নয়া জামানা, মুর্শিদাবাদ : বেলডাঙার ১৬ বছরের কিশোর ইকবাল শেখকে ঘিরে এলাকায় তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া— একদিকে কৌতূহল, অন্যদিকে উদ্বেগ। গত প্রায় পাঁচ বছর ধরে দিনের পর দিন তাকে এলাকার বিভিন্ন পুকুরের জলে থাকতে দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সংশ্লিষ্ট একটি ভিডিয়ো সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি আরও বেশি নজরে আসে।

স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, ইকবাল কখনও টানা চার-পাঁচ দিন, আবার কখনও প্রায় এক সপ্তাহ পর্যন্ত পুকুরের জলেই থাকে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তাকে জলে ভাসতে দেখা যায়, এমনকি কখনও কখনও এক পুকুর ছেড়ে অন্য পুকুরেও চলে যায় সে। এই অস্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু হয়েছিল বলে জানা যাচ্ছে, যখন ইকবালের বয়স ছিল প্রায় ১১ বছর— অর্থাৎ প্রায় পাঁচ বছর আগে থেকে।
ইকবালের নিজের বক্তব্য, জলের বাইরে থাকলেই তার সারা শরীরে তীব্র জ্বালাপোড়া শুরু হয়। সেই কষ্ট থেকে মুক্তি পেতেই সে বারবার জলে ফিরে যায়, এবং জলে থাকলে তার শরীর অনেকটা স্বস্তি পায় বলে সে জানিয়েছে। নিজের এই সমস্যার পিছনে সে একটি অতিপ্রাকৃত শক্তির কথা বিশ্বাস করে। তবে এই বিশ্বাসের সপক্ষে এখনও পর্যন্ত কোনও চিকিৎসাবিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ মেলেনি। তাই বিষয়টিকে ইকবালের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও বিশ্বাস হিসেবেই দেখা প্রয়োজন, কোনও প্রতিষ্ঠিত কারণ হিসেবে নয়।
দীর্ঘ সময় জলে থাকার প্রভাব ইতিমধ্যেই তার শরীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। ইকবালের হাত, পা-সহ শরীরের বিভিন্ন অংশের ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে গিয়ে কুঁচকে গিয়েছে। তার সর্দি-কাশির সমস্যার কথাও উঠে এসেছে স্থানীয়দের বয়ানে। চিকিৎসকদের একাংশের বক্তব্য, দীর্ঘ সময় জলে থাকলে ত্বকের স্বাভাবিক প্রতিরোধক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, ফলে ছত্রাকঘটিত-সহ নানা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। শুধু ত্বক নয়, দীর্ঘক্ষণ জলে থাকার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে আরও কিছু শারীরিক জটিলতাও।
১১ আগস্ট প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় জলে থাকার ফলে ত্বক ও ছত্রাকঘটিত সংক্রমণের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। তবে জল থেকে উঠলেই কেন তীব্র জ্বালাপোড়া হয়, তার প্রকৃত কারণ জানতে সরাসরি চিকিৎসকী পরীক্ষা প্রয়োজন বলে জানানো হয়েছে। ইকবালের মানসিক অবস্থা বা বিশ্বাসের সঙ্গে তার শারীরিক উপসর্গের কোনও সম্পর্ক আছে কি না, সেটিও বিশেষজ্ঞ মূল্যায়নের বিষয় বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
একাধিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইকবাল স্থানীয় ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু প্রয়োজনীয় সহায়তা সে পায়নি বলে দাবি। পরিবারের আর্থিক অবস্থাও সচ্ছল নয়, ফলে বেসরকারি হাসপাতালে বিস্তারিত পরীক্ষা বা দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার খরচ বহন করা তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইকবালের প্রকৃত শারীরিক সমস্যা নির্ণয় করাই এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
পুকুরে থাকার সময়েও ইকবালের স্বাভাবিক জীবন পুরোপুরি থমকে যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে চিঁড়ে, বিস্কুট-সহ খাবার দিয়ে সাহায্য করছেন। প্রতিদিন স্কুলপড়ুয়া থেকে শুরু করে এলাকার বহু মানুষ পুকুরের ধারে ভিড় জমাচ্ছেন তাকে দেখতে। ফলে একজন কিশোরের শারীরিক সমস্যা ধীরে ধীরে জনকৌতূহলের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিছু প্রতিবেদনে বিষয়টিকে ত্বকজনিত অসুস্থতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, আবার অন্য প্রতিবেদনে কোনও নির্দিষ্ট রোগের নাম নিশ্চিতভাবে উল্লেখ করা হয়নি। এখনও পর্যন্ত এমন কোনও প্রকাশ্য চিকিৎসা-নথি সামনে আসেনি, যেখানে ইকবালের সমস্যার সুনির্দিষ্ট রোগনির্ণয় জানানো হয়েছে।
তাই ঘটনাটিকে শুধুমাত্র অলৌকিক বলে দেখারও সুযোগ নেই, আবার কোনও নির্দিষ্ট রোগ ধরে নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোও ঠিক হবে না। বর্তমানে যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তা থেকে এটুকু স্পষ্ট যে ১৬ বছরের এই কিশোর দীর্ঘ সময় পুকুরের জলে থাকছে, জলের বাইরে গেলে তীব্র জ্বালাপোড়ার কথা জানাচ্ছে এবং এই সমস্যার কারণ নিয়ে তার নিজস্ব একটি বিশ্বাস রয়েছে। পাশাপাশি, দীর্ঘ সময় জলে থাকার ফলে তার শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে বলেও একাধিক সূত্রে উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইকবালের ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন সঠিক চিকিৎসা-পরীক্ষা, যাতে তার প্রকৃত শারীরিক সমস্যার কারণ নির্ণয় করা যায় এবং কিশোরটিকে যথাযথ চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয়।