নয়া জামানা ডেস্ক : ‘আগে নিজে ধর্ম পালন করুন, পরে অন্যকে নিয়ে কথা বলবেন।’ ‘ভ্রূণহত্যা’ কটাক্ষে মোদীকে পাল্টা তৃণমূলের । উল্লেখ্য,লোকসভায় মহিলা সংরক্ষণ সংক্রান্ত ১৩১তম সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করাতে না পারার ব্যর্থতার দায় বিরোধীদের কাঁধেই চাপালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বিল আটকে যাওয়ার ঠিক পরদিন, শনিবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে একযোগে দেশের প্রধান বিরোধী শক্তিগুলোকে নিশানা করলেন তিনি। তবে প্রধানমন্ত্রীর এই আক্রমণকে বিন্দুমাত্র রেয়াত করেনি পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। বরং পরিসংখ্যান সামনে এনে মোদীকে সরাসরি ‘আগে নিজে ধর্ম পালন’ করার পরামর্শ দিয়েছে জোড়াফুল শিবির। ঘাসফুল শিবিরের সাফ দাবি, লোকসভায় তৃণমূলের ৩৮ শতাংশ সাংসদ মহিলা হলেও খোদ বিজেপির ঘরে সেই হার মাত্র ১৩ শতাংশ। শনিবারের ভাষণে প্রধানমন্ত্রীর নিশানায় ছিল মূলত কংগ্রেস, তৃণমূল, ডিএমকে এবং সমাজবাদী পার্টি। তাঁর অভিযোগ, মহিলাদের রাজনৈতিক ভাবে শক্তিশালী করার যে সুযোগ এসেছিল, বিরোধীরা তা নষ্ট করেছে। প্রধানমন্ত্রীর কথায়, ‘সৎ চেষ্টার ভ্রূণহত্যা করল কংগ্রেস, ডিএমকে, তৃণমূলের মতো দলগুলি।’ বিশেষ করে লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস বা ডিলিমিটেশন নিয়ে বিরোধীরা দেশবাসীকে ভুল বোঝাচ্ছে বলেও অভিযোগ তোলেন তিনি। মোদী বলেন, ‘মহিলাদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল তৃণমূলের কাছে। কিন্তু সেই সুযোগ তারা নষ্ট করল।’ প্রধানমন্ত্রীর এই ঝাঁঝালো ভাষণের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় পরিসংখ্যান দিয়ে মাঠ গরম করেছে তৃণমূল। দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী যে ৩৩ শতাংশ মহিলা সংরক্ষণের কথা বলছেন, তা আদতে তাঁর নিজের দলেই নেই। পরিসংখ্যান বলছে, সংসদে বিজেপির ২৪০ জন সাংসদের মধ্যে মহিলা মাত্র ৩১ জন, যা শতাংশের হিসাবে মাত্র ১৩। সেখানে তৃণমূলের ২৯ জন সাংসদের মধ্যে ১১ জনই মহিলা, যা শতাংশের বিচারে ৩৮। অর্থাৎ তৃণমূলের মহিলা প্রতিনিধিত্ব বিজেপির তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি। এই তথ্য সামনে রেখেই তৃণমূলের কটাক্ষ, ‘আগে নিজে ধর্ম পালন করুন, পরে অন্যকে নিয়ে কথা বলবেন।’ রাজ্যের মন্ত্রী তথা মহিলা তৃণমূলের সভানেত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য প্রধানমন্ত্রীর ভাষণকে তীব্র আক্রমণ করেছেন। তাঁর মতে, প্রধানমন্ত্রী আসলে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করছেন। চন্দ্রিমা বলেন, “আপনি আচরি ধর্ম বলে একটা কথা আছে। এটা তো মহিলা সংরক্ষণ বিল ছিল না। উনি মহিলাদের বোকা ভাবছেন। সকলকেই জন্মাতে হয় মায়ের গর্ভে। মহিলাদের এত বোকা ভাবার কারণ নেই।” একই সুরে সরব হয়েছেন তৃণমূলের রাজ্যসভার দলনেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন। তাঁর সরাসরি অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী আসলে মহিলাদের ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছেন। বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া সংসদের বিশেষ অধিবেশনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পেশ করেছিল কেন্দ্র। কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী অর্জুন রাম মেঘওয়ালের আনা সেই তিনটি বিলের প্রথমটি ছিল লোকসভা ও বিধানসভায় এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণের ‘নারী শক্তি বন্দন অধিনিয়ম’। এই বিলের মধ্যেই লোকসভার আসন সংখ্যা বাড়িয়ে ৮৫০ করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। দ্বিতীয় বিলটি ছিল আসন পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত এবং তৃতীয়টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের আসন বৃদ্ধি নিয়ে। কিন্তু শুক্রবার ভোটাভুটিতে প্রথম বিলটিই আটকে যায়। যার জেরে শনিবার মোদীকে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে দেখা যায়। তৃণমূলের দাবি, যদি বিজেপির সদিচ্ছা থাকত, তবে তারা ৩৩ শতাংশে না থেমে ৫০ শতাংশ সংরক্ষণের প্রস্তাব দিত। অন্যদিকে কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা প্রদীপ ভট্টাচার্যও প্রধানমন্ত্রীর ধারণাকে তুলোধোনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ডিলিমিটেশন বা আসন পুনর্বিন্যাস নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর স্বচ্ছ ধারণা নেই। প্রদীপের ভাষায়, ‘মহিলা সংরক্ষণ বিলের জনকই কংগ্রেস। উনি যদি প্রমাণ করতে চান কংগ্রেস অন্যায় করেছে, তবে বাংলার মহিলারা প্রমাণ করে দেবেন যে তিনিই মহিলা সংরক্ষণ চান না।’ প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বার বার বিরোধী জোটকে আক্রমণ করে বোঝাতে চেয়েছেন, মোদী সরকার মহিলাদের অধিকার দিতে চাইলেও বিরোধীরা তা রুখে দিচ্ছে। কিন্তু তৃণমূল ও কংগ্রেসের পাল্টা আক্রমণে পাল্টে গিয়েছে যুদ্ধের মেজাজ। বিরোধীদের মূল প্রশ্ন, কেন আসন সংরক্ষণের সঙ্গে ডিলিমিটেশন বা আসন পুনর্বিন্যাসের শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে? তৃণমূলের মতে, সংরক্ষণের আসল উদ্দেশ্য থাকলে বিজেপি আগে নিজের সাংসদ তালিকায় সেই বদল আনত। সব মিলিয়ে, বিশেষ অধিবেশনের এই বিল ঘিরে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত এখন রাজপথের লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ‘ভ্রূণহত্যা’র তত্ত্বে যে দমার পাত্রী তৃণমূল নয়, তা চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের পরিসংখ্যান নির্ভর পাল্টা আক্রমণেই স্পষ্ট। লোকসভা নির্বাচনের মুখে ‘নারী শক্তি’র এই অধিকার নিয়ে দড়ি টানাটানি যে আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে, তার ইঙ্গিত শনিবাসরীয় যুদ্ধেই মিলেছে। মোদীকে তাঁর নিজের ভাষাতেই তৃণমূল বুঝিয়ে দিয়েছে— কথার চেয়ে কাজ বা পরিসংখ্যান অনেক বেশি শক্তিশালী। এখন দেখার, এই সংরক্ষণের রাজনীতি আগামী দিনে কোন নতুন মোড় নেয়।