নয়া জামানা ডেস্ক : রেকর্ড গড়ে শেষ হলো বাংলার বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোট। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার আতঙ্ক না কি রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা? নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত এসআইআর (বিশেষ নিবিড় সংশোধন) পদ্ধতির জেরে রাজ্যজুড়ে প্রায় ৯০ লক্ষ ভোটারের নাম কাটা পড়ার আবহে নজিরবিহীন ভোটদান দেখল পশ্চিমবঙ্গ। বৃহস্পতিবার রাত ৯টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী রাজ্যে ভোট পড়েছে ৯২.৩৫ শতাংশ। স্বাধীনতার পর থেকে পশ্চিমবঙ্গ এবং তামিলনাড়ুতে ভোটদানের এই হারকে সর্বোচ্চ বলে ঘোষণা করেছেন ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। তাঁর কথায়, ‘স্বাধীনতার পর থেকে পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুতে ভোটদানের হার এ বারই সর্বোচ্চ’। দুই রাজ্যের ভোটারদের এই বিপুল অংশগ্রহণকে কুর্নিশ জানিয়ে অভিবাদন জানিয়েছেন তিনি। তবে নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এই পরিসংখ্যান শেষ পর্যন্ত ৯২.৪৭ শতাংশে গিয়ে দাঁড়াতে পারে।
প্রথম দফায় সবথেকে বেশি ভোটদান লক্ষ্য করা গিয়েছে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায়, সেখানে ৯৫.২২ শতাংশ মানুষ নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। এর ঠিক পরেই ৯৫.১৭ শতাংশ ভোট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে কোচবিহার। অন্যদিকে পাহাড়ে ভোটদানের হার তুলনামূলক কম। সবথেকে কম ভোট পড়েছে কালিম্পং জেলায়, ৮২.৯৯ শতাংশ। দার্জিলিং জেলায় ভোট পড়েছে ৮৮.৪৮ শতাংশ। ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ৮৪.৩৩ শতাংশ ভোটদানের যে রেকর্ড রাজ্যে ছিল, তা এ দিন অনায়াসেই ম্লান হয়ে গিয়েছে।
নজিরবিহীন এই হারের নেপথ্যে অন্যতম প্রধান কারণ ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর। প্রথম দফায় যে ১৫২টি আসনে ভোট হয়েছে, সেখানে বিতর্কিত এই পদ্ধতির জেরে ৪০,৪৬,৭৫৩ জন ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মোট ভোটারের সংখ্যা কমে গেলে এবং ভোটদানের সংখ্যা মোটামুটি একই থাকলে সহজ অঙ্কেই পোলিং পার্সেন্টেজ বেড়ে যায়। কিন্তু এবার শুধু হার বাড়েনি, বেড়েছে ভোটদাতার সংখ্যাও। ২০২১ সালে এই আসনগুলিতে ভোটার ছিল ৩.৭৮ কোটি, ভোট দিয়েছিলেন ৩.১৪ কোটি মানুষ। ২০২৬ সালে এসআইআর-এর পর ভোটার সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৩.৬০ কোটি, অথচ ভোট দিয়েছেন ৩.২৪ কোটি মানুষ। অর্থাৎ, ভোটার কমলেও বুথমুখী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ১০ লক্ষাধিক।
