ব্রেকিং
  • Home /
  • Uncategorized /
  • পাল্টাপাল্টি ‘চার্জশিট’ পদ্ম-ঘাসফুলের

পাল্টাপাল্টি ‘চার্জশিট’ পদ্ম-ঘাসফুলের

নয়া জামানা ডেস্ক : ভোটের মুখে তপ্ত বাংলায় সম্মুখসমরে যুযুধান দুই পক্ষ। একদিকে তৃণমূল সরকারের ১৫ বছরের শাসনের বিরুদ্ধে ৩৫ পাতার ‘জনতার চার্জশিট’ পেশ করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। পাল্টা ১৩ দফা প্রশ্নে ‘মোটা ভাই জবাব চাই’ শীর্ষক নথিতে বিঁধল....

পাল্টাপাল্টি ‘চার্জশিট’ পদ্ম-ঘাসফুলের

নয়া জামানা ডেস্ক : ভোটের মুখে তপ্ত বাংলায় সম্মুখসমরে যুযুধান দুই পক্ষ। একদিকে তৃণমূল সরকারের ১৫....

Facebook
Twitter
LinkedIn
Email
WhatsApp
X
Threads
Telegram

আরও পড়ুন


নয়া জামানা ডেস্ক : ভোটের মুখে তপ্ত বাংলায় সম্মুখসমরে যুযুধান দুই পক্ষ। একদিকে তৃণমূল সরকারের ১৫ বছরের শাসনের বিরুদ্ধে ৩৫ পাতার ‘জনতার চার্জশিট’ পেশ করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। পাল্টা ১৩ দফা প্রশ্নে ‘মোটা ভাই জবাব চাই’ শীর্ষক নথিতে বিঁধল ঘাসফুল শিবির। অনুপ্রবেশ থেকে দুর্নীতি, জনবিন্যাস বদল থেকে নারী নির্যাতন— শাহের আক্রমণে যেমন ঝাঁঝ ছিল, তেমনই ‘দিল্লির জমিদার’ খোঁচায় পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শনিবার কলকাতায় দাঁড়িয়ে শাহ সাফ জানালেন, ‘অঙ্গ-কলিঙ্গ’ জয়ের পর এবার ‘বঙ্গ’ চাই বিজেপির। পাল্টায় তৃণমূলের দাবি, শাহের এই চার্জশিট আসলে বাংলার সাধারণ মানুষের অপমান।

কলকাতার হাইভোল্টেজ সভা থেকে শাহের মূল নিশানায় ছিল অনুপ্রবেশ ও জনবিন্যাস। তাঁর দাবি, মমতাজির জমানায় অনুপ্রবেশের ফলে রাজ্যের ডেমোগ্রাফি বদলে যাচ্ছে। ওবিসি তালিকায় ৭৫ শতাংশই মুসলমান বলে দাবি করে তিনি বলেন, ‘বঙ্গবাসী ভয় পাচ্ছে, একসময় তাঁরাই সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে না তো।’ অনুপ্রবেশ রুখতে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার জন্য জমি না দেওয়ার অভিযোগ তুলে শাহ সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন, ‘অনুপ্রবেশকারীদের জন্য আপনার এত দরদ কেন? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক তখনই কাজ করতে পারবে যখন আপনারা সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিতে দেবেন।’ তাঁর হুঁশিয়ারি, বিজেপি ক্ষমতায় আসার ১৫ দিনের মধ্যে সীমান্তে বেড়া দেওয়ার জমি দেবে রাজ্য সরকার। অসমের ধাঁচে বাংলা থেকেও অনুপ্রবেশকারী উৎখাতের ডাক দিয়েছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘অসমে অনুপ্রবেশ বন্ধ হয়েছে। এখন একটাই রাস্তা বাকি অনুপ্রবেশের। তাই পশ্চিমবঙ্গের ভোট গোটা দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।’

রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা ও নারী সুরক্ষা নিয়ে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক মেজাজে পাওয়া গেল শাহকে। আর জি কর, কামদুনি থেকে সন্দেশখালি, কসবা ল কলেজ থেকে দুর্গাপুরের বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের ঘটনা— গুচ্ছ গুচ্ছ উদাহরণ টেনে শাহ বলেন, ‘শিল্পের জন্য বাংলা যেন কবরস্থান।’ তাঁর কটাক্ষ, তৃণমূলের দুর্নীতির কারণেই বাংলার যুবক-যুবতীরা আজ বেকার। মমতার ‘ভিকটিম কার্ড’ খেলা নিয়েও কড়া মন্তব্য করেন তিনি। শাহের কথায়, ‘ভোট আসলেই মমতা সবসময় ভিকটিম কার্ড খেলেন। কখন পা ভাঙেন। কখনও মাথা ফাটান। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে গালিগালাজ করেন।’ এমনকি শিলিগুড়ি করিডোর দিয়ে জাল নোট ও জাল টাকা ঢোকার প্রসঙ্গেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। শাহের মতে, এবার রামনবমীতে অশান্তি কম হওয়ার কারণ কমিশন ‘নিরপেক্ষ অফিসার’ রেখেছে।

তবে এই চার্জশিট পর্বে নজর কেড়েছে শুভেন্দু অধিকারীর প্রতি শাহের বিশেষ ভরসা। বক্তৃতায় তিন-তিনবার বিরোধী দলনেতার নাম নিয়ে তাঁকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। শাহ বলেন, ‘রাজ্যে চলতে থাকা অব্যবস্থা, অরাজকতা, বেহাল আর্থিক অবস্থা আর অনুপ্রবেশের সঙ্কটের কথা বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী নির্বাচনের আগেই পুরো পশ্চিমবঙ্গ সফর করে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন।’ ৭৭ জন বিধায়ক নিয়ে শুভেন্দু যেভাবে লড়াই করছেন, তার ভূয়সী প্রশংসা করেন শাহ। রাজনৈতিক মহলের মতে, এর মাধ্যমে বিজেপির অন্দরে শুভেন্দুর ‘ওজন’ যে কয়েক গুণ বেড়ে গেল, তা স্পষ্ট। শাহের দাবি, ‘আজকের বাংলা কবিগুরুর বাংলা আর নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনে বাঙালি অস্মিতাকে পাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

অমিত শাহের এই আক্রমণকে এক ইঞ্চি জমিও ছাড়েনি শাসকদল। শাহের কলকাতা সফরের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টা ১৩টি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে তৃণমূল। ব্রাত্য বসু, মহুয়া মৈত্র ও কীর্তি আজাদরা সাংবাদিক বৈঠকে প্রশ্ন তোলেন, ‘উনি বাংলায় এসে নারী নির্যাতনের কথা বলছেন। উন্নাও-হাথরস নিয়ে চুপ কেন? মণিপুরে নারী সুরক্ষা কোথায়?’ তৃণমূলের দাবি, সীমান্তে অনুপ্রবেশ রোখা বিএসএফের দায়িত্ব, আর সেই মন্ত্রকের দায়িত্ব স্বয়ং শাহের। বিজেপি দুর্নীতিগ্রস্ত নেতাদের আশ্রয় দেয় বলেও পাল্টা চার্জশিটে অভিযোগ আনা হয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী, হিমন্ত বিশ্বশর্মা ও অজিত পওয়ারদের নাম নিয়ে তৃণমূলের তোপ, ২৩টি দুর্নীতিতে অভিযুক্ত নেতারা বিজেপিতে গিয়ে ‘ক্লিনচিট’ পেয়েছেন।

