আমিনুর রহমান, নয়া জামানা, বর্ধমান: দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন বা জিআই স্বীকৃতি পেল পূর্ব বর্ধমানের পূর্বস্থলীর নতুনগ্রামের ঐতিহ্যবাহী কাঠের পুতুল। পশ্চিমবঙ্গের যে ১২টি পণ্য সম্প্রতি এই মর্যাদাপূর্ণ তকমা পেয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম নতুনগ্রামের এই শিল্প। এই আনন্দের খবর ছড়িয়ে পড়তেই গোটা নতুনগ্রাম জুড়ে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে। এই বিশেষ স্বীকৃতি উদযাপনে শিল্পীদের উদ্যোগে একটি অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়, যেখানে উপস্থিত ছিলেন শিল্প দপ্তরের আধিকারিকরা এবং পূর্বস্থলী উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক গোপাল চট্টোপাধ্যায় ও কালনার মহকুমাশাসক অহিনসা জৈন। বিধায়ক জানান, এই স্বীকৃতি শিল্পীদের দীর্ঘ পরিশ্রমের যোগ্য সম্মান এবং আগামী দিনে তাঁদের আর্থিক উন্নয়নে সবরকম সাহায্য করা হবে।
নতুনগ্রামে কাঠের পুতুল তৈরির ইতিহাস বহু প্রাচীন ও সমৃদ্ধ। ১৯৬৬ সালে এখানকার শিল্পী শম্ভুনাথ ভাস্কর কাঠের তৈরি দশ মাথার রাবণের জন্য রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পেয়েছিলেন। সেই সময় থেকেই দেশ-বিদেশে এই শিল্পের খ্যাতি ছড়াতে শুরু করে। দীর্ঘদিন ধরেই এখানকার শিল্পীদের প্রধান দাবি ছিল এই জিআই স্বীকৃতি, যা এবার পূরণ হলো। নতুনগ্রামের কাঠের পুতুল, কাঠের পেঁচা, গৌর-নিতাইয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী শিল্পকর্মের কদর বরাবরই ছিল। তবে এই জিআই তকমা পাওয়ার ফলে নকল পণ্যের হাত থেকে আইনি সুরক্ষা মিলবে এবং আসল শিল্পীরা তাঁদের পণ্যের সঠিক মূল্য পাবেন।
জিআই স্বীকৃতি মেলার পরপরই নতুনগ্রামে এসে পৌঁছায় ইউনেস্কোর একটি প্রতিনিধিদল। তাঁরা শিল্পীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাঁদের কাজ এবং কর্মশালা ঘুরে দেখেন। শিল্পীদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর আন্তর্জাতিক বাজারে এই কাঠের পুতুলের বাণিজ্যিক প্রসার ঘটাতে একগুচ্ছ পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে ইউনেস্কো। প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, খুব শীঘ্রই নতুনগ্রামের কাষ্ঠশিল্পীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি শিল্পীদের এমন আধুনিক যন্ত্রপাতি দেওয়া হবে যার মাধ্যমে অতি অল্প সময়ে আরও নিখুঁতভাবে পুতুল তৈরি করা সম্ভব।
ইউনেস্কোর এই উদ্যোগ এবং জিআই স্বীকৃতির যৌথ প্রভাবে নতুনগ্রামের শিল্পীরা এখন এক নতুন আশার আলো দেখছেন। বিশ্ব বাজারে বাণিজ্যিক পথ সুগম হওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতি আরও মজবুত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে, এই আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও আইনি সুরক্ষার হাত ধরে নতুনগ্রামের শতাব্দী প্রাচীন এই কাষ্ঠশিল্প শুধু রাজ্য বা দেশের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বিশ্বদরবারে এক অনন্য ও উজ্জ্বল পরিচিতি লাভ করবে।
জিআই মুকুটে বারুইপুর, তাইওয়ান গোলাপি পেয়ারায় বদলাচ্ছে কৃষকের ভাগ্য