নয়া জামানা ডেস্ক : চেনা মেজাজের সেই আগ্রাসন উধাও। নেই কোনো আস্ফালন কিম্বা মেজাজ হারানো। রণক্ষেত্রে দাঁড়িয়েও সারাদিন দেখা গেল এক অন্য শুভেন্দু অধিকারীকে। মেঠো রাজনীতির আক্রমণাত্মক মেজাজ ছেড়ে বৃহস্পতিবার নিভৃতে ছক কষে শান্তিতেই নন্দীগ্রামের ভোট যুদ্ধ সামলালেন বিধানসভার বিরোধী দলনেতা। ভোটগ্রহণ শেষে তাঁর প্রবল আত্মবিশ্বাসী দাবি, প্রথম দফার ১৫২টি আসনের মধ্যে ১২৫টি আসনেই পদ্ম ফুটবে। শুভেন্দুর কথায়, ‘বিজেপি এই দফায় ১২৫ আসনের কমে পাবে না। তৃণমূলের সরকার চলে গিয়েছে।’ বৃহস্পতিবার কাকভোরে কাঁথির ‘শান্তিকুঞ্জ’ থেকে নন্দীগ্রামের পথে রওনা দিয়েছিলেন শুভেন্দু। নিজের বুথে ভোট দেওয়ার পর বুথে বুথে ঘোরার সময় চেনা এসইউভি ছেড়ে বেছে নিয়েছিলেন একটি ছোট গাড়ি। বড় গাড়ির মাঝখানের আয়াস ছেড়ে চালকের পাশের আসনে বসে জনসংযোগের এক নতুন কৌশল দেখল পূর্ব মেদিনীপুর। তাঁর এই শান্ত ভঙ্গি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তরজা তুঙ্গে। বিজেপির স্থানীয় শিবিরের দাবি, জয়ের বিষয়ে নিশ্চিত বলেই তিনি এমন ফুরফুরে মেজাজে ছিলেন। অন্যদিকে, তৃণমূলের কটাক্ষ, হার নিশ্চিত জেনেই ‘হতাশা’ থেকে চুপসে গিয়েছেন তিনি। তাদের দাবি, বেশি ‘লাফঝাঁপ’ করে লাভ নেই বুঝে শান্ত হয়ে গিয়েছেন বিরোধী দলনেতা। ভোটের চরম উত্তেজনার মাঝেও এদিন একবারের জন্যও মেজাজ হারাননি শুভেন্দু। গোপালচকে বিজেপি কর্মীদের আবদারে তাঁদের ক্যাম্প অফিসে ত্রিপলে বসে মুড়ি-ঝুরিভাজা খেয়ে আড্ডায় মাততেও দেখা গেল তাঁকে। এমনকি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় তৃণমূল প্রার্থী পবিত্র করের কনভয় যখন জোর গলায় হর্ন বাজিয়ে পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, তখনও তাঁর মুখে ছিল আলগা হাসি। শুভেন্দু কেবল বললেন, ‘ওরা ভাবছে, এখান থেকে কেউ ‘জয় শ্রীরাম’ বলবে। নন্দীগ্রামে ওদের কেউ কাউন্টই করে না!’ ভীমকাটা বা সাতেঙ্গাবাড়িতে তৃণমূল কর্মীদের ‘জয় বাংলা’ স্লোগান ও বিক্ষোভের মুখে পড়লেও তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ অবিচল। কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পুলিশের তৎপরতায় উত্তেজনা ছড়ালেও শুভেন্দুর শরীরী ভাষায় ছিল চরম সংযম। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করতেই প্রথম দফায় ১২৫ আসন জয়ের বাজি ধরেছেন শুভেন্দু। তাঁর হিসেব মিললে ম্যাজিক ফিগার ১৪৮ ছুঁতে পরবর্তী দফার ১৪২টি আসনের মধ্যে স্রেফ ২৩টি আসন দরকার বিজেপির। যদিও শুভেন্দুর দাবির পাল্টা তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষ দাবি করেছেন, তাঁরাই ১৫২টির মধ্যে ১৩২টি আসনে জয়ী হবেন। ২০০৭-এর জমি আন্দোলন থেকে ২০২১-এ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই— শুভেন্দু মানেই যেখানে ছিল আগ্রাসনের সমার্থক, সেখানে এদিনের ‘সংযত’ নেতার রূপ অনেককেই চমকে দিয়েছে। এমনকি গত পাঁচ বছরে বিধানসভার ভেতরেও যাঁর মেজাজ বারবার স্পিকারের কোপে পড়েছে, সেই নেতার এই পরিবর্তনকে কৌশলী চাল হিসেবেই দেখছেন অনেকে। বিকেলের দিকে তেখালিতে বুথ পরিদর্শনের সময় ভবানীপুর নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েন তিনি। সেখানেও ধীরস্থিরভাবে কৌশলী জবাব দিয়ে শুভেন্দু বলেন, ‘এসআইআরের পর ভবানীপুর আমার কাছে অনেকটা সহজ হয়ে গিয়েছে। তবে নন্দীগ্রামের ভোটের সময় আমি ৩০-৪০টি আসনে প্রচার করেছি। দ্বিতীয় দফায় এত জায়গায় যেতে পারব না। এখন ভবানীপুরেই বেশি মনোযোগ দিতে চাই।’ এর পরেই নন্দীগ্রামের ভোট প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দায়িত্ব স্থানীয় নেতাদের কাঁধে সঁপে দিয়ে কলকাতার ‘মহারণ’-এর উদ্দেশ্যে রওনা দেন তিনি। আগামী বুধবার ভবানীপুরের লড়াইয়ে এই শান্ত মেজাজ ধরে রাখাই এখন বড় লক্ষ্য তাঁর কাছে। সব মিলিয়ে ভোটপর্বের প্রথম দিনে এক ‘অচেনা’ শুভেন্দুকেই দেখল রাজ্য রাজনীতি। ছবি পিটিআই।