নয়া জামানা ডেস্ক : সঙ্কট রান্নার গ্যাসের জোগান নিয়ে, আর তা নিয়েই তপ্ত বাংলার রাজনীতি। রান্নার গ্যাস ও বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের তীব্র অভাব এবং আকাশছোঁয়া দাম নিয়ে এবার সরাসরি ময়দানে নামলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সাধারণ মানুষের আতঙ্ক কাটাতে এবং বিকল্প পথের সন্ধানে আজ বৃহস্পতিবারই ডিলার ও উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসছেন তিনি। কেন্দ্রের ‘ভুল নীতি’র কারণেই দেশে এই কৃত্রিম অভাব তৈরি হয়েছে বলে তোপ দেগেছেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রয়োজনে আগামী সোমবার গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে তিলোত্তমার রাজপথে মিছিলে হাঁটার হুঁশিয়ারিও দিয়ে রেখেছেন তিনি। মূলত কেন্দ্রের পরিকল্পনার অভাবকেই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী করেছেন তিনি।
রাজ্যে এলপিজি সিলিন্ডার নিয়ে হাহাকার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বহু জায়গায় বুকিং করার আট-দশ দিন পরেও গ্যাস মিলছে না। এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের একটি ঘোষণাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। নতুন নিয়মে দু’টি সিলিন্ডার বুক করার মাঝে অন্তত ২৫ দিনের ব্যবধান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, এই একটি সিদ্ধান্তই সাধারণ মানুষের মনে চরম আতঙ্ক বা ‘প্যানিক’ তৈরি করেছে। মমতা স্পষ্ট জানিয়েছেন, কেন্দ্রের ভ্রান্ত নীতির কারণেই আজ গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র গৃহস্থের হেঁশেলে টান পড়েছে। তাঁর কথায়, ‘কেন ওরা বলে দিল, ২৫ দিন না হলে মানুষ গ্যাস পাবে না? পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের কাছে আমাদের দাবি, এসআইআর-এর নাম কাটার দিকে না তাকিয়ে, মানুষের অধিকার না কেড়ে গ্যাসের সমস্যা মেটান। জরুরি পরিষেবার দিকে নজর দিন। গ্যাসের জোগান যেন বন্ধ না হয়।’
বৃহস্পতিবারের বৈঠকে মূলত জোগানের সমস্যা মেটানোর পথ খুঁজবে নবান্ন। মুখ্যমন্ত্রী নিজে স্বীকার করেছেন যে, রাজ্যের আর্থিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তার ওপর গ্যাস বিষয়টি পুরোপুরি কেন্দ্রের এক্তিয়ারভুক্ত। তবু মানুষের স্বার্থে রাজ্য সরকার ভর্তুকি দেওয়ার কথা ভাবলেও তাতে আদতে লাভ দেখছেন না মমতা। তিনি অকপটে বলেন, ‘আমি তো ভর্তুকি দিতে চাই। তাতে লাভ হবে না। কারণ, গ্যাসের জোগানই নেই! গ্রামবাংলা থেকে শহর— সকলের এতে সমস্যা হচ্ছে। আমি এটা নিয়ে কথা বলেছি। বৃহস্পতিবারই বৈঠক ডেকেছি। একটা কিছু বিকল্প ভাবা দরকার। দেখছি কী করা যায়।’ বুধবার বিকেলে আলিপুরের ‘সৌজন্যে’ গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থাগুলির সঙ্গে একপ্রস্থ বৈঠক সেরেছেন তিনি। সেখানে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, রাজ্যের গ্যাস যাতে আপাতত বাইরে না যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এমনকি বাণিজ্যিক গ্যাসের ক্ষেত্রেও মোট মজুতের অন্তত দুই শতাংশ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি, যাতে রেস্তরাঁ বা হোটেলের ঝাঁপ বন্ধ না হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, গ্যাসের এই আকালকে হাতিয়ার করে ভোটের মুখে মোদী সরকারকে সাঁড়াশি আক্রমণে বিঁধতে চাইছে তৃণমূল। বুধবার থেকেই দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে ময়দানে নামিয়ে দিয়েছেন মমতা। বিধানসভার স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম— সকলেই সরব হয়েছেন মিড ডে মিল, মা ক্যান্টিন এবং হস্টেলের রান্না নিয়ে। দিঘার জগন্নাথ মন্দিরে ভক্তদের জন্য তৈরি ভোগ বিতরণেও রাশ টানা হচ্ছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে মুখ্যমন্ত্রী সাফ জানিয়েছেন, ‘অটো, আইসিডিএস, মিড ডে মিল, বাড়ির রান্নার গ্যাস, ছোটখাটো রেস্তরাঁর সমস্যা মেটাতে হবে। ওদের আগে মানুষের কথা ভাবা দরকার। এটা কেন্দ্রের হাতে। আমরা চাই, দ্রুত কেন্দ্রীয় সরকার পদক্ষেপ করুক।’
সঙ্কট শুধু জোগানে নয়, কালোবাজারি নিয়েও উদ্বেগে নবান্ন। এলপিজি চালিত অটো থেকে শুরু করে সিএনজি সর্বত্রই ভাড়ার দাপট বেড়েছে। রেস্তরাঁয় খাবারের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছেন ব্যবসায়ীরা। সে প্রসঙ্গে মমতার মন্তব্য, ‘যাঁরা দাম বাড়িয়েছেন, তাঁদের যুক্তি সঙ্গত। কিন্তু মানুষের কথা ভাবা দরকার। মানুষের স্বার্থে বিকল্প কিছু ভাবতে হবে। আমি বৈঠক করব। আমাদের টাকা নেই, তা-ও আমি সাহায্য করতে পারি। কিন্তু টাকা দিলেও গ্যাস পাওয়া যাবে না।’ অনেক জায়গায় রান্নার গ্যাস ভরে অটো চালানোর অভিযোগও উঠছে। এই বিশৃঙ্খলা রুখতে পুলিশ ও জেলা প্রশাসনকে কড়া নজরদারির নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। পেট্রপণ্য সরবরাহকারী সংস্থাগুলিকে গ্রামবাংলার জন্য পর্যাপ্ত কেরোসিন মজুত রাখার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্র যদিও দাবি করেছে দেশে গ্যাসের কোনও অভাব হবে না, কিন্তু বাস্তবের ছবিটা একেবারেই আলাদা। ফোনে বুকিং না হওয়া বা ডিলারদের অফিসের সামনে লম্বা লাইন সেই আশ্বাসে জল ঢেলে দিচ্ছে।
ভোটের আবহে মমতার এই সক্রিয়তা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এসআইআর বা রাষ্ট্রপতি সংক্রান্ত বিতর্ককে একপাশে সরিয়ে তিনি সরাসরি ঢুকে পড়েছেন আমজনতার হেঁশেলে। বৃহস্পতিবারের বৈঠকের পর রাজ্য সরকার কোনো বড় বিকল্প পথের ঘোষণা করে কি না, এখন সেদিকেই তাকিয়ে গোটা বাংলা। মুখ্যমন্ত্রী ক্ষোভ উগরে দিয়ে জানিয়েছেন, ‘২৫ দিনের ওই ঘোষণা করাই সবচেয়ে বড় ভুল হয়েছে। এটা কেন বলল? এতেই আমার আপত্তি। আমি বিকল্প ভেবে তার পর তো ঘোষণা করব!’ আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি আলাদা এসওপি তৈরির কাজও শুরু করেছে রাজ্য প্রশাসন। কত গ্যাস মজুত আছে আর কত সরবরাহ করা হল, তার পাই টু পাই হিসাব রাখতে চায় নবান্ন।
পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে জোগান ব্যাহত হওয়ার যে যুক্তি কেন্দ্র দিচ্ছে, তাকে ছাপিয়ে এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে সাধারণ মানুষের হাহাকার। যাঁরা ইলেকট্রিক ইনডাকশন ব্যবহার করছেন, তাঁরা কিছুটা স্বস্তিতে থাকলেও তাতে সব রান্না করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন মুখ্যমন্ত্রীও। ফলে আজ বৃহস্পতিবারের বৈঠকই এখন রাজ্যবাসীর শেষ ভরসা।