ভোট না-দিলে তালিকা থেকে নাম কাটা যাবে, এই আতঙ্কে দলে দলে মানুষ বুথমুখী হয়েছেন। ভোটার হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার তাগিদে হাওড়া বা শিয়ালদহ স্টেশনে ভিন রাজ্য থেকে আসা শ্রমিকদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গিয়েছে। মালদহ, মুর্শিদাবাদ বা উত্তর দিনাজপুরের মতো সংখ্যালঘু পরিযায়ী শ্রমিক অধ্যুষিত এলাকায় মানুষ ব্যক্তিগত উদ্যোগে বাড়ি ফিরেছেন শুধু ভোট দেবেন বলে। নাম কাটার আতঙ্ক শুধু দরিদ্র শ্রমজীবীদের মধ্যে নয়, গ্রাস করেছে উচ্চপদস্থ কর্তাব্যক্তিদেরও। অনেক সরকারি আমলাকেও বলতে শোনা গিয়েছে, ‘কোনও বার ভোট দিই না। এ বার দেব। না হলে শুনছি নাকি নাম বাদ চলে যাবে।’ এমনকি বাদ পড়াদের স্মরণে অনেককে কালো কাপড় ও ফিতা ব্যবহার করে ভোটকেন্দ্রে যেতে দেখা গিয়েছে।
সাধারণ রাজনৈতিক ধারণা বলে, ভোট বেশি পড়ার অর্থ প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া। ২০১১ সালে ৮৪.৩৩ শতাংশ ভোট পড়েছিল এবং ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটেছিল। সেই নজির টেনেই বিরোধীরা পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছেন। তবে তৃণমূলের যুক্তি ভিন্ন। ব্রাত্য বসু বিহারের উদাহরণ টেনে জানিয়েছেন, সেখানে এসআইআর-এর পর ভোটের হার বাড়লেও ক্ষমতাসীন সরকারই ফিরে এসেছিল। শাসক শিবিরের দাবি, এই বিপুল ভোট আসলে ‘বাঙালি গরিমা’ এবং কেন্দ্রের বঞ্চনার বিরুদ্ধে জনমত।
তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যাপক ভোটার উপস্থিতিকে স্বাগত জানিয়ে একে ‘ইতিবাচক’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘আপনারা শুনলে খুশি হবেন, এবার প্রচুর ভোট পড়েছে। আসলে এত নাম এবার বাদ গিয়েছিল; তাই কেউ রিস্ক নেননি। সকলে ভোট দিয়েছেন। এটা গুড সাইন। সকলে এসআইআর নিয়ে ভীত ছিলেন।’ মমতার দাবি, ভোটার তালিকায় নাম বাদ পড়ার চক্রান্ত রুখতে মানুষ কোনো ঝুঁকি নেননি। কুণাল ঘোষের কথায়, ‘যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁরা চক্রান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। বিপুলসংখ্যক মহিলা ভোট দিয়েছেন। যে সমর্থন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকেই গিয়েছে।’
অন্যদিকে, এই ভোট নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও। বৃহস্পতিবার কৃষ্ণনগরের জনসভা থেকে তিনি বলেন, ‘গত ৫০ বছরে এটাই প্রথম নির্বাচন, যেখানে সবচেয়ে কম সহিংসতা দেখা যাচ্ছে।’ উল্লেখ্য, ভোটকে কেন্দ্র করে রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রায় আড়াই লাখ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ হেলিকপ্টার থেকে সূর্যাস্তের ছবি পোস্ট করে দাবি করেন, ‘তৃণমূলের দুর্নীতি ও গুন্ডারাজের সূর্য অস্ত গেছে।’