তৃণমূলের পাল্টা চার্জশিটে উঠে এসেছে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতের একাধিক ইস্যু। বকেয়া টাকা না দেওয়া, ১০ লক্ষাধিক কৃষকের মৃত্যু এবং উত্তরবঙ্গের চা-শ্রমিকদের বঞ্চনা নিয়ে মোদী-শাহ জুটিকে কাঠগড়ায় তুলেছে বাংলা। তৃণমূলের দাবি, পশ্চিমবঙ্গ থেকে কর বাবদ সাড়ে ছয় লক্ষ কোটি টাকা নিয়ে গেলেও পাওনা মেটায়নি কেন্দ্র। একইসঙ্গে এসআইআর ও সিএএ-এনআরসি ইস্যুকে হাতিয়ার করে তৃণমূলের অভিযোগ, মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার ছক কষছে বিজেপি। নিরাপদ শহর হিসেবে কলকাতার ‘শীর্ষস্থান’ ধরে রাখার পরিসংখ্যান তুলে শাহের তোলা ‘আইন-শৃঙ্খলা’র অভিযোগ খণ্ডন করেছে ঘাসফুল শিবির।

সবশেষে ময়দানে নামেন খোদ তৃণমূল নেত্রী। শাহের নাম না করে সামাজিক মাধ্যমে কড়া প্রতিক্রিয়া জানান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শাহকে ‘দিল্লির জমিদার’ সম্বোধন করে মমতার চ্যালেঞ্জ, ‘মানুষ জানে ছিনিয়ে নিতে নিজের অধিকার-/ শত বঞ্চনার জবাব দেবে, শোনো দিল্লির জমিদার।’ রীতিমতো হুঁশিয়ারি দিয়ে তৃণমূল সুপ্রিমো বলেন, ‘কোনও দুর্বৃত্তরা ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত করে আমাদের পরাজিত করতে পারবে না।’ তিনি শাহকে পাল্টা খোঁচা দিয়ে লেখেন, ‘অনিষ্টকারীর গুপ্ত মন্ত্রণা ভেস্তে যাবে।’ মমতা সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন, শাহ কেন মণিপুর বা হাথরসের ঘটনা নিয়ে মৌন।

শাহের ভাষণে তোষণের রাজনীতির অভিযোগও ছিল তীব্র। তাঁর দাবি, তোষণের ফলে রাজ্য বাজেটে সংখ্যালঘুদের জন্য বরাদ্দ বেশি রাখা হচ্ছে। অন্যদিকে, ক্ষমতায় আসলে বিনামূল্যে দরিদ্রদের বিদ্যুৎ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। শাহের কথায়, ‘এই ভোট প্রাণনাশের ভয় থেকে মুক্তির ভোট, স্বাধীনতা চলে যাওয়ার ভয় থেকে মুক্তির ভোট।’ মে মাসের নির্বাচনে বিজেপি সরকার গঠন করবে বলে তিনি যখন ১০০ শতাংশ নিশ্চিত, তখন তৃণমূলের দাবি, ‘বাঙালিদের অপরাধীর তকমা দিয়েছেন শাহ।’

রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু স্পষ্ট জানান, শাহের চার্জশিট আসলে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের বিরুদ্ধে। দিল্লি বিস্ফোরণ থেকে শুরু করে দেশের ৪৫ বছরের সর্বোচ্চ বেকারত্ব— একের পর এক জাতীয় ইস্যুতে শাহকে বিঁধেছে তৃণমূল। প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ যাত্রা ও ভারতের লিঙ্গ বৈষম্য বা অনাহারের পরিসংখ্যানও তাদের চার্জশিটে স্থান পেয়েছে। শাহ যখন উন্নত বাংলা গড়ার লক্ষ্যে তৃণমূলকে ‘সমূলে উৎখাত’ করার ডাক দিচ্ছেন, মমতা তখন ‘দিল্লির জমিদার’কে পাল্টায় বুঝে নেওয়ার মন্ত্রে শান দিচ্ছেন। সব মিলিয়ে মে মাসের নির্বাচনের আগে বাংলা এখন দুই ‘চার্জশিট’ ও দুই শিবিরের তীব্র বাক্যযুদ্ধের এক জ্বলন্ত রণক্ষেত্র।


 

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

আজকের খবর