাহায্য না পাওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁকে ভিতর থেকে নাড়িয়ে দেয়। সেই মুহূর্তেই তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে—পুলিশ যদি মানুষের সমস্যা সমাধানের জায়গা হয়, তাহলে তিনি নিজেই কেন পুলিশ অফিসার হবেন না? এই একটি অভিজ্ঞতাই তাঁর মধ্যে IPS হওয়ার সংকল্পকে আরও দৃঢ় করে তোলে।
ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পড়াশোনা শেষ করে বিরুদেব UPSC-র প্রস্তুতির জন্য পাড়ি দেন দিল্লিতে। কিন্তু এখানেও বাধা ছিল অর্থ। পরিবারের হাতে বাড়তি সঞ্চয় ছিল না, তবু ছেলের স্বপ্ন যাতে থমকে না যায়, সেজন্য বাবা প্রতি মাসে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা পাঠাতেন। দিল্লির মতো শহরে থাকা-খাওয়া ও পড়াশোনার খরচ আর বাড়ির সীমিত আয়ের মধ্যে ভারসাম্য রেখেই এগিয়েছেন বিরুদেব। পরিস্থিতির চাপে বাবা মাঝেমধ্যে অন্য কোনও চাকরি নেওয়ার পরামর্শও দিয়েছিলেন। কিন্তু নিজের লক্ষ্য থেকে সরে আসেননি বিরুদেব।
২০২৪ সালের UPSC সিভিল সার্ভিসেস পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর আসে জীবনের সবচেয়ে বড় খবর—সর্বভারতীয় ৫৫১তম র্যাঙ্ক, তৃতীয় প্রচেষ্টায়। এই সাফল্য শুধু বিরুদেবের একার নয়, গোটা কাগল তহশিলের জন্যও ছিল এক বিশেষ মুহূর্ত। একাধিক প্রতিবেদনে তাঁকে এই তহশিল থেকে UPSC-তে সফল হওয়া প্রথম প্রার্থী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত ছিল তাঁর বাবা-মায়ের জন্য। র্যাঙ্ক বা পরীক্ষার জটিল হিসেব হয়তো তাঁরা পুরোপুরি বুঝতে পারেননি, কিন্তু একটা কথা ঠিকই বুঝেছিলেন—তাঁদের ছেলে এবার ‘সাহেব’ হয়েছে।
বিরুদেবের গল্পকে শুধু “ছাগল চরানো পরিবারের ছেলে IPS হলেন” বলে সীমাবদ্ধ রাখলে তার আসল তাৎপর্য অধরা থেকে যায়। মোবাইল হারানোর ঘটনা তাঁকে হতাশ করতে পারত, পরিবারের আর্থিক টানাপোড়েন চাকরি নিতে বাধ্য করতে পারত, বাবার সীমিত আয় স্বপ্ন ছাড়তে বাধ্য করতে পারত—কিন্তু প্রতিটি প্রতিকূলতাকেই তিনি লক্ষ্যের দিকে এক ধাপ এগোনোর কারণ বানিয়েছেন। আজ বাবা ছাগল চরিয়েছেন, আর ছেলে সেই পরিবারের নাম পৌঁছে দিয়েছেন দেশের অন্যতম কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মেধাতালিকায়। বিরুদেব সিদ্ধাপ্পা ঢোণের এই যাত্রা তাই হাজার হাজার UPSC পরীক্ষার্থীর কাছে এক বার্তা বহন করে—শুরুটা যত কঠিনই হোক, স্বপ্ন বড় হলে লড়াই থামে না।
মৃত মায়ের চোখ বিক্রি করল ছেলে, ক্ষুব্ধ জনতার আক্রমণে গোটা পরিবার