ভোটের জেলাওয়ারি পরিসংখ্যানে লক্ষ্য করা যাচ্ছে ব্যাপক সক্রিয়তা। জলপাইগুড়িতে ৯৪.০৯ শতাংশ, উত্তর দিনাজপুরে ৯৩.৩৩ শতাংশ এবং মালদহে ৯৩.৪১ শতাংশ ভোট পড়েছে। মুর্শিদাবাদে ৯৩.৩২ শতাংশ ও বীরভূমে ৯৪.১৯ শতাংশ ভোটদান হয়েছে। দক্ষিণবঙ্গের অন্যান্য জেলার মধ্যে ঝাড়গ্রামে ৯২.০৪ শতাংশ, পশ্চিম মেদিনীপুরে ৯১.৯৭ শতাংশ এবং বাঁকুড়ায় ৯১.৭৬ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছেন। পূর্ব মেদিনীপুরে ৯০.৬৪ শতাংশ, পুরুলিয়ায় ৯০.২৮ শতাংশ এবং আলিপুরদুয়ারে ৯১.৪২ শতাংশ ভোট রেকর্ড করা হয়েছে। পশ্চিম বর্ধমানে এই হার ছিল ৮৯.৮২ শতাংশ।
বিকেল ৫টা পর্যন্ত রাজ্যে প্রথম দফায় ভোট পড়েছিল ৮৯.৯৩ শতাংশ। সন্ধ্যা ৬টায় ভোট শেষ হওয়ার আগেই দেখা যায়, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ৭৯.৮ শতাংশ বা ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ৮৩.২ শতাংশ ভোটদানের রেকর্ডকে ছাপিয়ে গিয়েছে এ বারের হার। প্রথম দফায় মোট ১৫২টি আসনে ভোটগ্রহণ হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ ভোটদানকে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস তাদের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে। তৃণমূলের দাবি, ১৫২টি আসনের মধ্যে তারা অন্তত ১২৫টি আসনে জয়ী হতে চলেছে। কুণাল ঘোষের বক্তব্য, ‘খুব কম হলেও আমরা ১২৫টি আসন জিতছি। এই সংখ্যা বেড়ে ১৩৫-ও হতে পারে’।
তৃণমূল নেতৃত্বের আরও দাবি, নন্দীগ্রামে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী পরাজিত হতে চলেছেন। কুণাল ঘোষের কটাক্ষ, ‘উনি ভবানীপুরেও হারবেন। নন্দীগ্রামেও হারবেন। উনি প্রাক্তন বিধায়ক হতে চলেছেন’। যদিও পালটা দাবি করেছেন শুভেন্দু অধিকারীও। তাঁর মতে, প্রথম দফার এই ভোটে বিজেপি ১২৫টি আসনে জয়ী হবে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও আত্মবিশ্বাসের সুরে বলেন, ‘আমি যদি মানুষের নাড়ি বুঝতে পারি, তবে আপনাদের বলি, আমরা ইতিমধ্যেই চালকের আসনে বসে আছি’।
রাজনৈতিক মহলে সাধারণ ধারণা অনুযায়ী, বেশি ভোট পড়ার অর্থ হলো পরিবর্তনের পক্ষে রায়। তবে তৃণমূলের মন্ত্রী ব্রাত্য বসু এই তত্ত্ব খণ্ডন করে বিহারের নির্বাচনের উদাহরণ টেনেছেন। সেখানে এসআইআরের পর বিপুল ভোট পড়লেও সরকারেরই প্রত্যাবর্তন হয়েছিল। তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি অনুযায়ী, যত বেশি ভোট পড়েছে, দিদির প্রত্যাবর্তন ততই জোরালো হবে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মুর্শিদাবাদে সর্বোচ্চ ২২টি, পূর্ব মেদিনীপুরে ১৬টি এবং পশ্চিম মেদিনীপুরে ১৫টি আসনে ভোট নেওয়া হয়েছে। এছাড়া মালদহ ও বাঁকুড়ায় ১২টি করে এবং বীরভূমে ১১টি আসনে ভোট পড়েছে। উত্তরের কোচবিহার ও উত্তর দিনাজপুরে ৯টি করে আসনেও ব্যাপক উৎসাহ দেখা গিয়েছে।
আগামী বুধবার দ্বিতীয় দফার ভোটেও যদি এর কাছাকাছি হার বজায় থাকে, তবে পশ্চিমবঙ্গ ভোটদানের নিরিখে জাতীয় স্তরে বহু নজির ভেঙে দিতে পারে। প্রথম দফার এই ভোট হার চলতি বছরের অসমের ৮৫.৩৮ শতাংশ এবং পুদুচেরির ৮৯.৯৩ শতাংশের হারকে অনায়াসেই পিছনে ফেলে দিয়েছে। এখন দেখার, ৪ জুন ভোটগণনায় শেষ হাসি কে হাসেন।